দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ ঈদুল আজহা উদযাপন করছে আজ। সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে এসব স্থানে কোরবানির ঈদ উদ্‌যাপন করা হচ্ছে। পবিত্র হজ পালন শেষে সৌদি আরবেও ঈদুল আজহা উদযাপিত হচ্ছে আজ। ঈদুল আজহা পালন নিয়ে আলেম সমাজের মাঝে চিন্তাগত পার্থক্যের কারনেই দীর্ঘ দিন থেকে সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে দেশের বিভিন্ন স্থানে কেউ কেউ ঈদ উদযাপন করে থাকেন।

জানাগেছে, এবার সারাদেশে প্রায় ২ শতাধিক গ্রামের পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ আগাম ঈদ পালন করছেন। তবে সংখ্যার আধিক্যের দিক থেকে এবারই এত বেশী মানুষ একদিন আগে ঈদ উদযাপন করছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ি নিম্নে বিভিন্ন জেলার মানুষদের ঈদ উদযাপনের বিষয় তুলে ধরা হলো।

চাঁদপুর

প্রতি বছরের ন্যায় আজও চাঁদপুরের ৪০টি গ্রামে সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে পালিত হলো ঈদুল আজহা। এসব গ্রামে সকাল আটটা থেকে নয়টার মধ্যে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাঁরা গরু-ছাগল কোরবানি করেন।

ঈদের জামাত শেষে মামুনুর রহমান নামে এক মোসল্লি বলেন, হাজীগঞ্জ উপজেলার বড়কুল পশ্চিম ইউনিয়নের সাদ্রা হামিদিয়া দাখিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ মরহুম মাওলানা ইছহাক ১৯৩১ সাল থেকে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ইসলামের সব ধর্মীয় রীতিনীতি প্রচলন শুরু করেন।
মাওলানা ইছহাকের মৃত্যুর পর থেকে তাঁর ছয় ছেলে এ রীতি অনুসরণ করে আসছেন। এভাবে জেলার হাজীগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ, মতলব দক্ষিণ ও কচুয়া উপজেলার ৪০টি গ্রামে অধিকাংশ মুসলিম আগাম রোজা,ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা উদযাপন করেন।

পটুয়াখালী
পটুয়াখালীর ২২টি গ্রামে আজ সোমবার পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হচ্ছে। সকাল ১০টায় পটুয়াখালীর সদর উপজেলার বদরপুর ইউনিয়নের বদরপুর দরবার শরীফ জামে মসজিদে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ইমামতি করেন বদরপুর দরবার শরীফের পীর সাহেবের ভাগনে বাকি বিল্লাহ্ মিসকাব চৌধুরী। নামাজ শেষে দেশ, জাতি ও বিশ্ব মুসলিম উম্মার শান্তি কামনায় মোনাজাত করা হয়।

বদরপুর দরবার শরীফের পরিচালক মোহাম্মদ নাজমুস সায়াদাত আখন্দ জানান, এ বছরও জেলার সদর উপজেলার বদরপুর ও ছোট বিঘাই,গলাচিপা উপজেলার সেনের হাওলা, পশুরীবুনিয়া, নিজ হাওলা ও কানকুনিপাড়া, বাউফল উপজেলার মদনপুরা, শাপলাখালী, বগা, ধাউরাভাঙ্গা, সুরদী, সাবুপুরা ও আমিরাবাদ এবং কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া, নিশানবাড়িয়া, মরিচবুনিয়া, উত্তর লালুয়া, মাঝিবাড়ি, টিয়াখালীর ইটবাড়িয়া, পৌরশহরের নাইয়াপট্টি, বাদুরতলী, মিঠাগঞ্জ ইউনিয়নের সাফাখালী—এই ২২ গ্রামের পাঁচ হাজারোর বেশি পরিবার ঈদুল আজহা উদযাপন করছে ।

চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার প্রায় ৩০ গ্রামে কিছু মানুষ সোমবার (১২সেপ্টেম্বর) পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করছেন। সাতকানিয়ার মির্জারখীল দরবার শরীফের মুরিদরা সৌদিআরবের সাথে মিল রেখে এবারও একদিন আগে ঈদ উদযাপন করছেন।

সাতকানিয়া ও চন্দনাইশ উপজেলার এসব গ্রামের বাসিন্দারা সকালে নিজ নিজ মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। এরপর গ্রামে গ্রামে পশু কোরবানি করে ঈদুল আজহা উদযাপন করছেন।

সোমবার সকাল ১০টায় মির্জারখীল দরবার শরীফে ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করেছেন হাজারো মুসল্লী। দরবার শরীফের পীর হয়রত মৌলানা মোহাম্মদ আরেফুল হাই এর বড় ছেলে মুফতি মৌলানা মোহাম্মদ মকছুদুর রহমান ঈদের নামাজে ইমামতি করেন।

