হামলা এবং অগ্নিসংযোগে মিরপুর কালশীর কুর্মিটোলা বিহারী পল্লীতে ইয়াসিন আলীর পরিবারের ৯ জন আগুনে পুড়ে মারা যায়। তার ছোট মেয়ে ফারজানা আক্তারও ওই ঘটনায় আগুনে পুড়ে আহত হয়।
দগ্ধ ফারজানা আক্তার জানে না বিহারী পল্লীতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সে আর তার বাবা ছাড়া পরিবারের কেউ বেঁচে নেই। ওই দিনের ঘটনায় পুড়েছে তার মুখ, হাতসহ শরীরে ১৭ শতাংশ। তাকে মিথ্যে সান্ত্বনা দেয়া হচ্ছে-পরিবারের অন্য সদস্যরাও অগ্নিদগ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তাই কেউ তাকে দেখতে আসতে পারেন না!
আপন জনদের হারানোর সব কষ্ট নিজ বুকে চাপা রেখে বাবা ইয়াছিন বিষয়টি ফারজানার কাছে গোপন রাখে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাবা ইয়াছিনও কথা রাখেননি। শনিবার সকালে তিনিও বিদায় নিয়েছেন। রাজধানীর পল্লবীর পূরবী সিনেমা হলের সামনে দুই বাসের মাঝে চাপা পড়ে নিহত হয়েছেন ইয়াসিন আলী (৫৫)।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক আবুল আলী ফার্মিদী ইয়াসিনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
নিহত ইয়াসিনের ছোট বোন নাহিদা আক্তার জানায়, গত ১৪ জুন মিরপুর কালশীর কুর্মিটোলা বিহারী পল্লীতে হামলা এবং অগ্নিসংযোগে আমার ভাইয়ের পরিবারের ৯ জন আগুনে পুরে মারা যায়। তার ছোট মেয়ে ফারজানা আক্তারও ওই আগুনে পুড়ে আহত হয়। ফারজানার ওষুধ কিনতে শনিবার সকালে সে মিরপুরে যাচ্ছিল। পথে দুই বাসের মাঝে চাপা পড়ে আহত হলে তাকে প্রথমে মিরপুরের ইসলামী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভর্তি করা হয়। দুপুর দুইটার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
দিনটি ছিল গত ১৪ জুন, শনিবার। মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব শবে বরাতের সকালে আতশবাজি ও পটকা ফোটানোকে কেন্দ্র করে মিরপুর কালশীর কুর্মিটোলা বিহারী ক্যাম্পে হামলা এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
অভিযোগ উঠেছে, পুলিশের সহায়তায় এ ঘটনা ঘটায় স্থানীয় যুবলীগ। ওই ঘটনায় ফারজানা আক্তারের পরিবারের ৯ সদস্য আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। ফারজানা ঘটনার সময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘরেই ছিল। অনেকটা দৈবক্রমে বেঁচে গেছে। ফারজানার বয়স ১৫ বছর। সে মিরপুর বেনারশি পল্লীতে কারচুপির কাজ করত।
ফারজানা নিজেও জানে না সে কিভাবে বেঁচে গেছে। ঘটনার বর্ণনায় সে জানায়, ওই দিন পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সেও ঘুমিয়ে ছিল। হঠাৎ দেখে ঘরে আগুন। এরপর কি হয়েছে, কিভাবে সে বেঁচে গেছে সেটা সে বলতে পারে না।
কিছুদিন আগে ইয়াসিন আলী সাংবাদিকদের বলেছিলো, ‘আমি বাইরে ছিলাম। কিভাবে আগুন লেগেছে, কারা লাগিয়েছে, আমি কিছুই জানি না। কিন্তু আমার তো সব শেষ হয়ে গেল। এখন মেয়েটা বেঁচে আছে, মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আমি বেঁচে আছি।’
এ ঘটনা স্থানীয় যুবলীগ ঘটিয়েছে বলে শুরু থেকেই অভিযোগ উঠেছে। বিহারী ক্যাম্পের অধিবাসীরা অভিযোগ করে বলেছে, পুলিশের সহায়তায় যুবলীগের কর্মীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। ক্যাম্পের অধিবাসী জাহাঙ্গীর হোসেন অভিযোগ করে বলেছেন, ‘এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার নির্দেশে যুবলীগ নেতা জুয়েলের নেতৃত্বে ক্যাম্পে হামলা এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এমনকি ঘরে তালা দিয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।’
ঘটনার সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা যখন হামলা চালায় তখন তাদের সঙ্গে পুলিশও ছিল। এমনকি অগ্নিসংযোগ করার পর পুলিশ ক্যাম্পের ভেতরে গুলি ছোঁড়ে। এ কারণে আমরা আগুন নিভাতে পারিনি।’
তবে ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন বলে দাবি করে আসছেন।
ঘটনার সাথে পুলিশের সম্পৃক্ততার বিষয়টি পুলিশের পক্ষ থেকে বরাবরই অস্বীকার করা হয়েছে।
ঘটনার পর থেকে মিরপুর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার ইমতিয়াজ আহমেদ দাবি করেন, এ ঘটনার সঙ্গে পুলিশের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। যদি কোনো পুলিশ সদস্য ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকে তবে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার কথাও বলেন তিনি।
ঘটনার পর পল্লবী থানায় ৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ বাদী হয়ে দুটি মামলা করে। মামলাগুলো তদন্তের দায়িত্ব পরবর্তীতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে হস্তান্তর করা হয়।
গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, তদন্ত চলছে এবং মামলার অগ্রগতিও হয়েছে। তবে এখনও কাউকে চিহ্নিত করা যায়নি। গোয়েন্দা পুলিশের ঢাকা মহানগর উত্তরের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. আব্দুল আহাদ বলেন, ‘এখনও এ ঘটনায় জড়িত কাউকে চিহ্নিত করা যায়নি। যারা এ ঘটনায় জড়িত তাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।’
ঢাকা, ৬ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, জেএ





