পাক-ভারত উপ-মহাদেশে মুসলিম জাতিসত্তার প্রাণ পুরুষ, মুসলমানদের ঈমান ও আকীদা বিশ্বাসের আলোকে জীবন যাপন, সর্বোপরি বৃটিশ ভারতে অবহেলিত, বঞ্চিত মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য একটি নিরাপদ, স্বাধীন সার্বভৌম মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অগ্রনায়ক নবাব স্যার সলিমুল্লাহ বাহাদুরের শত তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ ১৬ই জানুয়ারি শুক্রবার। ১৯১৫ সালের এই দিনে তিনি ইন্তেকাল করেন।
নবাব স্যার সলিমুল্লাহ’র মৃত্যু বার্ষিকী যথাযথ মর্যাদায় উদযাপনের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন পৃথক পৃথকভাবে দিনব্যাপী কর্মসূচী পালন করে। কর্মসূচীর মধ্যে ছিল নবাবের বেগম বাজার মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পন, ফাতেহা পাঠ, আলোচনা সভা, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল।
নবাব স্যার সলিমুল্লাহ মেমোরিয়াল কমিটির কর্মসূচী
নবাব স্যার সলিমুল্লাহ মেমোরিয়াল কমিটির প্রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ নাসরুল আহসানের নেতৃত্বে কমিটির নেতাকর্মী ও সর্বস্তরের জনতা শুক্রবার সকালে নবাবের মাজারে শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন, পুষ্পস্তবক অর্পন ও ফাতেহা পাঠ করে। বাদ জুমা স্থানীয় মসজিদে মিলাদ ও বিশেষ দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।
উল্লেখ্য নবাব স্যার সলিমুল্লাহ শুধুমাত্র পাক-ভারত উপ-মহাদেশে মুসলিম জাতিসত্তা বিকাশেই কাজ করেননি। তিনি ছিলেন এক মহান জ্ঞান-তাপস। বৃটিশ শাসিত ভারতের ১৯০৫ সালে বঙ্গবঙ্গের মাধ্যমে ঢাকা পূর্ব বাংলার রাজধানীর মর্যাদা পায়। এতে করে পিছিয়ে পড়া মুসলিম জনগোষ্ঠী উন্নয়নের ক্ষীণ আলোকবর্তিকা দেখতে পায়।
কিন্তু ষড়যন্ত্রের ফলে ১৯১১ সালে আবারও বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ায় পূর্ব বাংলার মুসলিম জনগোষ্ঠীর জীবনে নেমে আসে অমানিশার ঘোর কালো অন্ধকার। সে সময় নবাব স্যার সলিমুল্লাহ মুসলমানদের ভাগ্যের উন্নয়নের জন্য কান্ডারির ভূমিকা পালন করেন।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য জমি প্রদানসহ সার্বিক আর্থিক সহযোগিতা করেন। নবাবের মৃত্যুর পর তাঁর ব্রেন-চাইল্ড খ্যাত শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেন। কাজেই আক্ষরিক অর্থেই বলতে হয় নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ছিলেন এক মহান ব্যক্তি। একটি জীবন। একটি ইতিহাস।
আজকে পরিতাপের সাথে লক্ষ্য করা যায় নবাব স্যার সলিমুল্লাহর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল প্রাচ্যের অক্সফোর্টখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ উপেক্ষিত। বিশ্ববিদ্যালয় দিবসেও নবাবের নাম উচ্চারিত হয় না। গত জুলাই মাসে সাড়ম্বরে উদযাপিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস।
বিভিন্নমুখী অনুষ্ঠানমালা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু কোথাও নবাব স্যার সলিমুল্লাহ বাহাদুরের নামটি পর্যন্ত উচ্চারিত হয়নি। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে যিনি সবচেয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিলেন, কলকাতার গড়ের মাঠে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে জমিদারদের সমাবেশে যিনি পৌরহিত্য করেছিলেন আজকে তার নামে চেয়ার থাকলেও নবাব সলিমুল্লাহ উপেক্ষিত।
এমনকি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের নামটিও অনেকে সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে চান না, এসব কুপমন্ডুকথা জাতিকে অবশ্যই পিছিয়ে দিবে।
নবাব স্যার সলিমুল্লাহর অন্যতম কাজ হচ্ছে পাক-ভারত উপ-মহাদেশে মুসলিম জনগোষ্ঠীর স্বার্থে ১৯০৬ সালে ঢাকায় অল-ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা করা।
পরবর্তীতে ১৯৪০ সালে বাঙলার বাঘ খ্যাত শেরে বাংলা একে ফজলুল হক লাহোরে মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার জন্য উপ-মহাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে একাধিক মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন।
যা ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব নামে খ্যাত। লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতেই ১৯৪৭ সালে উপ-মহাদেশে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। কাজেই মুসলিম জাতিসত্তার প্রাণপুরুষ নবাব স্যার সলিমুল্লাহকে অন্ধকারে রেখে জাতির অগ্রগতি সম্ভব নয়।
নবাবের শততম মৃত্যুবার্ষিকীতে এক বিবৃতিতে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ মেমোরিয়াল কমিটির প্রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ নাসরুল আহসান উল্লেখিত বক্তব্য প্রদান করেন।
তিনি বলেন, আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব এবং জাতিগত অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্যই নবাব স্যার সলিমুল্লাহর অবদানকে স্বীকার করতে হবে।
জনাব নাসরুল সলিমুল্লাহ এতিমখানা, একসময়ের সলিমুল্লাহর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ-আজকের বুয়েট সহ হাজারো শিক্ষা ও সেবামূলক কাজের উল্লেখ করে বলেন, পূর্ব বাংলার মুসলমানদের জন্য নবাব সলিমুল্লাহর অবদান কেউ মুছে ফেলতে পারবে না।
এসএইচ





