২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জনস্বাস্থ্যকে প্রাধান্য না দিয়ে বরং বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলোকে সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। তাই চূড়ান্ত বাজেটে সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুলসহ সকল তামাকজাত দ্রব্যের উপর উচ্চহারে সুনির্দিষ্ট কর আরোপের দাবিতে তামাকবিরোধী সংগঠন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, অধীর ফাউন্ডেশন, ঢাকা আহছানিয়া মিশন, এসিডি, ইপসা, সীমান্তিক, উবিনীগ, ইসি বাংলাদেশ, ডব্লিউবিবি ট্রাস্ট, নাটাব, প্রত্যাশা, এইড ফাউন্ডেশন, একলাব, টিসিআরসি একটি মানববন্ধন কর্মসূচি আয়োজন করে।

বুধবার সকাল ১১ টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এ মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়।

মানববন্ধন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বক্তব্য রাখে ডা. মাহফুজুর রহমান ভূঁঞা, ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডস(সিটিএফকে), হেলাল আহমেদ, প্রত্যাশা, সৈয়দা অনন্যা রহমান এবং শুভ কর্মকার, ডব্লিউবিবি ট্রাস্ট, ডা: শামীম জুবায়ের, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, সুমন শেখ, মানবিক, ফারহানা জামান, টিসিআরসি, আব্দুল আলীম, নাটাব।

মানববন্ধন কর্মসূচিতে বক্তারা জানান, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে সিগারেটের মূল্যস্তর প্রথা তুলে দিয়ে সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপ করার দাবি করা হলেও প্রস্তাবিত বাজেটে এর কোনো প্রতিফলন নেই। মূল্যস্তর প্রথা রাজস্ব ফাঁকি উৎসাহিত করে। ফলে অতীতের মতই এই জটিল কর কাঠামোর সুবিধা পাবে তামাক কোম্পানিগুলো, আর বঞ্চিত হবে সরকার।

একইসাথে ভোক্তাদেরও স্তর পরিবর্তনের সুযোগ অব্যাহত থাকবে। ফলে তামাকপণ্যের ব্যবহার আশানুরুপ হারে কমবেনা। প্রস্তাবিত বাজেটে সিগারেটের উপরের দুই স্তরে সম্পূরক শুল্ক মাত্র ১% বৃদ্ধি করায় ভোক্তা পর্যায়ে এই দুই স্তরের সিগারেটের মূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা কার্যত নেই বললেই চলে। ফলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নয় বরং তামাক কোম্পানিগুলোই এতে লাভবান হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে বিড়ির মূল্য ভোক্তা পর্যায়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়ানো একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

বাজেটে জর্দা ও গুলের স্বাস্থ্যক্ষতি বিবেচনায় নিয়ে এ দু’টি তামাকপণ্যের উপর সম্পূরক শুল্কের হার ৬০% থেকে বাড়িয়ে ১০০% করা হয়েছে। তবে এর সুফল তখনই পাওয়া যাবে যখন এসব পণ্যে সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করে দাম বৃদ্ধি করা হবে। সম্পূরক শুল্ক যতই বাড়ানো হোক না কেন ভিত্তিমূল্য কম হলে বাজারে এসব পণ্যের মূল্য খুব একটা পরিবর্তন হবেনা। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব পণ্যের রাজস্ব আদায় খুবই দুর্বল। দেশে রেজিষ্ট্রেশনবিহীন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জর্দা ও গুল কারখানা থাকায় ঐসব কারখানা থেকে কর সংগ্রহ করা কঠিন। এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

মানববন্ধনে বক্তারা আরও জানান, বাংলাদেশের তামাক কর কাঠামো অত্যন্ত পুরনো এবং তা বাংলাদেশসহ পৃথিবীর মাত্র ৫/৬টি দেশে চালু রয়েছে। বর্তমানে সিগারেটের ক্ষেত্রে মূল্যস্তর প্রথা, বিড়ির ক্ষেত্রে অতি স্বল্পমাত্রার ট্যারিফ ভ্যালু, গুল-জর্দার ক্ষেত্রে এক্স-ফ্যাক্টরি প্রাইস ইত্যাদি প্রথা চালু রয়েছে।

এছাড়া সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপের পরিবর্তে বছরের পর বছর নাম মাত্র হারে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হচ্ছে যা তামাকের মূল্যবৃদ্ধি ও ব্যবহার কমানোর জন্য মোটেও কার্যকরী নয়। তামাক কর কাঠামোর এসব দুর্বলতা সংস্কারে তামাকবিরোধীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি সাড়া দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি সাউথ এশিয়ান স্পিকার সামিট-এ তামাক নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে একটি সহজ তামাক কর কাঠামো প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে তামাকজাত পণ্যের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস ও তামাক রাজস্ব বৃদ্ধির কথা বলেছেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে প্রস্তাবিত বাজেটে সেসবের কোন প্রতিফলন নেই, যা সবাইকে হতাশ করেছে।

মানববন্ধন থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের চূড়ান্ত বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য নিম্নোক্ত দাবিসমূহ তুলে ধরা হয়:

১। সিগারেটের মূল্যস্তর প্রথা বাতিল করে প্যাকেট প্রতি খুচরা মূল্যের কমপক্ষে ৭০ শতাংশ পরিমাণ সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপ করতে হবে;

২। প্রতিটি বিড়ি শলাকার দাম যাতে কমপক্ষে ১ টাকা হয় সেইভাবে সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপ করতে হবে;

৩। জর্দা এবং গুলের উপর সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপ করে মূল্য বাড়াতে হবে; প্রস্তাবিত বাজেটে সম্পূরক শুল্কবৃদ্ধির মাধ্যমে পণ্যদুটির মূল্যবৃদ্ধির পুরানো প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে।

৪। তামাকের ওপর আরোপিত স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ ১ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ২ শতাংশ নির্ধারণ করতে হবে।

এমই