নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার তমরদ্দি আহমদিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসার প্রিন্সিপাল পদে নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করেছে ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় ও ডিজির প্রতিনিধি। পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী চারজন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র একজন প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ায় মৌখিক পরীক্ষা না নিয়েই নিয়োগ পরীক্ষাটি বাতিল করে উক্ত পদে পুনঃবিজ্ঞপ্তি দেয়ার সুপারিশ করে কতৃপক্ষ।
জানা যায়, গতবছর অক্টোবর মাসের ০৯ তারিখে মাদরাসাটির সাবেক প্রিন্সিপাল মাও: হোছাইন ইন্তিকাল করলে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ঐ মাসের ২৪ তারিখে নতুন প্রিন্সিপাল নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তি মোতাবেক গত ফেব্রুয়ারী মাসের ১১ তারিখে হাতিয়া আদর্শ মহিলা কলেজে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ইউছুফ ও ডিজি প্রতিনিধি মোঃ ওয়াহিদুর রহমান।
পুন: বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সুপারিশের পর কর্তৃপক্ষ ফেব্রুয়ারীর ২০ তারিখে দৈনিক সমকালে নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। তবে উক্ত বিজ্ঞপ্তিতে ‘পুনঃবিজ্ঞপ্তি’ কথাটি উল্লেখ করা হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ইউছুফের সাথে এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান উক্ত নিয়োগ পরীক্ষায় এগারজন আবেদনকারীর মধ্যে চারজন আবেদনকারী অংশগ্রহণ করে। অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের মধ্যে মাত্র একজন প্রার্থী উত্তীর্ণ হয়। পরবর্তীতে নিয়োগ বোর্ডের সদস্যগণ নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষাসহ অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে উদ্যোগী হলে ডিজির প্রতিনিধি ওয়াহিদুর রহমান জানান ‘অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কমপক্ষে তিনজন উত্তীর্ণ হওয়ার বিধান রয়েছে। অন্যথায় নিয়োগ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।’
ড. ইউছুফ জানান তিনি উত্তীর্ণ প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে ইচ্ছুক থাকলেও ডিজির প্রতিনিধি উক্ত আইনটি তুলে ধরায় নিয়োগের পরবর্তী কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।
কিন্তু পরবর্তীতে জানা যায় ডিজি প্রতিনিধি কর্তৃক উত্থাপিত উক্ত আইনটির কোন ভিত্তি নেই। একজন পাশ করলেও নিয়োগ দেয়ার বিধান রয়েছে। ডিজির প্রতিনিধি কেন উক্ত আইনটি উত্থাপন করে নিয়োগ কার্যক্রম অসম্পন্ন রাখেন তা বোধগম্য নয় বলে জানান ড. ইউছুফ।
তবে অভিযোগকারীরা মনে করেন ডিজি প্রতিনিধি একজন প্রার্থী থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়েছেন। কিন্তু ঐ প্রার্থী উত্তীর্ণ না হওয়ায় ডিজি প্রতিনিধি ঐ ভুয়া আইনটি উল্লেখ করে নিয়োগ প্রক্রিয়া অসম্পন্ন রাখেন।
এদিকে সরেজমিন ঘুরে আরো লোমহর্ষক তথ্য পাওয়া যায়। এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে মোটা অংকের টাকা লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। জানা যায় স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়ার জন্য প্রায় পনের লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয় এবং পছন্দের ঐ প্রার্থী যাতে নির্বিঘ্নে নিয়োগ পেতে পারে এজন্য সাতজন প্রার্থীকে পূর্বেই পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত না হওয়ার জন্য কঠোরভাবে নিষেধ করে দেয়। ফলে পছন্দের ঐ প্রার্থী ও তার দুই সহযোগীসহ মোট চারজন প্রার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। কয়েকজন প্রার্থীর সাথে মুঠোফোনে আলাপচারিতায় এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়।
এদতস্বত্বেও পছন্দের প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় অযোগ্য প্রমাণিত হওয়ায় ঘটে আসল বিপত্তি। বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। টাকা লেনদেন ও প্রার্থীদেরকে পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত না হওয়ার হুমকির বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে। ক্ষোভে ফেটে পড়ে শিক্ষার্থীবৃন্দ, মাদরাসার শিক্ষক ও জনসাধারণ। মাদরাসা ও মাদরাসার পাশ্ববর্তী পাড়া, মহল্লা ও বাজারে এর বিরুদ্ধে মিছিল ও লিফলেট বিতরণ করে। দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার সাঁটায়। তবে কর্তৃপক্ষ টের পেয়ে ভাড়াটে লোক দিয়ে রাতারাতি পোস্টারগুলো সরিয়ে ফেলেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
কয়েকজন বিক্ষোভকারীর সাথে কথা বললে তারা জানায়- ‘টাকার বিনিময়ে কোন অযোগ্য ব্যক্তিকে মাদরাসার প্রিন্সিপাল হিসেবে আমরা দেখতে চাই না। এই মাদরাসাকে ধ্বংস করার এই অপচেষ্টা যে কোন মূল্যে আমরা প্রতিহত করবো’।
এই বিষয়ে মাদরাসার সভাপতি ও তমরদ্দি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান কামাল উদ্দীনের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি ছাত্র জনতার বিক্ষোভের কথা স্বীকার করলেও টাকা লেনদেনের বিষয়টি অস্বীকার করেন।
অন্যদিকে যে প্রার্থীর নিকট থেকে পনের লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে এবং যিনি গত নিয়োগ পরীক্ষার অযোগ্য প্রমাণিত হয়েছেন তিনি নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর আবারো আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে। মাদরাসার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনসাধারণ আশংকা করছেন কর্তৃপক্ষ উক্ত প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়ার জন্য আবারো যে কোন অসদুপায় অবলম্বন করার চেষ্টা করবে। এই বিষয়ে তারা ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় ও ডিজির হস্তক্ষেপ কামনা করেন এবং যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগদানের দাবী জানান।
কয়েকজন প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, কর্তৃপক্ষ পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগদানের জন্যই নতুন বিজ্ঞপ্তিতে ‘পুনঃবিজ্ঞপ্তি’ কথাটি উল্লেখ করেনি। বিশ্বস্তসূত্রে জানা যায় ঐ প্রার্থীর নাম মো: কামাল উদ্দীন ওরফে বজ কামাল। প্রার্থীরা আশংকা করছেন এবারও পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত না হওয়ার জন্য হুমকি আসতে পারে।
আরেকটি সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় এই টাকা লেনদেনের সাথে তমরদ্দি হাই স্কুল এন্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নূরুল আলম ওরফে শাহাবুদ্দীন জড়িত। পেশায় শিক্ষক হলেও এই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হাতিয়ার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে দালালি করে বেড়ান বলে অভিযোগ রয়েছে।