চট্টগ্রাম ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা মির্জারখীল দরবার শরীফের অনেক মুরিদ ঈদের নামাজে শরীক হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সাংবাদিক দিদারুল আলম।
তিনি জানান,দরবার শরীফ ছাড়াও বিভিন্ন গ্রামে মুরিদরা ঈদ জামাতের আয়োজন করেছেন।

মির্জারখীল দরবার শরীফ সূত্রমতে, সাতকানিয়ার মির্জাখীল, গাটিয়া ডেঙ্গা, মাদার্শা, চন্দনাইশের কাঞ্চননগর, হারাল, বাইনজুরি, কানাই মাদারি, সাতবাড়িয়া, বরকল, দোহাজারী, জামিরজুরি, বাঁশখালীর কালিপুর, চাম্বল, শেখের খীল, ডোংরা, ছনুয়া, আনোয়ারার বরুমছড়া, তৈলারদ্বীপ, লোহাগাড়ার পুটিবিলা, কলাউজান, বড়হাতিয়া এবং পটিয়া, বোয়ালখালী, হাটহাজারী, সন্দ্বীপ, রাউজান, ফটিকছড়ির কিছু এলাকাসহ চট্টগ্রামের মোট ত্রিশটি গ্রামের কিছু সংখ্যক মানুষ সোমবার ঈদুল আজহা উদযাপন করছেন।

এছাড়াও এ পীরের অনুসারি পার্বত্য জেলা বান্দরবানের লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, কক্সবাজারের চকরিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও হ্নীলা বেশ কয়েকটি গ্রামের কিছু লোক একই সময়ে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন।

জানাযায়, প্রায় দুশ বছর আগে তৎকালীন পীর মাওলানা মুখলেছুর রহমান (রহ:) পৃথিবীর অন্য যেকোন দেশে চাঁদ দেখা গেলেই রোজা, ঈদ এবং কোরবানী পালনের নিয়ম প্রবর্তন করেন। এরপর থেকে সারাদেশে মির্জাখীল দরবারের অনুসারীরা এ নিয়ম পালন করে আসছেন।

লক্ষ্মীপুর
লক্ষ্মীপুরে ১০টি গ্রামে ঈদুল আজহা উদযাপিত হচ্ছে আজ। জেলার রামগঞ্জ উপজেলার নোয়াগাঁও, জয়পুরা, বিঘা, বারো ঘরিয়া, হোটাটিয়া, শারশোই, কাঞ্চনপুর ও রায়পুর উপজেলার কলাকোপা গ্রামসহ ১০টি গ্রামের প্রায় তিন সহস্রাধিক মানুষ ঈদুল আজহা উদযাপন করছেন।
সোমবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে রামগঞ্জ উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের দক্ষিণ পূর্ব তালিমুন কোরান নূরানী মাদ্রাসা মাঠে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন মাওলানা নেছার আহমদ।

এছাড়া পৃথকভাবে বিভিন্ন সময়ে স্ব স্ব ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করা হয়। নামাজ শেষে পশু কোরবানি করেন তারা।

১৯৮৩ সাল থেকে মরহুম পীর মাওলানা ইসহাকের (র:) অনুসারীরা সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে এসব ঈদ উদযাপন করে আসছেন।

ঝিনাইদহ
ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করেছেন ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ড উপজেলার ১০টি গ্রামের কিছু মানুষ।
সোমবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টায় উপজেলার দুলদুল মিয়ার চাঁতালে এ নামাজ আদায় করা হয়। এতে ইমামতি করেন মাওলানা আসাদুজ্জামান।

মাওলানা আসাদুজ্জামান জানান, সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে উপজেলার হরিণাকুণ্ড, ভালকী, পায়রাডাঙ্গা, বৈঠাপাড়া, কুলবাড়িয়া, বোয়ালিয়া ও পার্বতীপুরসহ ১০টি গ্রাম থেকে ৫২ জন মুসল্লি একত্রিত হয়ে ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করেছেন।

বরিশাল ও পটুয়াখালী

বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলার কিছু এলাকায় পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করছে প্রায় সহস্রাধিক পরিবার।

সোমবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকালে‍ ‌"‍চট্টগ্রামের চন্দনাইশ শাহ-সুফি দরবার শরীফ,সাতকানিয়া মির্জাখালী দরবার শরীফ এবং আহমাদিয়া জামাতের অনুসারী"রা সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদের নামাজ আদায় করেন। পরে তারা পশু কোরবানি দেন।

