পৃথিবীতে কেউ কেউ সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেয়। আবার কারও জন্ম হয় যেন অবাঞ্ছিত দারিদ্রের বেরসিক ছোঁয়ায়, কারও জীবনের পথ চলা শুরু হয়। দারিদ্রের কষাঘাতে জন্ম-সুখের আবেশটুকু হারিয়ে যায় যেন শুরুতেই।
তবু বাঁচার জন্য সংগ্রাম। আর শেখার জন্য স্বপ্ন এনে দেয় নতুন জীবনের আলো। কখনও দুঃখের সাগরে তার ঠাঁই হয় একমাত্র আশার ভেলা।
অসঙ্কোচে দারিদ্রের ললাটে যে পরিয়ে দেয় প্রতিরোধের তিলক সেই তো সার্থক যোদ্ধা। খাইরুল ইসলাম সোহাগ তেমনি এক সংগ্রামী যোদ্ধার নাম। সদ্য রেজাল্ট পাওয়া এইচএসসি পরিক্ষায় (বানিজ্যিক বিভাগ) দিয়ে কুয়াকাটা খানাবাদ ডিগ্রি কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে গৌরব অর্জন করেন। শৈশব থেকেই দারিদ্রের সাথে যার নিবিড় ঘনিষ্ঠতা। দারিদ্রের বিদ্রুপ হাসি সে অনিহার তুড়িতে উড়িয়ে দিয়েছে। নানির কোলে মাথা রেখে ছিনিয়ে এনেছে ট্যালেন্টপুল বৃত্তি, এসএসসি ও এইচএসসি ফলাফলে জিপিএ ৫।
সোহাগের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, হতদরিদ্র বাবা মো. বাবুল হাওলাদারের পৈতৃক বাড়ি শরিয়তপুর। মা মোসা. রিনা বেগমের বাড়ি পটুয়াখালী জেলাধীন কুয়াকাটার আলীপুরে।
এ দরিদ্র দম্পতির কর্ম জীবন শুরু হয় ঢাকার মালিবাগে। সোহাগের জন্ম ওখানেই। জন্মের দেড় মাস পরে তার বাবা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। শিশু সোহাগের দেড় মাস বয়স থেকেই নিয়তির নির্মম প্রহসন শুরু হয়।
বাবার বুকের ভালোবাসার উষ্ণতা সে পায়নি কখনও। মায়ের কোলের কোমল পরশ পেয়েছে দু’বছর। দু’বছর পরে মা দ্বিতীয় বিবাহের স্বপ্ন দেখে। প্রয়োজনের তাগিদেই খুঁজে নেয় অন্য স্বামীর ঘর।
নতুন স্বামী-সংসারে দু’বছরের শিশু সন্তানকে রাখা হলো না। নিঃসঙ্গ নানী রেনু বেগম ভালোবাসার তাড়নায় নাতীকে আশ্রয় দিলেন নিজের স্নেহ-ছায়ায়।
তিনি অন্যের বাসায় ঝিয়ের কাজ শুরু করে দেন। স্বল্প আয়ের সংসারে নাতীকে নিয়ে ইতোমধ্যে ৫ বছর কাটিয়ে দিলো নানী রেনু বেগম।
নাতী সোহাগকে ভর্তি করানো হয় মালিবাগ চৌধুরীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। কিন্তু নানীর সংসার তখন দারিদ্রতার অক্টোপাশে ঘিরে ধরে। নাতীকে নিয়ে আর মালিবাগে থাকা হলো না। লেখাপড়াও বুঝি থেমে গেলো।
কিন্তু না। নানী রেনু বেগম চলে আসেন গ্রামের বাড়ি আলিপুরে। নাতীকে ভর্তি করিয়ে দেন ১১৭ নং আমজেদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
তিনি শুরু করে দেন ঝিয়ের কাজ। আবার কখনও স্থানীয় কাঁচা বাজারে বিক্রি করতেন শাকসব্জি, ফলমূল। এভাবেই পুনরায় শুরু হয় তার অভাবের সংসার।
সোহাগ ওই বিদ্যালয় থেকে ২০০৮ সালে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় ‘ট্যালেন্টপুল গ্রেডে’ বৃত্তি পায়। এতে লেখাপড়ার প্রতি সোহাগের আগ্রহ বাড়তে থাকে।
পরে তাকে মহিপুর কো-অপ্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। মাধ্যমিক স্তরেও সে বিভিন্ন পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতে লাগলো। লেখাপড়ার প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দেখে শিক্ষকরাও ওর প্রতি সহানুভূতি দেখান।
নানীর সামান্য আয়ে তাকে চলতে হতো। দারিদ্রের সাথে সংগ্রাম করে সে ২০১৪ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ অর্জন করে। তার আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়।
