বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে রেখে আইনের খসরা তৈরি করা হয়েছে। এতে সুপ্রিমকোর্টের বিচারকদের অসদাচরণ তদন্তে তিন সদস্যের একটি ‘স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিটি’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।

এই তদন্ত কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন সাবেক একজন প্রধান বিচারপতি বা আপিল বিভাগের একজন সাবেক বিচারপতি। এছাড়া ওই কমিটিতে সাবেক একজন অ্যাটর্নি জেনারেল এবং একজন বিশিষ্ট নাগরিককে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর আলোকে এই আইন তৈরির উদ্যোগ নেয় আইন মন্ত্রণালয়। পরবর্তীতে একটি খসড়াও তৈরি করে মন্ত্রণালয়।

সম্প্রতি ওই খসড়ার ওপর আইন কমিশনের মত নিয়ে তা প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠিয়েছে মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত আইনটির ওপর স্টেকহোল্ডারদের (অংশীদার) মতামত নেয়ার প্রস্তুতি চলছে। নতুন এই আইনের নাম ‘সুপ্রিমকোর্টের বিচারকদের অসদাচরণ ও অসামর্থ্য (তদন্ত ও প্রমাণ) আইন-২০১৬’।

খসড়া আইনের বিষয়ে প্রধান বিচারপতির মতামত চাওয়া হয়েছে জানিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গণমাধ্যমকে বলেছেন, তা পাওয়ার পরই এই বিষয়ে কথা বলবেন তিনি।

প্রসঙ্গত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর বৈধতার প্রশ্নে জারি করা রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে আগামী ৫ মে রায়ের জন্য ধার্য রয়েছে।

১৯৭২ সালের সংবিধানে বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকলেও পরবর্তীতে তা পরিবর্তিত হয়। ২০১৪ সালে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারক অপসারণের ওই ক্ষমতা আবার সংসদের হাতে ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর বিচারপতিদের অপসারণের পদ্ধতি নিয়ে একটি আইন তিন মাসের মধ্যে প্রণয়নের কথা বলেছিলেন আইনমন্ত্রী। এর পরপরই ষোড়শ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট হয়। এর পরে প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সে আইনটি করা হয়নি।

খসড়া আইনে বিচারপতিদের অসদাচরণ ও অসামর্থ্যরে সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘অসদাচরণ অর্থ কোনো বিচারক কর্তৃক ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হয়ে বিচার পরিচালনা বা রায় দেয়া; পদমর্যাদা বা কার্যালয়ের অপব্যবহার করে আর্থিক, বস্তুগত কিংবা অন্য কোনো সুবিধা নেয়া; নৈতিক স্খলন জনিত অপরাধ; বিচার কাজে প্রভাবিত হওয়া বা অন্যকে প্রভাবিত করা।’ ইচ্ছাকৃত ও ক্রমাগত বিচারিক কর্তব্য পালনে ব্যর্থতা, জীবন বৃত্তান্তে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রাসঙ্গিক কোনো তথ্য গোপন করলেও অপসারণের উদ্যোগ নেয়া যাবে। এতে অসামর্থ্য বলতে কোনো বিচারকের স্থায়ী প্রকৃতির শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যতাকে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, যে কেউ সংসদের স্পিকারের কাছে কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও অসামর্থ্যরে অভিযোগ আনতে পারেন। সংক্ষুব্ধ ওই ব্যক্তির অভিযোগ প্রাথমিক বিবেচনার জন্য স্পিকার ১০ জন সংসদ সদস্য নিয়ে গঠিত কমিটির কাছে পাঠাবে। সংসদ সদস্যদের ওই কমিটি যদি মনে করে প্রাথমিকভাবে অভিযোগটির সত্যতা রয়েছে, তাহলে তারা স্পিকারকে লিখিতভাবে জানাবে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর স্পিকার সংসদে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করবেন।

সংসদ যদি মনে করে ওই অভিযোগ তদন্ত করা প্রয়োজন, তাহলে তা তদন্ত কমিটির কাছে পাঠাবে। অভিযুক্ত বিচারক আত্মপক্ষ সমর্থন করে কমিটির চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত বক্তব্য রাখতে পারবেন বলেও খসড়ায় বলা হয়েছে। কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তদন্ত কমিটির তদন্তে কোনো বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে ওই বিচারককে সংসদে আত্মপক্ষ সমর্থন করে লিখিত বা মৌখিক বক্তব্য দেয়ার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে। এরপর সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য যদি ওই বিচারকের অসামর্থ্য বা অসদাচরণের জন্য অপসারণের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে ওই প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। রাষ্ট্রপতি তাকে অপসারণ করবেন। আর কমিটির তদন্তে যদি অভিযুক্ত বিচারক নির্দোষ প্রমাণিত হন তাহলে তা প্রতিবেদন দিয়ে স্পিকারকে জানানো হবে। স্পিকার তা সংসদে উপস্থাপন করবেন।

আইনের খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, সংসদ যদি ওই প্রতিবেদন নিষ্পত্তি না করে আবার তদন্ত কমিটি গঠন করতে বলে তাহলে একই প্রক্রিয়ায় আবার তদন্ত হবে। এছাড়া কোনো ব্যক্তি যদি কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন, হয়রানিমূলক বা অসত্য অভিযোগ আনেন, তবে ওই ব্যক্তির দুই বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং অনূর্ধ্ব পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা হবে।

এম আর