সকাল ৯টায় বরিশাল নগরীর ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের তাজকাঠি জাহাঁগিরিয়া শাহ সুফি মমতাজিয়া জামে মসজিদ মাঠে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন মাওলানা মো. দেলোয়ার হোসাইন।
এছাড়া নগরীর ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে হরিণাফুলিয়া চৌধুরীবাড়ি শাহ সুফি মমতাজিয়া জামে মসজিদ,২২ নম্বর ওয়ার্ডে জিয়া সড়ক শাহ সুফি মমতাজিয়া মসজিদে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।

বরিশাল সদর উপজেলার সাহেবের হাটে ২টি, বাবুগঞ্জে ৪টি, হিজলায় ২টি, মেহেন্দিগঞ্জে ২টি, বাকেরগঞ্জে ১টি, পটুয়াখালীর বাউফলে ১০টি, গলাচিপায় ১টি, রাঙ্গাবালীতে ৯টি, কলাপাড়ায় ১১টি,ঝালকাঠিতে ১টি ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বরগুনা
বরগুনার ১০টি গ্রামের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ ঈদুল আজহা উদযাপন করছেন।
সোমবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টায় বরগুনার বেতাগী উপজেলার বকুলতলী গ্রামে তাদের ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন হাফেজ মো. রমজান আলী।

এছাড়াও জেলার পৌর শহরের আমতলা,সদর ইউনিয়নের পাজরাভাঙ্গা,কালিরতবক,গৌরীচন্না ইউনিয়নের ধুপতি,গৌরীচন্না,বেতাগী উপজেলার কাজিরাবাদ ইউনিয়নের বকুলতলী,আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের গোজখালী,কুকুয়া ইউনিয়নের কুকুয়া,পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়নের সিংড়াবুনিয়া ও কাকচিড়া গ্রামের মানুষ ঈদ উদযাপন করছেন।

নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার লামাপাড়া এলাকায় পবিত্র ঈদুল আজহার নামাজ আদায় ও কোরবানি দিয়েছেন মুসল্লিরা।

সোমবার (১২ সেপ্টেম্বর) হযরত শাহ্ সুফী মমতাজিয়া এতিমখানা ও হেফজখানা মাদ্রাসায় ‘জাহাগিরিয়া তরিকার’ অনুসারীরা সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ উদযাপন করেন এবং পশু কোরবানি দেন। ঈদের জামাতে অংশ নিতে গাজীপুরের টঙ্গী, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, পুরান ঢাকা, ডেমরা, সাভার এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, বন্দর ও সোনারগাঁ উপজেলা থেকে মুসল্লিরা অংশ নেন বলে জানাগেছে।
ঈদের জামাতে ইমামতি করেন মমতাজিয়া মাদ্রাসার মুফতি মাওলানা আনোয়ার হোসেন শুভ।

হযরত শাহ্ সুফী মমতাজিয়া মাদ্রাসার মুফতি মাওলানা আনোয়ার হোসেন বলেন,তারা হযরত হানাফি (র:) মাযহাবের অনুসারী। হানাফির মাযহাবের মতে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে চাঁদ দেখা গেলে ঈদ পালন করার বিধান রয়েছে। তার সাথে থাকা অন্য একজন তার বক্তব্য সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, জাহাগিরিয়া তরিকার অনুসারীরা গত একশ' বছর আগ থেকে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে চাঁদ দেখা গেলে তারা ঈদ ও কোরবানি করে আসছেন।

এ বিষয়ে জামেয়া কোরানিয়া লালবাগ মাদ্রাসার শিক্ষক ও ইসলামী ঐক্য জোটের মহাসচিব মুফতি ফয়েজ উল্লাহ বলেন, হাদিসের আলোকে চাঁদ দেখে রোজা রাখা বা ঈদ পালন করার কথা বলা হয়েছে। একই সময়ে পৃথীবির সব জায়গায় চাঁদ দেখা যায়না, যেমন বাংলাদেশে যখন ১১ তারিখ আমেরিকাতে তখন ১২ তারিখ। সুতরাং চাঁদ দেখে ঈদ করলে সারা বিশ্বে একই সময়ে করা যায়না।
তিনি বলেন, এ বিষয়টি হাজার বছর থেকে সুরাহাকৃত । সুতরাং যারা এভাবে ঈদ পালন করছে তাদের ফিরে আসা উচিৎ।

মসজিদ মিশনের সেক্রেটারি ড. খলিলুর রহমান মাদানি বলেন, মতপার্থক্য ইসলামের একটি সৌন্দর্য, সাহাবায়ে কেরামের সময় থেকে এই মতপার্থক্য চলে আসছে। চাঁদ দেখেই মাস হিসাব করার বিষয়ে রাসুল (স:) এর নির্দেশনা দেয়া আছে। তবে সারা পৃথিবিতে একই সময়ে চাঁদ দেখা সম্ভব নয়। যখন যেদিকে চাঁদ দেখা যাবে সে আলোকে মাস গননা করে রোজা, ঈদ পালন করা উচিৎ।