এক মাস আগেও ছিলেন সাধারণ মানুষ, এখন অসাধারণ- এখন তিনি সাধক বাবা। জমজমাট সাধক বাবার আস্তানা। পানছড়ির গহিন অরণ্যে তার আস্তানার ব্যাপ্তি প্রায় তিন একর পাহাড়জুড়েই। বসেন একটা বয়রা গাছের তলায়। সাদা হাফ হাতের শার্ট, সাদা প্যান্ট, সাদা জুতা, তবে চোখে কেবল কালো সানগ্লাস। এ এক অন্য রকম সাধক বাবা।

প্রতিদিন দেশ-বিদেশের প্রচুর পাহাড়ি-বাঙালি পানছড়ির মাচ্ছ্যছড়ার এই গহিন অরণ্যে সাধক বাবার আস্তানায় আসছেন পুণ্যার্জন ও রোগমুক্তির আশায়। ভক্তদের দাবি, শত শত মানুষ ‘ভালো হচ্ছে’। তবে ভালো হয়েছেন এমন কারোর সন্ধান পাওয়া যায়নি। সাধক বাবার আস্তানায় আসলে কী চলছে? সেটা রহস্যঘেরা। প্রশাসনের হস্তক্ষেপেই শুধু তা জানা সম্ভব।

পানছড়ির গহিন অরণ্যে মাচ্ছ্যছড়ায় গিয়ে দেখা যায়, প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে শত শত পাহাড়ি-বাঙালি পিচঢালা পথ মাড়িয়ে পাহাড়ের সরু ঢাল বেয়ে সাধক বাবার আস্তানায় যাচ্ছে। তাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। কারো হাতে পানি, কারো হাতে খাবার কিংবা অন্য কিছু। তবে সবার হাতেই মোমবাতি-আগরবাতি। সবই সাধক বাবার জন্য।

আধ ঘণ্টা পথ হাঁটার পর পৌঁছে গেলাম সাধক বাবার আস্তানায়। ঢুকতেই একটি টংঘর। সেখানে চার-পাঁচজন লোক বসে বসে শ্রদ্ধা দানের টাকা আদায় করছেন। যে যার ইচ্ছেমাফিক টাকা দিচ্ছেন। প্রায় তিন একর পাহাড় বিস্তৃত সাধক বাবার আস্তানায় একটি গুদামঘর, তিনটি বিশ্রামাগার, এক রুমের ছোট মাচাংঘর ছাড়া পুরো এলাকাই ন্যাড়া। তবে নতুন নতুন কিছু অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। সাধক বাবা সেখানে সস্ত্রীক বাস করেন। সঙ্গে থাকেন একমাত্র পুত্র ও ২০-২৫ জন নিকট আত্মীয়। তারা সবাই সাধক বাবার ভক্ত।

গহিন অরণ্যে বিদ্যুৎ নেই, তাতে কি? ভক্তরা সাধক বাবাকে জেনারেটর, সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল উপহার দিয়েছেন। তা দিয়ে সার্বক্ষণিক বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হয়েছে আস্তানায়। পুণ্যার্থীদের আনা উপহার গুদামঘর পূর্ণ হয়ে বাইরেও স্তূপ জমেছে।

ভক্তদের দাবি, সেখানে নাকি কাউকে কোনো কিছু কিনে খেতে হয় না। পুণ্যার্থীদের আনা জিনিসপত্র দিয়েই চলে খাবার-দাবার।

সবার মাঝে সাধক বাবা কখন আসবেন, কখন দর্শনার্থীদের দেখা দেবেন- তার অপেক্ষা চলছে। পানির বোতল, কলম, খাবার নিয়ে দুই সারি হয়ে অপেক্ষা করছেন সবাই। অপেক্ষা দীর্ঘ হয়ে যাওয়ায় কেউ অলস সময় কাটাচ্ছেন।

ঠিক দুপুর ১২টার সময় সাধক বাবা জনসমক্ষে এলেন। সাদা হাফ শার্ট, সাদা প্যান্ট, সাদা জুতা, চোখে কালো সানগ্লাস। এ এক অন্য রকম সাধক বাবা। মাচাং থেকে নেমে ভক্তদের সঙ্গে নিয়ে একটা বয়রা গাছের তলায় গিয়ে বুদ্ধের পূজা দিলেন।

এই বয়রা গাছের তলায়ই নাকি তিনি ধ্যান করে আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী হয়েছেন। তাই প্রতিদিন এ গাছের তলায় পূজা দেন তিনি।

পূজার পর তিনি এসে পুণ্যার্থীদের হাতে থাকা বোতলের ভেতর আঙুল চুবিয়ে ও হাতে থাকা অন্যান্য জিনিসপত্র ছুঁয়ে দিয়ে মন্ত্র দিচ্ছেন। এগুলো খেলে বা ব্যবহার করলেই ভালো ফল পাওয়া যাবে।

এরপর গিয়ে বসলেন আরেকটি বয়রা গাছের তলে। মাইক বাজিয়ে সাধক পুণ্যার্থীদের আশীর্বাদ দিচ্ছেন আর অনেকেই এসে সাধকের পায়ে প্রণাম করছেন।

লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা থেকে আস্তানায় আসা বেবী চাকমা জানান, তার বোনের হাঁপানি রয়েছে। লোকমুখে শুনেছেন সাধক বাবার দেওয়া পানি পান করে অনেকে ভালো হয়েছে, তাই এসেছেন।

পানছড়ির উল্টাছড়ির গফুর মিঞা জানান, তিনি চর্মরোগ নিয়ে অনেক দিন যাবৎ ভুগছেন। তাই রোগমুক্তির নিয়তে এসেছেন। অনেকে এসেছেন ছেলের ভালো পড়ালেখার জন্য দোয়া নিতে, অনেকে মাদকাসক্তি থেকে মুক্তি পেতে। অনেকে এসেছেন শুধু সাধকের আশীর্বাদ নিতে।

আস্তানার কেয়ারটেকার ও সাধকের ভাতিজা জটিল কান্তি চাকমা জানান, সাধক কিরণ চন্দ্র চাকমার কাছে এসে অনেকে ভালো হয়েছেন। তাই পুণ্যার্থীরা সাধকের জন্য এসব জিনিসপত্র নিয়ে এসেছেন, যা পুণ্যার্থীরাই ব্যবহার করছেন। এখানকার কোনো কিছুই বিক্রি বা অন্যত্র নেওয়া হয় না।

সাধক কিরণ চন্দ্র চাকমা নিজেই পেটালেন নিজের ঢোল। তিনি বলেন, শতবর্ষী বয়রা গাছের তলে বসে মাত্র তিন দিনে এক ঘণ্টা করে ধ্যান করেছেন তিনি। আর তাতেই হয়ে গেছেন আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী। তিনি নাকি চারজন বৌদ্ধের আশীর্বাদপুষ্ট হয়েছেন, তাই যাদের দোয়া করে দেন তারাই সফল ও সুস্থ হচ্ছেন। 

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের একটি স্পর্শকাতর স্থানে এ রকম আস্তানা গড়ে ওঠায় অনেকেই আবার এ নিয়ে বিরূপ মন্তব্যও করেছেন।

জানা যায়, খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী লোগাং ইউনিয়নের মাচ্ছ্যছড়ার দেধৈছড়া এলাকার কিরণ চন্দ্র চাকমাই (৪৫) এখন সাধক বাবা। তিনি একই এলাকার রবিনশ্বর চাকমার ছেলে।

জেআই