কৌশলে মাদরাসার তৃতীয় তলা ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতকে যখন পুড়িয়ে মারছিল তখন ওই মাদরাসার গেটে ৭ জন পাহারায় ছিলো। ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার শিক্ষার্থী নুসরাত হত্যার মামলার অন্যতম আসামি আবদুর রহিম শরীফ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব কথা জানিয়েছে।

বুধবার বিকেল সাড়ে তিনটায় ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম শরাফ উদ্দিন আহম্মেদের আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণ শুরু হয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল এসপি মো. ইকবাল গণমাধ্যমকে শরীফের স্বীকারোক্তির তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

জবানবন্দিতে শরীফ জানায়, নুসরাত জাহান রাফিকে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়ার সময় সাতজনকে সঙ্গে নিয়ে সে মাদরাসার গেটে পাহারায় ছিল। আগুন দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তারা সেখান থেকে চলে যায়। ঘটনার আগের রাতে মাদরাসার পাশের পশ্চিম হোস্টেলে বৈঠকে সিদ্ধান্ত মোতাবেক শামীমের নির্দেশে তারা এ কাজ করে।

আদালতে শরীফ স্বীকারোক্তিতে আরও জানায়, নূর উদ্দিনের নেতৃত্বে হাফেজ আবদুল কাদেরসহ মোট সাতজন ঘটনার আগে থেকেই মাদ্রাসার গেটে ছিল। পরিকল্পনামতো শাহাদাত হোসেন শামীমসহ পাঁচজন নুসরাতের শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পর নুর উদ্দিন তাদের নির্দেশ দেয় অবস্থান ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যেতে। তারপর তারা সেখান থেকে যে-যার মতো চলে যায়।

এর আগে পিবিআইয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ইকবাল জেলা জজ আদালতে অপেক্ষমান সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘নুসরাত হত্যা মামলার অন্যতম আসামি শরীফের দীর্ঘ সময় ধরে দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত অনেক তথ্য উঠে এসেছে। তদন্তের স্বার্থে এ বিষয়ে এখন কিছু বলা সম্ভব না। পরে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।’

আলোচিত এ ঘটনায় ২৫–২৬ জন জড়িত। মামলায় এ পর্যন্ত ১৭ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ও পিবিআই। তাদের মধ্যে ওই মাদরাসার অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ দৌলা, কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম, শিক্ষক আবছার উদ্দিন, সহপাঠী আরিফুল ইসলাম, নূর হোসেন, কেফায়াত উল্লাহ জনি, মোহাম্মদ আলা উদ্দিন, শাহিদুল ইসলাম, অধ্যক্ষের ভাগনি উম্মে সুলতানা পপি, জাবেদ হোসেন, যোবায়ের হোসেন, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন, মো. শামীম, কামরুন নাহার মনি, জান্নাতুল আফরোজ মনি ও আবদুর রহিম শরীফ। এদের মধ্যে মামলার এজহারভুক্ত আট জনের মধ্যে সাত আসামিকে গ্রেফতার করা হয়।

উল্লেখ্য, গত ৬ এপ্রিল ফেনীর পৌর শহরের সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসা কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে গেলে আলিম পরীক্ষার কেন্দ্রের সাদে নিয়ে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায় বোরকা পড়া কয়েকজন দুর্বৃত্ত। এসময় তার চিৎকারে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় লোকজন দ্রুত তাকে উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে ফেনী সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠান।

গত ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টার দিকে পাঁচদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে মারা যান আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি। শনিবার (১১ এপ্রিল) বিকেলে লাখো মানুষের জানাজার পর সন্ধ্যায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে।

পরিবারের অভিযোগ, মাদরাসার অধ্যক্ষ এস এম সিরাজউদ্দৌলা গত ২৭ মার্চ নুসরাত জাহানের শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন। নুসরাত বিষয়টি বাসায় জানালে তার মা সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। ওই মামলার প্রেক্ষিতে সোনাগাজী থানা পুলিশ অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাকে গ্রেফতার করে। এরপর মামলা প্রত্যাহারের জন্য নুসরাতকে চাপ দেয় সিরাজউদ্দৌলার লোকজন। কিন্তু নুসরাত অপারগতা প্রকাশ করায় তাকে হত্যা করা হয়েছে।

এসএম