বিষ নজরে পড়েছে বরেন্দ্র অঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসীদের ভূমি। ফলে তাদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। ঘটছে হামলা, ধর্ষণ, হত্যা ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের মত নৃশংস ঘটনা।

নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে ১০ বছরে বরেন্দ্র অঞ্চলের ৫ হাজারের বেশি আদিবাসী দেশ ছেড়েছেন। জমি জবর দখল ও বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করতেই ভূমিদস্যুরা এ ধরনের সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটাচ্ছে বলে অভিযোগ আদিবাসীদের।

জানা গেছে, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে নয়জন আদিবাসী ভূমিদস্যুদের হামলায় খুন হয়েছেন। দখল করে নেয়া হয়েছে কয়েকশ বিঘা জমি ও বসতভিটা। আহত হয়েছেন কয়েকশ আদিবাসী। এসব ঘটনার বিপরীতে মামলা হয়েছে কয়েকটি মাত্র। কিন্তু বিচার পাননি নির্যাতিত আদিবাসীরা।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ এই ৪ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার জিনারপুর গ্রামের মংলা উরাওয়ের স্ত্রী বিচিত্রা তির্কি নিজ জমিতে আমন ধানের চারা রোপণ করছিলেন।

এসময় জিনারপুর গ্রামের ভূমি সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত আফজাল হোসেনের নেতৃত্বে ২৫- ৩০ জন সন্ত্রাসী নিয়ে বিচিত্রা তির্কির ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় ও যৌন নির্যাতন করে। সন্ত্রাসীরা সেদিন তির্কির হালের জোড়া মহিষ, পাওয়ার টিলার ও বাড়ি থেকে সেলাই মেশিনটিও লুট করে নিয়ে যায়।

অথচ গোমস্তাপুরের পার্বতীপুর ইউনিয়নের নারী সদস্য এবং জাতীয় আদিবাসী পরিষদ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি হিসাবে বিচিত্রা তির্কি একজন সম্মানিত নারী।

তির্কিকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন স্থানীয় লোকজন। ঘটনায় আফজাল হোসেনসহ ১৮ জনকে আসামী করে গোমস্তাপুর থানায় মামলা দায়ের হলে পুলিশ অভিযান চালিয়ে মাত্র ৪ আসামীকে আটক করে, বাকী আসামীরা আটক হয়নি আজও।

২০১২ সালের ৩১ মার্চ গোদাগাড়ী উপজেলার সোগুনা জীবনপাড়া গ্রামে বাসরত আদিবাসীদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ঘটায় ভূমি সন্ত্রাসীরা। তানোর উপজেলার সাত পুকুরিয়া গ্রামের সব্দল মণ্ডলের ছেলে ফজলে রাব্বিসহ ১০-১২ জন ভূমি সন্ত্রাসী রাতে রামেশ্বর বাস্কির বাড়িতে ভাংচুর চালায়। একপর্যায়ে আরও ৫টি আদিবাসী বাড়িতে তাণ্ডব চালানো শেষে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায়।

আদিবাসীরা এ ঘটনায় গোদাগাড়ী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। কিন্তু পুলিশ সন্ত্রাসীদের আটক করতে পারেনি।

২০১৩ সালে গোদাগাড়ী উপজেলার আদাড়পাড়া গ্রামে ধীরেনের ২৪ বিঘা ফসলি জমি জবর দখল করে নেয় ভূমি সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত তসলিম উদ্দীন। স্থানীয় যুবলীগের এক নেতার ছত্রছায়ায় থাকায় তসলিমের বিরুদ্ধে নেই কোন পুলিশি পদক্ষেপ।

উপজেলার কাকনহাট নোন্দাপুর গ্রামে ৩ বিঘা জমিকে কবরস্থান হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন আদিবাসীরা। গত জুলাই মাসে হঠাৎ করে ভূমি সন্ত্রাসীরা কবরস্থানটি জবর দখল করতে গেলে স্থানীয় আদিবাসীরা বাধা দেয়। সে থেকে কবর স্থানটি ছেড়ে দেয়ার জন্য ভূমি সন্ত্রাসীরা হুমকি দিয়ে চলেছে স্থানীয় আদিবাসীদের।

নোন্দাপুর গ্রামে জ্যাকবের ৬ বিঘা ফসলি জমি দখল করে নিয়েছে স্থানীয় ভূমি সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় জ্যাকব গোদাগাড়ী মডেল থানায় মামলা দায়ের করলেও উদ্ধার হয়নি তার জমি।
২০১২ সালে নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার জাম্বু চরে ৪ আদিবাসী কৃষি শ্রমিককে হত্যা করে ভূমি সন্ত্রাসীরা। ২০১৪ সালের ১১ জানুয়ারি গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অবিদীয় মারান্ডিকে হত্যা করা হয়। ২০১২ সালে নওগাঁর বদলগাছিতে ৫ বছরের আদিবাসী শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। গত ২৫ আগষ্ট তানোর উপজেলার বেলপুকুর গ্রামে গোবিন্দ হাসদা (৪৫) নামের এক আদিবাসীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

এছাড়াও নাচোল, নিয়ামতপুর, মহাদেবপুরসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ভূমি সংক্রান্ত বিষয়ে শতাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে।

জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক বিমল চন্দ্র রাজোয়াড় জানান, ‘ভূমি অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে ভূমি সন্ত্রাসীরা আদিবাসীদের জমির দলিল জাল করে জবর দখল করার চেষ্টা করছে। ভূমি সন্ত্রাসীদের জমি দখলে বাধা দিতে গিয়ে গত ২ বছরে উত্তরাঞ্চলে ৯ জন আদিবাসী হত্যার শিকার হয়েছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক আদিবাসী।

বিমল রাজোয়াড় আরও জানান, ভূমি সন্ত্রাসীদের নির্যাতনের শিকার হয়ে আদিবাসীরা কম দামে জমি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। আতঙ্কিত হয়ে কোন কোন আদিবাসী বসতভিটা ও জমি হারিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পাড়ি জমাচ্ছেন। গত ১০ বছরে বরেন্দ্র অঞ্চলের ৫ হাজারের বেশি আদিবাসী পরিবার দেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেছেন।

এ ব্যাপারে পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত ডিআইজি খোরশেদ আলম বলেন, আদিবাসীদের ওপর হামলার বিষয়টি পুলিশ সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। এ ব্যাপারে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী পুলিশ কাজ করছে। আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে ভূমি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে। এছাড়া আদিবাসীদের নিরাপত্তা জোরদার করেছে পুলিশ।

ঢাকা, ৩ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, জেআই