এসএসসিতে ভালো রেজাল্ট হওয়ায় সোহাগকে ভর্তি করা হয় কুয়াকাটা খানাবাদ ডিগ্রি কলেজে। শিক্ষকদের আন্তরিকতা ও পরিশ্রমে তার ভাগ্যের চাকা
আবারও ঘুরলো।
২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষায় বাণিজ্য শাখা থেকে সে জিপিএ ৫ পেয়ে পূর্বের কৃতিত্ব ধরে রাখে।
ফলাফল সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সোহাগ বললো, কষ্ট নিয়েই আমার জন্ম। নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে আমি বড় হয়েছি। বাবার আদর পাইনি। মায়ের বাহুডোরে বেশি দিন স্থান করতে পারিনি। নানীর অক্লান্ত কষ্টের ফলে আমি এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছি। এবছর এইচএসসিতেও জিপিএ ৫ পেয়েছি।
এ ফলাফলের পিছনে যাদের বিশাল অবদান তারা হলেন আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণ। বিশেষ করে কলেজের ইংরেজি স্যার জাকির হোসাইন আমাকে ফ্রি প্রাইভেট পড়িয়েছেন। প্রেরণা জুগিয়েছেন বার বার। বাবার কথা মনে পড়ে। বাবা বেঁচে থাকলে হয়ত রেজাল্ট শুনে আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করতেন।’
সোহাগের প্রাথমিক শিক্ষা জীবন সম্পর্কে ১১৭ নং আমজেদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জালাল আহমেদ বলেন, সোহাগ প্রাইমারিতে থাকতেই অসাধারণ মেধার পরিচয় দিয়েছে। প্রত্যেক পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছে।
আমরা ওর লেখাপড়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা দিয়েছি। ও এইচএসসিতে পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছে। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।
তবে আশঙ্কাও রয়েছে। ওর লেখাপড়া চালিয়ে নিতে টাকার দরকার। সমাজের উচ্চবিত্ত মানুষের কাছে অনুরোধ তারা যেন সোহাগের জন্য এগিয়ে আসেন।
এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পাওয়ার খবর শুনে নানী রেনু বেগম আনন্দে কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন, ‘অর বাহে (পিতা) বাইচ্যা নাই। আইচ বাইচ্যা থাকলে কত্তো খুশি অইতো! অরে লইয়া কত্তো কষ্ট হরছি। হেই কষ্ট সব দূর অইয়া গ্যাচে। তয় সামনে ওরে আরও লেহাপড়া হরামু। এহন আর শরীলে কুলায় না। কুম্মে পামু ওর ল্যাহাপড়ার এ্যাত্তো টাহা! যদি কেহ এ্যাকটু সাহায্য হরতো। হ্যালে (তাহলে) অর লেহাপড়াডা অইতে।’
সোহাগের নানীর একটা গাভী ছিলো। ওটা বিক্রি করে তাকে ভর্তি পরীক্ষার কোচিংয়ের খরচ দিয়েছে। সে এখন উচ্চ শিক্ষার জন্য ভর্তি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। এ যাবৎ স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা ওর সাহায্যে এগিয়ে এসেছে।
মেধার বলে উচ্চ শিক্ষার জন্য কোথাও হয়ত ভর্তির সুযোগ পাবে। কিন্তু ভর্তির পর কোথা থেকে আসবে ওর লেখাপড়ার বিশাল খরচ? এ দুশ্চিন্তাও হয়তো সোহাগকে কাবু করতে পারে না। জীবন যুদ্ধে লড়াই করেই সে হয়তো সামনে এগুবে।
তবু পিছন থেকে একটু আর্থিক সহায়তা তার বেশি প্রয়োজন। এ প্রয়োজনের তাগিদ তাগিদ থেকেই সমাজের সহৃদয়বান ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছে সাহায্যের আবেদন করছে ওর পরিবার।
আমির/এসএম





