আজ সোমবার ২৩ জুন। ঐতিহাসিক পলাশী ট্রাজেডি দিবস। এটি বাঙালির ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়।
দুইশ ছাপ্পান্ন বছর আগে ১৭৫৭ সালের এই দিনে এক সফল প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে যুদ্ধের প্রহসন হয়েছিল ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আম্রকাননে। সেদিন তরুণ নবাব সিাজউদ্দৌলা পরাজিত হন এবং বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। এমন বেদনাবহ স্মৃতিকে স্মরণ করে মীরজাফর, ঘষেটি বেগমের প্রেতাত্মাদের রোখার দৃপ্ত শপথ নেয় জাতি। পলাশী দিবস উদযাপনে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন কর্মসূচি নিয়েছে।
এবার এমন এক সময়ে পলাশী ট্রাজেডি দিবস পালন হচ্ছে যখন মীরজাফর-ঘষেটি বেগমের প্রেতাত্মারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে বিকিয়ে দিয়ে হলেও রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে চাইছে। বহু আন্দোলন, রক্তের বিনিময়ে অর্জিত গণতন্ত্রও আজ বিপন্ন। তারা এদেশকে ‘কলোনি’ বানানোর স্বপ্নে বিভোর। অদ্ভূত এক সরকার ব্যবস্থা শান্তিপ্রিয়, গণতন্ত্রপ্রিয় জনগণের ওপর চেপে বসে আছে। জাতীয়তাবাদী, ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসীদের ওপর সরকারের উন্মুক্ত খড়গ উদ্ধত। এই কঠিন সময় থেকে মুক্তি পেতেই আজ সবাই মহান প্রভুর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করবে। তাই এখন এমন আওয়াজ তোলার সময়, 'মীর জাফররা নিপাত যাক, সিরাজউদ্দৌলাদের জয় হোক'।
ইতিহাস পাঠে জানা যায়, ষোল শতকের শেষের দিকে ওলন্দাজ, পর্তুগীজ ও ইংরেজদের প্রাচ্যে ব্যাপক বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। এক পর্যায়ে ইংরেজরা হয়ে যায় অগ্রগামী। এদিকে বাংলার সুবাদার-দিওয়ানরাও ইংরেজদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। ১৭১৯ সালে মুর্শিদকুলী খাঁ বাংলার সুবেদার নিযুক্ত হন। তার মৃত্যুর পর ঐ বছরই সুজাউদ্দিন খাঁ বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার সিংহাসন লাভ করেন। এই ধারাবাহিকতায় আলীবর্দী খাঁর পর ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল সিরাজউদ্দৌলা বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার সিংহাসনে আসীন হন। তখন তার বয়স মাত্র ২২ বছর। তরুণ নবাবের সাথে ইংরেজদের বিভিন্ন কারণে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া রাজ সিংহাসনের জন্য লালায়িত ছিলেন সিরাজের পিতামহ আলীবর্দী খাঁর বিশ্বস্ত অনুচর মীরজাফর ও খালা ঘষেটি বেগম। ইংরেজদের সাথে তারা যোগাযোগ স্থাপন ও কার্যকর করে নবাবের বিরুদ্ধে নীল-নকশা পাকাপোক্ত করে।
দিন যতই গড়াচ্ছিল এ ভূখন্ডের আকাশে ততই কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছিল। ১৭৫৭ সালের ২৩ এপ্রিল কলকাতা পরিষদ নবাবকে সিংহাসনচ্যুত করার পক্ষে প্রস্তাব পাস করে। এই প্রস্তাব কার্যকর করতে ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ রাজদরবারের অভিজাত সদস্য উমিচাঁদকে ‘এজেন্ট’ নিযুক্ত করেন। এ ষড়যন্ত্রের নেপথ্য নায়ক মীরজাফর তা আঁচ করতে পেরে নবাব তাকে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ করে আব্দুল হাদীকে অভিষিক্ত করেন। কূটচালে পারদর্শী মীরজাফর পবিত্র কুরআন শরীফ ছুঁয়ে শপথ করায় নবাবের মন গলে যায় এবং মীরজাফরকে প্রধান সেনাপতি পদে পুনর্বহাল করেন। সমসাময়িক ঐতিহাসিক বলেন, এই ভুল সিদ্ধান্তই নবাব সিরাজের জন্য ‘কাল’ হয়ে দাঁড়ায়।
