বিএনপি আয়োজিত এক গোল টেবিল আলোচনা সভায় বক্তারা তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য বন্টনের দাবিতে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। একইসঙ্গে এ বিষয়ে ভারতের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ ও পানি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে বিশেষজ্ঞ সেল গঠনের করে একটি ডকুমেন্টরি তৈরি করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
রোববার বিকালে রাজধানীর হোটেল পূর্বাণীতে বিএনপি আয়োজিত ‘তিস্তা নদীর পানি বন্টন : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনা সভায় এসব দাবি করা হয়।
আন্তর্জাতিক পানি বিশেষজ্ঞ ড. এস আই খান তিস্তার পানি বন্টন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এক্সপার্ট সেল গঠন করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানান। তিনি বলেন, বিভিন্ন ডকুমেন্ট সংগ্রহ করে ৬ মাসের মধ্যে এটি করা হতে পারে। এই প্রতিবেদন বাংলাদেশ, ভারত, জাতিসংঘসহ সবদেশের কাছে উপাস্থাপন করলে ভারতের ওপর চাপ প্রয়োগ করা সম্ভব হবে।
সভায় তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি বন্টনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যা দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, ‘অনেকে বলে থাকেন এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন নেই। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আদালতে যাচ্ছে না কেন?’
আসিফ নজরুল জানান, ‘আইন আছে। তবে অভিন্ন নদীর পানি প্রাপ্তিতে আমাদের আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করা যেতে পারে। এজন্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে বিষয়টি উপাস্থাপন করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে প্রথাগত আইন, জীববৈচিত্র্য আইন, পরিবেশ আইন, জলবায়ু আইনগুলোকে সামনে আনা যেতে পারে।
তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের আমলে জাতিসংঘের সাধারন অধিবেশনে এভাবে চাপ তৈরী করতে পেরেছিলো। সেভাবে আবারো এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া দরকার।’
আসিফ নজরুল বলেন, ১৯০৯ সালে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অভিন্ন নদীর পানির ক্ষেত্রে কোনো দেশই এককভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, যেখানে অন্য দেশের ক্ষতি হয়। সেভাবে বাংলাদেশ, ভারত বা চীনের মধ্যে অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রে একপাক্ষিকভাবে কেউই বাঁধ তৈরী করতে পারে না।
তিনি বলেন, সরকার নিজেই যখন নতজানু হয়ে ভারতে দিতে চায় তখন অন্য দেশকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। যদি বাংলাদেশে কোনো দায়িত্বশীল এবং অভিজ্ঞ সরকার আসে সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে ভারতের কাছ থেকে ন্যায্য অভিন্ন নদীর পানি পাওয়া সম্ভব বলে মনে করেন ড. নজরুল।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদুল আজিজ বলেন, কংগ্রেসের পরিবর্তে বিজেবি ক্ষমতায় এলেই বাংলাদেশের পানি প্রাপ্তির বিষয়ে নজর দেবে এমন ভাবার অবকাশ নেই। কারণ তাদের মূল দৃষ্টি থাকবে পাকিস্তান ও চীনের দিকে। তাই পানি পাওয়ার জন্য আগে জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন।
বিএনপির লংমার্চের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তিস্তার পানি পাওয়ার জন্য লংমার্চ এখনই বড় ধরনের প্রভাব না ফেললেও ভবিষ্যতে ভারতের জন্য এটি চাপের কারণ হয়ে দাড়াবে।  
জাতীয় ঐক্য না থাকলে শুধু কূটনীতির ওপর নির্ভর করে পানি প্রাপ্তির আন্দোলন কতটা সফল হবে, প্রশ্ন রাখেন তিনি।
তিস্তা নদী শুকিয়ে যাওয়ায় ওই এলাকায় যে ধরনের পরিবেশগত সংকট এবং উৎপাদনের ক্ষেত্রে ক্ষতি হচ্ছে সেসব বিষয় তুলে ধরেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ড. মাহফুজ উল্লাহ। তিনি  বলেন, ‘এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হচ্ছে। যদিও এখনো তথ্যে পরিপূর্ন করতে পারিনি। তবুও মোটামুটি একটি বিষয় উঠে এসেছে।’
তিনি জানান, তিস্তার কারণে এ পর্যন্ত পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভবিষ্যতে এ পরিসংখ্যান আরো বাড়বে বলে মত দেন তিনি। এক্ষেত্রে জীব বৈচিত্রের ক্ষতি, উৎপাদনের বিরূপ প্রভাব, ব্যক্তিগত পর্যায়ে ক্ষতিসহ সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, তিস্তা ইস্যু সফল করতে জনসম্পৃক্ততা প্রয়োজন। বিএনপি সেটা কতটুকু পারবে দেখার বিষয়।
সাংবাদিক মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, নদী প্রবাহ বন্ধ হলে দেশের সর্বনাশ হয়ে যাবে। এজন্য এখনই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব) হাফিজ উদ্দিন, যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ প্রমূখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন, সাবেক বিদ্যুৎ জালানী সচিব প্রকৌশলী আ ন হ আকতার হোসেন।
অনুষ্ঠানে বুয়েটের পানি সম্পদ প্রকৌশল বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো সাব্বির মোস্তফা খানের গবেষনায় তৈরী ‘তিস্তা নদীর পানি বন্টন : প্রেক্ষিত বাংলাদেশের’ ওপর একটি ডকুন্টেরি প্রদর্শন করা হয়।
এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার,  ভাইস চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব আলতাফ হোসেন চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, যুগ্ম মহাসচিব মিজানুর রহমান মিনু,সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, আর্ন্তজাতিক বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন প্রমুখ।
[b]ঢাকা, এমএইচ, ২০ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম)// কেএইচ  [/b]