দেশে উৎপাদিত মোট গ্যাসের ১২ শতাংশ গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত হলেও তার চেয়ে বেশি গ্যাস ফুরোচ্ছে সিস্টেম লসের নামে পুকুরচুরি, অনিয়ম-দুর্নীতি, অপচয় আর অবৈধ সংযোগে। বিষয়টি ওপেনসিক্রেট হলেও তা ঠেকাতে কখনো কোনো উদ্যোগ নেয়নি সরকার।

বরং দুর্নীতিবাজদের পকেট ভরতে বিভিন্ন সময় নতুন নতুন সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। তাই এ চক্র এবার সরকারকে নয়-ছয় বুঝিয়ে আবাসিকের বৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সে পথ আরো প্রশস্ত করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে বলে অনেকেই অভিযোগ তুলেছে।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দাবি, সরকার বিশেষ উদ্দেশ্যে বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) আমদানির টার্গেট করেছে। আর সেই প্রকল্প সফল করতেই গৃহস্থালির কাজে দেশীয় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করার চিন্তাভাবনা করছে।
তাদের ভাষ্য, অনিয়ম-দুর্নীতি, অপচয়, অবৈধ সংযোগ ও সিস্টেম লসের নামে প্রতিদিন যে গ্যাস চুরি হচ্ছে তা ঠেকানো গেলে বাসা-বাড়ির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কোনো প্রয়োজন হবে না। বরং সেখান থেকে উদ্বৃত্ত গ্যাস শিল্প-কারখানায় সরবরাহ করা যাবে। অথচ সরকার সে পথে না গিয়ে উল্টো পথে হাঁটছে। যার নেতিবাচক প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, আবাসিকের বৈধ গ্রাহকদের কাছ থেকে কোনো অবৈধ সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় দুর্নীতিবাজচক্র এ ব্যাপারে সরকারকে ভুল বোঝাচ্ছে। আর এ ফাঁদে পা দিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীসহ একাধিক মন্ত্রী-আমলা-নীতিনির্ধারক আবাসিকের বৈধ সংযোগ বন্ধের পক্ষ নিয়েছেন। দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার অজুহাতে আবাসিকের বৈধ সংযোগ বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হলেও অবৈধ সংযোগসহ নানা ধরনের চুরি ঠেকাতে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেই_তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন।
বেসরকারি একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দো তথ্য অনুযায়ী, ত্রুটিপূর্ণ মিটার ও মিটার টেম্পারিংসহ নানা চুরি ও অবৈধ সংযোগে প্রায় ৯ শতাংশ গ্যাসের অপচয় হচ্ছে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্টদের অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে সরকার আরো প্রায় ৪ শতাংশ গ্যাসের রাজস্ব হারাচ্ছে বলে তাদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। তবে তিতাসের শীর্ষ কর্মকর্তারা এসব তথ্য ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।
যদিও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) একাধিকবার এ ধরনের চুরি-অপচয় ও লুটপাটের ছকচিত্র প্রকাশ করেছে। আইএমইডি বলছে, সিস্টেম লসের জন্য আর্থিক ক্ষতি রোধ করতে দ্রুত ত্রুটিপূর্ণ গ্যাস সরবরাহ লাইন সংস্কার, অবৈধ সংযোগ বন্ধ এবং সঠিকভাবে গ্যাসের বিল তৈরি করতে হবে। এই তিনটি কারণ তিতাসকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির একটি প্রকল্পের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে এ তথ্য দেয় আইএমইডি। প্রকল্পটির কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ই. জেন কনসালট্যান্টস লিমিটেড ও ক্রিয়েটিভ কনসাল্টিং লিমিটেড কাজ করে। এ জন্য তারা নারায়ণগঞ্জ সদর, ফতুল্লা ও মুন্সিগঞ্জ (অঞ্চল-১) এবং নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ (অঞ্চল-২) বেছে নেয়। এসব জায়গায় গৃহস্থালি গ্রাহকের পাশাপাশি ৩৮টি সিএনজি স্টেশন, ৩০৩টি ক্যাপটিভ পাওয়ার জেনারেশন স্টেশন এবং ৭১৫টি রি-রোলিং মিলে সংযোগ রয়েছে। বাণিজ্যিক ও গৃহস্থালিভাবে গ্যাস ব্যবহারের পরিমাণ বেশি হওয়ায় গবেষণার জন্য এ এলাকা বেছে নেয়া হয়।
