গাফলতির কারণে মালয়েশিয়ার মতো সুন্দর মার্কেট বাংলাদেশের হাতছাড়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন অভিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাসের সভাপতি ইসরাফিল আলম এমপি। সরকার দলীয় এই সংসদ সদস্য বলেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সেদেশের জনগণ বাংলাদেশী শ্রমিকদের ভালবাসে। অনেক পছন্দ করে। কিন্তু এই ভালবাসা-সহানুভুতিটা নেয়ার যে উদ্যোগ সেই জায়গাতে আমাদের ঘাটতি আছে। আর ঘাটতি আছে বলেই এতো সুন্দর মার্কেট, মাত্র তিন-সাড়ে তিন ঘণ্টার দূরত্ব। এটা আমরা দিনের পর দিন হারাচ্ছি। আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
আজ বুধবার রাজধানীর ইস্কাটনে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআআইএসএস) অডিটরিয়ামে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ইসরাফিল আলম এমপি। ‘নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং নিয়মিত অভিবাসনের জন্য ট্রেড ইউনিয়ন ও সিভিল সোসাইটির সহযোগীতা’ শীর্ষক দিনব্যাপী মতবিনিময় সভার আয়োজন করে সলিডারিটি সেন্টার বাংলাদেশ-এর সহযোগীতায় ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাইন্ডেশন।
উল্লেখ্য যে, দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার মালয়েশিয়ায় শ্রমিক যাওয়া বন্ধ রয়েছে। গত ৬ নভেম্বর কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল ও মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলের মধ্যে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে শ্রমবাজারটি উন্মুক্ত করার ব্যাপারে উভয় দেশ সম্মতি জানায় এবং ২৫ নভেম্বর ঢাকায় তাদের একটি প্রতিনিধি দল আসার কথা ছিল। ওই প্রতিনিধি দলের সাথে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের আরেকটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। ওই বৈঠকে কোন পন্থায় লোক যাবে, অভিবাসন ব্যয়সহ আনুষাঙ্গিক বিষয়গুলো আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে শ্রমিক পাঠানোর দিনক্ষণ ঘোষণার কথা ছিল। কিন্তু এর কয়েক দিন আগে মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে বৈঠকটি অনির্দিষ্ট কারণে স্থগিত ঘোষণা করা হয়। ওই বৈঠকটি কবে অনুষ্ঠিত হবে তা অবশ্য এখনও ঠিক হয়নি।
যদিও ৬ নভেম্বর মালয়েশিয়ায় জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকের দুদিনের মাথায় ঢাকায় গণমাধ্যমকে ইসরাফিল আলম বলেছিলেন, ফের সিন্ডিকেট করার পায়তারা করছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক মহল। উভয় দেশের সরকার এই সিন্ডিকেট না চাইলেও ৩৫ টি রিক্রুটিং মিলে এই সিন্ডিকেটের চেষ্টা হচ্ছে এবং এ কারণেই বাজারটি উন্মুক্ত হচ্ছে না। তার এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদ।
ওয়ারবির আলোচনা সভায় ইসরাফিল আলম এমপি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে অবৈধ শ্রমিকদের উদাহরণ টেনে বলেন, ইন্ডিয়া বা নেপালি শ্রমিকরা বিপদে পড়লে বা কোনো সমস্যায় পড়লে সাথে সাথে তাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসে দূতাবাস। কিন্তু সেখানে আমাদের লোকদের ক্ষেত্রে সেটা হয় না। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় জেলে ১৮-১৯ হাজার শ্রমিক বন্দী আছেন বলেও জানান তিনি।
সমাপনী পর্বে অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন বিএমইটির পরিচালক ড. নুরুল ইসলাম। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ ছালেহীন। প্যানেল বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন, আইএলও’র ড. উত্তম কুমার দাস, বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী, গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স সলিডারিটি ফেডারেশনের জেনারেল সেক্রেটারি স্মৃতি আক্তার, সাংবাদিক মোহাম্মদ ওয়াসিম উদ্দিম ভুইয়া ও আরাফাত আরা, ইন্সটিটিউশন অব ইনফরমেটিক্স এন্ড ডেভেলপমেন্টের সিইও সাঈদ আহমেদ।
ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুল হকের সভাপতিত্বে অন্য সেশনে বক্তব্য রাখেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম রেজা, সোলডারিটি সেন্টার বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর জন হারটো, ওয়ারবি পরিচালক জাসিয়া খাতুন, শ্রমিক নেতা আবুল হোসেন, অভিবাসী অধিকার ফোরামের মো. নাজমুল আহসান, অ্যাডভোকেট ফরিদা ইয়াসমিন প্রমুখ।
ইসরাফিল আলম বলেন, যারা বিদেশে যাচ্ছে তাদের ডাটাবেইস হচ্ছে, কিন্তু যারা ফিরে আসছে তাদের ডাটাবেজ হচ্ছে না। আমরা যেসব ডেডবডি রিসিভ করছি,এই ডেডবডিগুলোর পোস্টমর্টেম হচ্ছে না। কীভাবে মারা গেল? এটা কী টর্চার? হার্ট অ্যাটাক? অ্যাক্সিডেন্ট? আমরা কিন্তু জানি না। তিনি বলেন, সুস্থ্য মানুষ গেল মেডিকেল টেস্ট করে ফিটনেস নিয়ে বিদেশ গেল, আর ডেডবডি হয়ে ফিরলো।এটার জানার অধিকার ওই পরিবারগুলোর আছে বলে মনে করি। যে মানুষই মৃত্যুবরণ (প্রবাসে) করুক, তার পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা নিরপেক্ষভাবে হওয়া উচিত। আর যারা গর্ভবর্তী হয়ে ফিরছে।কিন্তু কেন ফিরছে? এটা তদন্ত হওয়া উচিত। আমরা যদি ডিএনএ টেস্ট করি তাহলে তো এটা বের হয়ে যায় সন্তানের বাবা কে? কেন এসব আইনের মধ্যে, পলিসিরি মধ্যে, প্রাকটিসের মধ্যে আসবে না? আমি মনে করি তারা আমাদের বোন, আমাদের মেয়ে। তারা ওখানে ওয়ার্কার (কর্মী) হিসেবে গিয়েছে। আমরা তাদের শ্রমিক হিসেবে পাঠিয়েছি। কিন্তু সেখান থেকে তারা যে লাঞ্চিত হয়ে আসছে, যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে তাদের প্রতিবিধান-প্রটেকশন যেকোনোভাবে আমাদের করতে হবে। আর যদি করতে না পারি তাহলে আমাদের বোন-মেয়েদের পাঠাবো না।আমরা আমাদের মেয়েদের এই দৃশ্য দেখতে চাই না। আমরা তাদের পাঠাচ্ছি কাজের ভিসায়। শ্রমিকের অধিকার, নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে হবে।
এএইচ





