টসটসে রসালো, মিষ্টি স্বাদ, সুন্দর গন্ধ আর গাঢ় লাল রঙের বৈশিষ্ট্যের কারণে কুলিয়ারচরের লিচুর খ্যাতি সারাদেশ জুড়ে। বছরের পর বছর ধরে কুলিয়ারচরের সুস্বাদু লিচু মিটিয়ে আসছে ফল প্রেমীদের রসনা তৃপ্তি। তাই লিচুর মৌসুমে উৎসবে মেতে ওঠে পুরো এলাকা। প্রতিটি বাড়ির বসত ভিটায়, আঙিনায় ও বাগানের গাছে গাছে লাল লিচুতে রঙিন হয়ে গেছে পুরো এলাকা। মৌসুমী লিচুকে কেন্দ্র করে প্রতিদিনই বসছে লিচুর হাট। এই হাট থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানের ব্যাপারীরা লিচু কিনে নিয়ে যাচ্ছে।

কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার আব্দুল্লাপুর ইউনিয়নে চলতি মৌসুমে লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। বাগান থেকে লিচু তোলার শেষ সময় পর্যন্ত প্রকৃতি অনুকূলে থাকলে অনেক লাভ হবে বলে জানিয়েছেন লিচু চাষীরা। লিচুর গুটি রক্ষায় গাছে নিয়মিত ভিটামিন ওষুধ স্প্রে এবং গাছের গোড়ায় পানি ও সার দিয়ে যাচ্ছেন চায়ীরা। এছাড়াও পাকা লিচু রক্ষার জন্য তারা সারা রাত জেগে বাগান পাহারা দিচ্ছেন। লিচু পাকতে শুরু করায় ইতোমধ্যে গাছে গাছে চলছে ফল আহরণ। মৌসুমী লিচুকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন কুলিয়ারচর রেলস্টেশন রোডে ভোর ৫টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত বসছে লিচুর হাট। এই বাজারে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসছে শত শত পাইকার ও খুচরা ক্রেতা।

আব্দুল্লাহপুর গ্রামের লিচু বাগানের মালিক আফসার উদ্দিন বলেন, দিনে বিভিন্ন পাখি ও কিশোর-কিশোরীদের অত্যাচার এবং রাতে বাদুরের উপদ্রব থেকে লিচু রক্ষা করতে দিনরাত তাদের বাগান পাহারা দিতে হচ্ছে। এ গ্রামের লিচু সুস্বাদু ও আগাম জাতের হওয়ায় চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। প্রতিটি লিচুই গোলাপী রঙের, শাঁস মোটা ও রসালো।

লিচু ক্রেতা মান্নান মিয়া জানান, এ বছর ১০০ লিচুর দাম ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত। এখানকার লিচু বিখ্যাত হওয়ায় এই বাজারে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগমন ঘটছে শত শত পাইকার ও খুচরা ক্রেতাদের।

লিচু বিক্রেতা নজরুল ইসলাম বলেন, পর্যায়ক্রমে এ গ্রামে সম্প্রসারিত হচ্ছে লিচু চাষ। বর্তমানে আব্দুল্লাহপুর গ্রামের প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় কমপক্ষে ৮/১০টি করে লিচু গাছ আছে। পাইকাররা প্রতি বছর এখান থেকে লিচু কিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠায়। গাছে মুকুল আসার আগেই গাছের মালিককে অগ্রিম টাকা দিয়ে লিচু গাছ কিনে নিয়ে যায় স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ব্যাপারীরা।

কুলিয়ারচর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, বিগত বছরগুলোতে কৃষকদের অজ্ঞতার কারণে লিচুর ফলন তেমন ভালো হত না। কিন্তু দুই বছর ধরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ফোট পাম্প সরবরাহ করে প্রতিটি বাগানে স্প্রে করায় পোকার আক্রমণ কম হয়েছে। ফলে ফলন ভালো হয়েছে। এবার কুলিয়ারচরে ১২৫ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ করা হয়েছে।

ঠিক কত বছর আগে এবং কিভাবে এখানে লিচু চাষের প্রচলন শুরু হয়েছে তার সঠিক কোনও তথ্য পাওয়া না গেলেও স্থানীয় প্রবীণদের ধারণা অন্তত কয়েকশত বছর আগে এখানে লিচু চাষ শুরু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে এখানকার বাড়ি বাড়িতে লিচু গাছ লাগানো হলেও দ্রুত এর খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে বাণিজ্যিকভাবে লিচু চাষ শুরু হয় কয়েক দশক আগে থেকে।

চাষীদের দেওয়া হিসাবমতে, প্রতি মৌসুমে প্রায় কোটি টাকার মত লিচু বিক্রি হয় এখানে। এলাকার অনেক চাষীদের আয়ের প্রধান উৎস এখন লিচু চাষ। শুধুমাত্র লিচু বিক্রি করেই চাষীরা তাদের সংসারে স্বচ্ছলতা আনতে সক্ষম হয়েছেন। লিচু বিক্রির টাকা দিয়েই অনেক পরিবার সারা বছরের ব্যয় নির্বাহ করে থাকেন। দিন দিন সম্ভাববনাময় এই সুস্বাদু লিচুর চাহিদা বাড়ায় আরও অনেকেই নতুন করে বাগান করতে শুরু করেছেন। এখানকার লিচু বৈশিষ্টের কারণে অন্য এলাকার লিচুর চেয়ে আলাদা। এ লিচু মুখে দিলেই গোলাপী ঘ্রাণ আর মিষ্টি রসে মন-প্রাণ ভরে যায়।

জেআই