বছর অতিক্রম না করতেই পটুয়াখালী শহর রক্ষা বাঁধের একাধিক স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। ফলে ফাটা অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করে তলিয়ে যাচ্ছে রাস্তা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকাসহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট।
পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে বর্ষা মৌসুম পার করছেন শহরবাসী। ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই শহর রক্ষা বাঁধটি আশির্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের জন্য। শহরবাসীর অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলের কর্তা ব্যক্তিরা এই কাজকে প্রভাবিত করেছে বলে পুরো উদ্যোগটাই বিফলে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের পানির কবল থেকে রক্ষা পেতে শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য বহুদিন ধরে আন্দোলন করে আসছিলেন শহরবাসী। এ নিয়ে তৎকালীন রাজনৈতিক ভাবেও অনেক নেতাকর্মী হেনস্তা হয়েছেন। এরই প্রেক্ষিতে ২০০৭-০৮ অর্থবছরে শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে দরপত্র আহবান করে পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রকল্পের ৯টি গ্রুপে ব্যয় ধরা হয় ২৩ কোটি ১২ হাজার টাকা। এই কাজে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের কর্তাব্যক্তিসহ মোট ৯টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজে অংশ নেয়।
সিডিউল অনুযায়ী এই কাজে ফ্লাড লেভেলের চেয়ে কমপক্ষে ১২ ফুট উচ্চতা এবং উপরিভাগে ২৪ ফুট প্রস্থের মাটির বাঁধ নির্মাণের কথা থাকলেও তা করেনি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলো। বাঁধের সম্পূর্ণ অংশ মাটি দিয়ে নির্মাণের কথা থাকলেও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান পাউবোর সঙ্গে সমন্বয় করে ড্রেজার দিয়ে বালু ভরাটের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শহরের পুরাতন বাজার এলাকায় লোহালিয়া নদী তীরবর্তী বাঁধের অধিকাংশ উপরিভাগের প্রস্থ ৪ থেকে ৫ ফুট। কাঠপট্টির নদী তীরবর্তী বাঁধে প্রস্থ কোথাও ২ থেকে এক ফুট। এই প্রকল্প ২০১১ সালের মধ্যে সমাপ্ত করার কথা থাকলেও তা করেনি। উল্টো কাজ অর্ধেক করে ফেলে রাখা হয় দিনের পর দিন।
অভিযোগ রয়েছে, বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম-দূর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। ফলে কাঙ্খিত বাঁধটি আর্শিবাদের বদলে অভিশাপ হয়ে গেছে। শহরবাসীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাঁধ নির্মাণের আগে জোয়ারের পানি উঠলেও তা ভাটার সময় নদীতে নেমে যেত। এখন পানি ঠিকই ওঠে কিন্তু নামতে পারছে না। বাঁধ নির্মাণের আগে শহরবাসীদের ১ থেকে ২ ঘণ্টা পানিতে তলিয়ে থাকতো হতো। কিন্তু এখন পানি নিস্কাশন না হওয়ার কারণে দিন রাত মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
সূত্র আরও জানায়, পটুয়াখালী চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি ও পটুয়াখালী ডায়াবেটিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর সিকদার এবং চঞ্চল গুহ নামের ব্যবসায়ীসহ কয়েকজন জানান, বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম দূর্নীতির কথা বরিশাল পাউবোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নজরুল ইসলামকে অবহিত করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে পাউবোর প্রধান প্রকৌশলী মাহাতাব উদ্দিন ও তত্ত্ববধায়ক প্রকৌশলী মো. নজরুল ইসলাম নির্মাণ কাজ পরির্দশনে আসেন। তারা অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের নিয়ম অনুযায়ী কাজ করার নির্দেশনা দেন। কিন্তু ঠিকাদারগণ প্রভাবশালী হওয়ায় পাউবোর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কর্ণপাত করেননি।
অতিসম্প্রতি সরেজমিনে কলেজ রোড সিকদার বাড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে বাঁধের ফাটল দিয়ে জোয়ারের পানি শহরের ভিতরে প্রবেশ করছে। ওই এলাকায় বাঁধের ব্লক সরে গিয়ে পানি ঢুকছে। এছাড়াও কাঠপট্টি এবং লঞ্চঘাট এলাকায়ও ফাটলের মধ্য দিয়ে পানি প্রবেশ করছে শহরের অভ্যন্তরে। স্থানীয়দের ধারণা, যে কোন সময় ওইসব ফাটল ধসে বড় ভাঙন দেখা দিতে পারে।
জোয়ারের সময় বিভিন্ন স্থান দিয়ে পানি ঢুকে সদর রোড, পুরাণ বাজার, সেন্ট্রালপাড়া, লতিফস্কুল সড়ক, শিমুলবাগ, জুবিলী স্কুল রোড, নবাব পাড়াসহ এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় জোয়ারের পানি উঠছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি সূত্র জানিয়েছে, বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক লুটপাটের কারণে মূলত বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরে জোয়ারের পানি প্রবেশ করছে। এই নির্মাণ কাজে যেসব কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন তারা অনেকেই বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। এই সূত্রটি ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পদে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মো. শফিউদ্দিন বলেন, ‘গেটগুলো কাজ করছে না। এ কারণে পানি ঢুকছে। লঞ্চঘাট এলাকায় যে সমস্যা তা ফাটল নয়। আর কলেজ সংলগ্ন সিকদার বাড়ি এলাকায় বাঁধে কি ঘটেছে তা আমি দেখিনি। সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা হবে।
ঢাকা, ২১ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) // জেআই





