ঢাকার যানজট। একটি প্রতিকারহীন নিয়মতান্ত্রিক চলমান প্রক্রিয়া। যার কবলে অতিষ্ট হননি এমন সাধারণ মানুষের সংখ্যা নেই বললেই চলে। ছয় ঋতুতেই চলে এর নানা কসরত। গ্রীষ্মের প্রখর তীব্রতা আর আষাঢ়ে বর্ষার সেই কসরতে, যানজট নিজেই যেন পতিত হয় এক মহাযানজটের মধ্যে।
এখন রমযান মাস। ইফতারির বাজার আর ঈদের কেনাকাটার মধ্য দিয়েই চলছে সাধারণ জনগণের চলাফেরা। সেই সাথে উপভোগ করতে হচ্ছে যানজটের অপ্রত্যাশিত চরম তিক্ততা।
রোজা শুরুর প্রথম থেকেই দুপুরের পরে এই যানজটের তীব্রতা ক্রমেই বাড়তে থাকে। কাজের ব্যস্ততায় যারা বাইরে থাকেন তাদের অনেকেই সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে ইফতার করাটাই যেন এখন দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর পরে আবার পরিবহন সংকটতো রয়েছেই। সব মিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায় কতটা ভাল আছে নগরীর রোজাদার মানুষ?
রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ রাস্তায় দুপুর থেকে বিশেষ করে ২টার পর থেকে যানজট অনেক গুণ বেড়ে যায়। যদিও ইফতারি অর্থাৎ মাগরিবের নামাযের পর তুলনা মূলক যানজটের পরিমাণ একটু কমই থাকে।
তাছাড়া সকাল ৯টার কিছু আগে থেকে শুরু করে ১২টা পর্যন্ত রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে তীব্র যানজটের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের। দুপুর ১২টার পরে কিছুটা সচল হলেও দেড়টা দুইটা থেকে আবার শুরু হয়।
দিনে দুপুরের সময়টা রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বেশি থাকলেও সন্ধ্যার পরে কিন্তু রাস্তাঘাট অনেকটাই ফাঁকা হয়ে যায়। একে তো ইফতার তারপরে আবার সন্ধ্যার পরেই সবাই প্রস্তুতি গ্রহণ করে তারাবীহ নামাযের। কাজেই সন্ধ্যা আটটার পরে অধিকাংশ রাস্তাই ফাঁকা হয়ে যায়।
পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ অবশ্য রাস্তায় অতিরিক্ত প্রাইভেট কার, রাস্তার স্বল্পতা অর্থাৎ কোথাও সরু কোথাও চওড়া, রুট না মানা, অতিরিক্ত ক্রসিং এবং ঘনঘন লেন পরিবর্তনকেই যানজটের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
ট্রাফিক পুলিশ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, আইন করে আর রাস্তায় ট্রাফিক বসিয়ে কোন কাজ হবে না। কেননা যানজটের মৌলিক কারণ দূর না করে পুলিশ দিয়ে আর শাস্তির ভয় দেখিয়ে যানজট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
ট্রাফিক পুলিশের একটি সূত্রে জানা যায়, কারওয়ান বাজারসহ রাজধানীর কিছু ব্যস্ততম এলাকায় অতিরিক্ত ক্রসিং এবং ইউ টার্ন বন্ধে বারবার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। কারণ যখনই এটা বাস্তবায়ন করতে যাবেন তখনই সরকারের উপর মহল থেকে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়।
সরেজমিনে দেখা যায় নগরীর সায়েদাবাদ, মহাখালী, ফার্মগেট, আসাদগেট, কল্যাণপুর, যাত্রাবাড়ি, মতিঝিল, পল্টন, গুলিস্তান, শাহবাগসহ কাকরাইল, শান্তি নগর, মৌচাক, রামপুরা, মালিবাগ মোড়, খিলগাঁও, বাড্ডা, গুলশান এবং ধানমণ্ডি এলাকার কিছু রাস্তায় সকাল থেকেই তীব্র যানজট যেন প্রতিদিনের রুটিন।
তেমনই যানযটের স্বিকার কয়েকজন যাত্রী এবং বাস চালাকের সাথে কথা বলে জানা যায়, শ্যামলি থেকে আসাদ গেট পার হতে সময় লাগে পৌনে এক ঘন্টা এবং মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে ফার্মগেটের সিগন্যাল পার হতে প্রতিদিন সময় লাগে কমপক্ষে এক ঘন্টা।
কোন কোন দিন সেটা বেড়েও যায়। তাছাড়া মালিবাগ মোড়সহ মৌচাক, পল্টন ও অন্যান্য এলাকার যাত্রিদের ভাগ্যেও এর ব্যাতিক্রম কোন কিছুই ঘটছে না।
অনেকেই প্রাইভেট কারকেই দুষছেন, তাদের ভাষ্যে যানজটের মূল কারণ হলো এই প্রাইভেট কার। যেখানে সেখানে পার্কিং করবে, একজনের জন্য এক একটা প্রাইভেট কার। তাছাড়া জ্যাম হলেও তারা তো থাকে এসিতে বসে। আর যতসব ভোগান্তি আমাদের।