আইএমইডির প্রতিবেদন বলছে, ২০১৪ সালের প্রথম তিন মাসে অঞ্চল-১ এ ১৯ কোটি ২০ লাখ ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহ হয়। তবে ওই তিন মাসে বিল করা হয়েছে ১৭ কোটি ৩৭ লাখ ঘনমিটার গ্যাসের। একই সময়ে অঞ্চল-২ এ ৩০ কোটি ৪১ লাখ ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহ করা হলেও ২৭ কোটি ৮৯ লাখ ঘনমিটারের বিল করা হয়েছে। অর্থাৎ, দুটি অঞ্চলে চার কোটি ৩৫ লাখ ঘনমিটার গ্যাসের দাম পাওয়া যায়নি, যা সরবরাহ করা গ্যাসের ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
গবেষণালব্ধ ফলের ভিত্তিতে আইএমইডি বলছে, ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশের মধ্যে প্রায় ৬ শতাংশ সিস্টেম লস হয়েছে অবৈধ সংযোগের জন্য।
যদিও প্রতিবেদনটি সঠিক নয় বলে ওই সময় দাবি তোলেন তিতাসের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তারা বলেন, 'গবেষণা এলাকায় গ্যাসের সরবরাহ ও ব্যবহারের হিসাব আইএমইডি ঠিকমতো নিতে পারেনি। আমাদের সরবরাহ লাইনের ক্ষমতা কত, সেটা আমরা জানি। কিন্তু এলাকাভিত্তিক গ্যাস সরবরাহ ও ব্যবহারের কোনো পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই। আইএমইডি কিসের ভিত্তিতে এসব তথ্য জোগাড় করে সিস্টেম লস হিসাব করেছে, তা আমরা জানি না।' বিভিন্ন শিল্প-কারখানার মিটার টেম্পারিং করে, কম বিল দেখিয়ে ও অবৈধ সংযোগ দিয়ে লুটপাটের অভিযোগও অস্বীকার করেন তারা।
অথচ ঢাকার উপকণ্ঠে মাত্র ৫টি এলাকাতেই প্রায় এক লাখ অবৈধ সংযোগ থাকার বিষয়টি খনিজ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়েরই একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে সংসদীয় কমিটি সূত্র জানিয়েছে, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের হিসাবে গত ছয় বছরে তিন হাজার ১৩৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকার গরমিল পাওয়া গেছে। চুরি ও আর্থিক বিধি অনুসরণ না করায় এ গরমিল হয়েছে।
জানা গেছে, তিতাস গ্যাস তাদের বিভিন্ন কাজে ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে ২০১৪-১৫ অর্থ বছর পর্যন্ত ২১২টি নিরীক্ষা (অডিট) আপত্তির কথা জানায়। এর সঙ্গে জড়িত টাকার পরিমাণ তিন হাজার ১৩৮ কোটি ৩৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকা।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অডিট আপত্তি ছিল ২০১২-১৩ ও ২০১৩-১৪ অর্থবছরের। ওই দুই বছর মোট ৭৪টি অডিট আপত্তির সঙ্গে জড়িত টাকার অর্থের পরিমাণ এক হাজার ৩৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
এদিকে গত ৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের চলমান প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়ে এক সভায় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নরসিংদী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলায় ৬শ' কিলোমিটার অবৈধ গ্যাস সরবরাহ লাইন থাকার তথ্য তুলে ধরা হয়। বলা হয়, এই অবৈধ গ্যাস সরবরাহ লাইনের মাধ্যমে ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চুরি হচ্ছে। এ তথ্য পেয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি গ্যাস চুরি বন্ধে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা নেয়ার নির্দেশ দেন তিনি। এরপরই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বড় আকারে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও সরবরাহ লাইন অপসারণে বিশেষ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিলেও রহস্যজনক কারণে তা বেশি দূর এগোতে পারেনি। অথচ দেশে গ্যাস দ্রুত ফুরিয়ে আসছে বলে সরকারি মহলেই জোর প্রচারণা চালাচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, দেশে 'গ্যাস নেই, গ্যাস নেই' এমন বক্তব্য দিয়ে বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশে গ্যাস নেই বলার সময় এখনো হয়নি। বরং এখনো ঠিকমতো গ্যাসের অনুসন্ধানই করা হয়নি।
