ভারতের নয়া দিল্লিতে হায়দরাবাদ হাউসে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকে বসেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ শনিবার দুপুরে এই বৈঠক শুরু হয়েছে।
বৈঠকের পর দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে প্রতিরক্ষা, ঋণ, মহাকাশ, পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার, তথ্যপ্রযুক্তি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে অন্তত ৩০টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হবে।
এর আগে সকালে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেখানে তাকে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানান। এর মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের আনুষ্ঠানিক পর্ব শুরু হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
বৈঠক শেষে নয়া দিল্লির হায়দ্রাবাদ হাউজে দুই নেতার উপস্থিতিতে দুই সরকারের প্রতিনিধিরা এসব চুক্তিতে সই করবেন।
এর মধ্যে প্রতিরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা, পরমাণু বিদ্যুৎ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট ও মহাকাশ গবেষণা, ঋণ সহযোগিতা, বর্ডার হাট স্থাপন, কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ক্ষেত্রে সহযোগিতার চুক্তি ও এমওইউ থাকছে বলে বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে আগেই জানানো হয়েছে। তবে এর মধ্যে তিস্তা চুক্তি যে হচ্ছে না, তা একপ্রকার নিশ্চিত হয়ে গেছে।
চুক্তি না হলেও তিস্তার অচলাবস্থা কাটানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে শেখ হাসিনার এই সফরে। শুক্রবার সন্ধ্যায় দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি ‘আশাবাদী’।
ঝুলে থাকা তিস্তায় আশা জাগানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারও। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে ইতোমধ্যে দিল্লি পৌঁছেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার সঙ্গে তিস্তা নিয়ে কথা হবে বলে শেখ হাসিনা জানিয়েছেন।
তিস্তার পাশাপাশি গঙ্গা ব্যারাজ ও অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে গুরুত্ব পাবে বলে আভাস মিলেছে প্রধানমন্ত্রীর কথায়।
শনিবার হাসিনা-মোদী শীর্ষ বৈঠকের পর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে খুলনা-কলকাতা পরীক্ষামূলক আন্তঃদেশীয় ট্রেন সেবার উদ্বোধন করা হবে নয়া দিল্লি থেকে। একইভাবে চালু হবে ঢাকা-খুলনা-কলকাতা রুটে নতুন একটি বাস সেবা।
দুই নেতার উপস্থিতিতে ভারত থেকে বাংলাদেশের জ্বালানি তেল কেনার কার্যক্রমেরও উদ্বোধন করা হবে। শনিবারই দুই হাজার ২০০ মেট্রিক টন ডিজেলের চালান রওনা হবে বাংলাদেশের পথে। বিরল-রাধিকাপুর রুটে মালবাহী ট্রেন চলাচল এবং ত্রিপুরার পালটানা বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রক্রিয়ারও উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে এদিন।
প্রধানমন্ত্রীর শনিবারের সূচি
- সকাল ৯টায় ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে শুরু হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানানোর আনুষ্ঠানিকতা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে অভ্যর্থনা জানাবেন।
- সকাল সাড়ে ৯টায় রাজঘাটে গিয়ে মহাত্মা গান্ধীর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন শেখ হাসিনা।
- বেলা সাড়ে ১১টায় হায়দ্রাবাদ হাউজের ডেকান স্যুইটে শুরু হবে দুই প্রধানমন্ত্রীর একান্ত বৈঠক। পরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক বসবে কনফারেন্স রুমে। ওই ভবনেরই বলরুমে দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই ও হস্তান্তর হবে।
- অনুষ্ঠানের পরের পর্বে শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদী হিন্দি ভাষায় ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর’ মোড়ক উন্মোচন করবেন।
- সবশেষে হায়দ্রাবাদ হাউজের বলরুমে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আসবেন দুই দেশের সরকারপ্রধান।
- বেলা ১টায় শেখ হাসিনা তার সম্মানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দেওয়া মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেবেন। এই ভোজসভা হবে হায়দ্রাবাদ হাউজের ব্যাংকোয়েট হলে।
- বিকাল সাড়ে ৩টায় মানেক শ সেন্টারে মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর শহীদদের সম্মাননা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন শেখ হাসিনা। সাত শহীদ পরিবারের সদস্যের হাতে মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা তুলে দেবেন তিনি। সেখানে মোদিরও বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
- সন্ধ্যা ৬টায় মাওলানা আজাদ এভিনিউয়ে ভারতের উপরাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারির সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে শেখ হাসিনা।
তবে যেসব চুক্তি শনিবার হচ্ছে, তার বিস্তারিত তথ্য কোনো সরকারের পক্ষ থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টি অন্য সব আলোচনাকে ছাপিয়ে গেছে বিএনপির আপত্তি ও সমালোচনার কারণে।
সরকারের দাবি অনুযায়ী, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সত্যিই যদি উচ্চতম পর্যায়ে পৌঁছে থাকে, তাহলে প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রয়োজন হচ্ছে কেন- সেই প্রশ্ন শুক্রবারও তুলেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
আর কী ক্ষেত্রে কোন চুক্তি হবে তা স্পষ্ট না করলেও দিল্লি যাওয়ার আগে শেখ হাসিনা বলে গেছেন, দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে কিছুই তিনি করবেন না।
উল্লেখ্য, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে ৪ দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে গতকাল শুক্রবার দেশটির রাজধানী নয়াদিল্লিতে পৌঁছেন শেখ হাসিনা। প্রটোকল অনুসারে ভারতের ভারী শিল্প প্রতিমন্ত্রী বাঙালি গায়ক বাবুল সুপ্রিয়র শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানানোর কথা ছিল। বাবুল সুপ্রিয় বিমানবন্দরে উপস্থিতও ছিলেন। তবে পরে প্রটোকল ভেঙে শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানান স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি।
জারিফ