আবার অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, প্রতি বছরই রমযান এলে সরকার ও পুলিশের পক্ষ থেকে ছিনতাই চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য অপকর্ম এবং যানজট নিরসনে বিভিন্ন পরিকল্পনা করে থাকে। কিন্তু তার তো কোন ফল আমরা পাই না।
যদিও দ্বায় স্বীকার করে ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এই সময়টাতে ঘরমুখো মানুষের সংখ্যা একটু বেড়েই যাই। সবাই এক সাথে আসে আবার এক সাথে যেতে চাই। অফিস আদালত ছেড়ে সবাই ঘরমুখো হয়। কারণ সবাই চায় ঘরে ফিরেই ইফতার করতে।
সাধারণ জনগণের জন্য ট্রাফিক পুলিশের চাওয়াটাও ঠিক তার ব্যতিক্রমও কিছু নই। এই রমজানে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ থেকে সাধারণ জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দু’টি বিষয়কেই লক্ষবস্তু ধরে নিয়ে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। ঘরমুখো মানুষের ঘরেই ইফতার করানো এবং রাস্তা ও মার্কেট গুলোর সামনে গাড়ি চলাচল সচল রাখা।
এই কাজগুলোকে গতিশীল রাখার জন্য ইফতারির আগ মূহুর্ত সময়ে ট্রাফিক পুলিশের যে সকল কর্মকর্তাদের অফিসে বসে থাকার কথা; এসপি, এএসপি, এসিসহ সকল কর্মকর্তারা তখন মাঠপর্যায়ে নিয়োজিত থাকেন বলে টাইমনিউজবিডিকে বলছিলেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ট্রাফিক শিল্পাঞ্চল বিভাগের সহকারি কমিশনার (এসি) আবু ইউসুফ।
তিনি বলেন, রমজানে সাধারণ জনগণের জীবন যাত্রা সহজ করার লক্ষে ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে সকল পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহিদুল হক এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার কথার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, তাদের পক্ষ থেকে কিন্তু রমযানে বিভিন্ন বিষয়ে বারবার দৃষ্টি আকর্ষন এবং উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। রাস্তা খোঁড়া খুঁড়ি থেকেও বিরত থাকতে সংস্লিষ্টদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষন করা হয়েছে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, রাস্তা খোঁড়া খুঁড়ি থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে সংস্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষন করা হলেও দির্ঘ্য ১৫-২০ দিন যাবৎ অস্বাভাবিক হারে রাস্তা খোঁড়া খুঁড়ি চলছে। এরা মূলত গভীর রাতে খোঁড়া খুঁড়ি করে অরক্ষিত অবস্থায় রেখে যায়।
যানজটের বিভিন্ন কারণ হিসেবে তিনি অতিরিক্ত মাত্রায় ক্রসিং, জাংশনে এসে গাড়ি নানা মুখি হওয়া (ওয়ান ওয়ে সুবিধা না পাওয়া), জায়গায় জায়গায় গাড়িতে লোক ওঠানো, দ্রুত লেন পরিবর্তন এবং কিছু কিছু এলাকয় অস্বাভাবিক হারে রিক্সা বেড়ে যাওয়াকে দুষলেও অস্বাভাবিক হারে প্রাইভেট কার বেড়ে যাওয়াকেই তিনি প্রাধান্য দিচ্ছেন। সেই সাথে যেখানে সেখানে পার্কং তো আছেই।
তাহলে পুলিশ কেন এগুলো নিবারণ করতে পারছে না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, স্বার্থ বাদি এবং প্রভাবশালীদের কারণে পুলিশ এগুলো নিবারন করতে পারছে না। এক্ষেত্রে সিটি কর্পারেশনের উদ্যোগ এবং যথাযত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
তবে রমজানে যত্রতত্র লোক উটানো এবং যেখানে সেখানে পার্কং করতে না দেওয়ার জন্য পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
রমজান আসার অগে সরকার এবং পুলিশের উচ্চ পদস্থ পর্যায় থেকে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত হলেও বাস্তবে তার যথাযত প্রয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ থেকেই যায়। তাই সাধারণ জনগণ সেই সিদ্ধান্তের পাশাপাশি যানজট নিরসনের জন্য বাস্তবে তা কার্যকর করাকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন।
এমআর/এমকে