ইংরেজ কর্তৃক পূর্ণিয়ার শওকত জঙ্গকে সাহায্য করা, মীরজাফরের সিংহাসন লাভের বাসনা ও ইংরেজদের পুতুল নবাব বানানোর পরিকল্পনা, ঘষেটি বেগমের সাথে ইংরেজদের যোগাযোগ, নবাবের নিষেধ সত্ত্বেও ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সংস্কার, কৃষ্ণ বল্লভকে ফোর্ট উইলিয়ামের আশ্রয় দান প্রভৃতি কারণে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আমবাগানে সকাল সাড়ে ১০টায় ইংরেজ ও নবাবের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মীর মদন ও মোহন লালের বীরত্ব সত্ত্বেও জগৎশেঠ, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ, ইয়ার লতিফ প্রমুখ কুচক্রী প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারীদের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে নবাবের পরাজয় ঘটে। সেই সাথে বাংলার স্বাধীনতার লাল সূর্য পৌনে দু’শ বছরের জন্য অস্তমিত হয়।
পলাশী বিপর্যয়ের পর শোষিত-বঞ্চিত শ্রেণী এক দিনের জন্যও তাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম বন্ধ রাখেনি। শুরু থেকেই প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় ব্রিটিশ শক্তি। ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ফরায়েজি আন্দোলন, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা-কেন্দ্রিক আন্দোলন, ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ ইত্যাদি বিদ্রোহের মাধ্যমে এ দেশের মুক্তিকামী মানুষ বারবার তাদের অবস্থান জানান দিয়েছে। এ জন্যই ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সাধারণ জনগণকেই একমাত্র প্রতিপক্ষ মনে করত। প্রায় ২০০ বছর ধরে তাদের আন্দোলন সংগ্রামের ফলে ব্রিটিশরা শেষ পর্যন্ত এ দেশ থেকে লেজ গুটাতে বাধ্য হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত নামে দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্র জন্মলাভ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়।
দীর্ঘ সংগ্রামের পর আমরা পেয়েছি স্বাধীন একটি ভূখণ্ড। কিন্তু এখনো থেমে নেই ষড়যন্ত্র। এখনো ভিন্ন নামে মীরজাফর, ঘষেটি বেগম, জগৎ শেঠরা দেশের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা আর ন্যায্যপ্রাপ্তি নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। পলাশীর ইতিহাস তাই আমরা ভুলে যেতে পারি না। পলাশী ফিরে আসে বারবার নতুন রূপে। প্রাসাদ ষড়যন্ত্র কি এখন হচ্ছে না? জগৎ শেঠের মতো বিশ্বাসঘাতকেরা কি এখানো তৎপর নয়? মীরজাফরের মতো সেনাপ্রধান কি এ দেশে বিরল? অন্ধকূপ হত্যার গল্প লেখা মিডিয়া কি সারা দেশ চষে বেড়াচ্ছে না? তাই পলাশীর চেতনার নির্যাস থেকে আমাদের শিা নিতে হবে। অন্তত ইয়াদ আলাবি, আহমদ চালাবি, হামিদ কারজাই, আর ... দের রোধকল্পে। সময় এখন এসব মীর জাফর চিনে রাখার। প্রতিরোধ করার। পলাশীর আম্রকাননে যে সূর্য অস্ত গেছে, সে সূর্য ফিরেছে আবার। কিন্তু গুনতে হয়েছে ২০০টি বছর। এ রকম কোনো দুর্দিন আর না আসুক আমাদের জীবনে।
ঐতিহাসিক মেলেসন পলাশীর প্রান্তরে সংঘর্ষকে ‘যুদ্ধ’ বলতে নারাজ। তার মতে, নবাবের পক্ষে ছিল ৫০ হাজার সৈন্য আর ইংরেজদের পক্ষে মাত্র ৩ হাজার সৈন্য কিন্তু প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারী ও কুচক্রী মীরজাফর, রায় দুর্লভ ও খাদেম হোসেনের অধীনে নবাব বাহিনীর একটি বিরাট অংশ পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কার্যত কোনো অংশগ্রহণই করেনি। এই কুচক্রীদের চক্রান্তে যুদ্ধের প্রহসন হয়েছিলো।
ইতিহাসবিদ মোবাশ্বের আলী তার ‘বাংলাদেশের সন্ধানে’ গ্রন্থে লিখেছেন, নবাব সিরাজউদ্দৌলা প্রায় লাখ সেনা নিয়ে ক্লাইভের স্বল্প সংখ্যক সেনার কাছে পরাজিত হন মীরজাফরের মোনাফেকীতে। অতি ঘৃণ্য মীরজাফর কুষ্ঠরোগে মৃত্যু হয়। কিন্তু বাংলাদেশের ট্রাজেডি এই যে, মীরজাফরেরা বার বার গোর থেকে উঠে আসে।
কর্মসূচি: তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে পলাশী দিবস উপলক্ষে “পলাশী বিপর্যয় ও আজকের বাংলাদেশ” শীর্ষক আলোচনা সভা আজ বিকেল ৪টায় জাতীয় প্রেস ক্লাব কনফারেন্স লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজ উদ্দিন আহমদ। (লেখাটি সংগৃহীত ও সংকলিত)
ঢাকা,২৩ জুন (টাইমনিউজবিডি.কম)//এনএস