তিনি বলেন, 'এখনো আমরা সমুদ্রের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কোনো অগ্রগতি অর্জন করতে পারিনি। অথচ মিয়ানমার তাদের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু করে দিয়েছে।'
গ্যাস অনুসন্ধানে জোর না দিয়ে এলএনজি আমদানির দিকে ঝুঁকে পড়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, সারা বিশ্বে এলএনজি একটি ব্যয়বহুল জ্বালানি। উন্নত বিশ্বে এটি ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের মতো দেশ এত ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবহারে সক্ষম নয়। অথচ এটি জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ড. তানজীম উদ্দিন খান যায়যায়দিনকে বলেন, গৃহস্থালির গ্যাস বন্ধের মূলে রয়েছে উচ্চমূল্যে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির হীন উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, গ্যাস উৎপাদনে সীমাবদ্ধতার কথা বলে সরকার একের পর এক বিদেশি কোম্পানিরগুলোর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছে। সর্বশেষ তারা বিদেশ থেকে এলএনজি গ্যাস আমদানির কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। আর সেই প্রকল্প সফল করতেই গৃহাস্থালির কাজে দেশীয় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করার চিন্তাভাবনা করছে।
'বাসাবাড়িতে গ্যাসে রান্না অপচয়' অর্থমন্ত্রীর এমন বক্তব্য প্রসঙ্গে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা কমিটির এই সদস্য বলেন, তিনিসহ সরকারের কর্তাব্যক্তি অনেকেই এলএনজির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এটা যেহুতু বড় প্রকল্প, তাই তারা লাভবানও বেশি। এ কারণেই তারা এর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, তারা যেখানেই নিজেদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয় খুঁজে পান, সেখানেই তারা চুক্তিবদ্ধ হন। বাসাবাড়িতে গ্যাস বন্ধ করে এলএনজি আমদানিও তেমন একটা বিষয়।
জ্বালানি ও খনিজ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে যে গ্যাস ক্ষেত্র রয়েছে এর মধ্যে গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে ৫শ' মিলিয়ন ঘনফুট। মোট উৎপাদিত গ্যাসের ৪২ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে; ১৭ শতাংশ শিল্পে; ১৬ শতাংশ ক্যাপটিভ পাওয়ারে; ১২ শতাংশ গৃহস্থালিতে; ৭ শতাংশ সার-কারখানায়; ৫ শতাংশ সিএনজিতে; ১ শতাংশ বাণিজ্যিক এবং দশমিক ১ শতাংশ চা-বাগানে ব্যবহূত হচ্ছে। সার কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে গড়ে ২৩৭ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু পাচ্ছে গড়ে ৬৬ থেকে ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে গড়ে সাড়ে ১৫শ' মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। পাচ্ছে গড়ে সাড়ে ৭শ' মিলিয়ন ঘনফুট। প্রায় ৯শ'টি ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টে গ্যাস ব্যবহারের পরিমাণ ৩৪০ মিলিয়ন ঘনফুট। এ ছাড়া আবাসিক ও অন্য গ্রাহকদের ১ হাজার ১৬৪ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। যা মোট উৎপাদিত গ্যাসের ৫৩ দশমিক ৬ শতাংশ। বর্তমানে দেশের বিতরণ কোম্পানির অধীনে বৈধ আবাসিক গ্যাস গ্রাহকের সংখ্যা ২৩ লাখের ঊধর্ে্ব। পেট্রো বাংলার হিসাব অনুযায়ী, বৈধ আবাসিক সংযোগে দৈনিক গ্যাস ব্যবহার হয় ২৫ কোটি ঘনফুটের মতো। আর বর্তমানে আবাসিক খাতে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে সাড়ে ২৭ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ মাত্র ২ কোটি ঘনফুট আবাসিক খাতে বৃদ্ধি করা হলেই এই সংকট পুরোপুরি কেটে যাবে।

এসএ/টাইম