যশোরে সরকারিভাবে বোরো ধান সংগ্রহে কৃষকদের বাদ দিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধান কেনার অভিযোগ উঠেছে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকসহ কয়েক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

এতে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছেন অভিযুক্ত কর্মকর্তারা। ফলে বোরো ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে কৃষকরা ক্ষতির শিকার হলেও লাভবান হয়েছে সিন্ডিকেটের ব্যবসায়ী ও খাদ্য গুদাম কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গত বোরো মৌসুমে যশোর সদর উপজেলায় ৩ হাজার ৭১৮ মেট্রিকটন, অভয়নগরে ২ হাজার ২৩০ মেট্রিকটন, বাঘারপাড়ায় ২ হাজার ১২৮ মেট্রিকটন, মণিরামপুরে ৪ হাজার ২৫৩ মেট্রিকটন, চৌগাছায় ১ হাজার ৯৫৩ মেট্রিকটন, শার্শায় ৩ হাজার ৩৬ মেট্রিকটন, কেশবপুরে ২ হাজার ৩৩৬ মেট্রিকটন ও ঝিকরগাছায় ২ হাজার ৫৪৭ মেট্রিকটন মিলে জেলা থেকে মোট ২২ হাজার ২০১ মেট্রিকটন বোরো ধান সরকারিভাবে কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।

পরে নির্ধারিত ৩৬ টাকা কেজি দরে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ১৭ হাজার ৮০০ মেট্রিকটন ধান কেনা হয়। এসব ধান কেনার জন্য প্রতিটি উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে ভর্তুকি তালিকাভুক্ত কৃষকের নাম নেওয়া হয়। কিন্তু ওইসব কৃষককে যৎসামান্য টাকায় ম্যানেজ করে কৃষক কার্ড ভাড়া নিয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধান কিনে জেলার ১০টি খাদ্যগুদাম ভর্তি করেন কর্মকতারা।

সূত্র জানায়, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কামাল হোসেনের মৌখিক নির্দেশে গুদাম কর্মকর্তারা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কাছ থেকে প্রতিটন ধানে ১ হাজার টাকা হারে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা কমিশন আদায় করেন। ওই টাকা থেকে কামাল হোসেন শতকরা ২০ ভাগ হিসেবে প্রায় ৫০ লাখ টাকা হস্তগত করেন।

ঘুষ বাণিজ্যের বাকি প্রায় দেড় কোটি টাকার মধ্যে বিভাগীয় খাদ্য নিয়ন্ত্রক (আরসি ফুড) কাজী নুরুল ইসলাম শতকরা ১০ টাকা হারে প্রায় ২৫ লাখ টাকা নেন। অবশিষ্ট টাকা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, গুদাম কর্মকর্তা, কিছু রাজনৈতিক নেতা ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের ‘কাছের’ কিছু সাংবাদিকের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয়।

মণিরামপুর উপজেলার শ্যামকুড় ইউনিয়নের মোতালেব আলী নামে এক কৃষক বলেন, এবার কৃষকের নির্দিষ্ট কার্ড ছাড়া গুদামে ধান কেনা যাবে না এমন নিয়ম করা হয়। ধান বিক্রি করতে কয়েকবার তিনি উপজেলা গুদাম কর্মকর্তা কাজী মিনারুল ইসলামের কাছে যান।

কিন্তু তার ধান নিতে ওই কর্মকর্তা তালবাহনা করেন। পরে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী ৭০০ টাকার বিনিময়ে তার কার্ড ভাড়া নেন। পরে ওই ব্যবসায়ী ওই কার্ড দেখিয়ে গুদামে ধান বিক্রি করেন।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্র জানায়, ৩০তম বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া বর্তমান জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কামাল হোসেন ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে যশোরে দায়িত্ব পান। এরপর থেকে ক্রমাগত ধান ও চাল ক্রয়, মিলারদের কাছ থেকে নিম্নমানের চাল সংগ্রহ, ওএমএসের আটার অনুকূলে গম বরাদ্দে কমিশন আদায়, মিলের ক্যাপাসিটি বাড়াতে ঘুষ বাণিজ্যসহ নানান দুর্নীতি করে আসছেন তিনি।

তিনি নিজে বা অফিস সহকারী ছালমা চৌধুরীর মাধ্যমে এসব অর্থ লেনদেন করেন। এছাড়া কারণে-অকারণে বিভিন্ন মন্ত্রী ও সচিবের নাম ভাঙিয়ে তিনি জেলা ও উপজেলা কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি দেখান। এতে তার ক্ষমতার দাপটে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা সবসময় তটস্থ থাকেন বলে সূত্র জানায়।

অভয়নগরের এক সাবেক খাদ্য পরিদর্শক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জেলা খাদ্য কর্মকর্তা কামাল হোসেন ১৫ লক্ষাধিক টাকা ঘুষ দিয়ে যশোরে পোস্টিং পেয়েছেন। ‘এই টাকা তো আয় করতে হবে’ এমনটাই তিনি পরিচিত মহলে বলে বেড়ান।

যোগাযোগ করা হলে ঘুষ বাণিজ্য ও ‍দুর্নীতির সব অভিযোগ অস্বীকার করেন যশোর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কামাল হোসেন। তিনি এ অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।

সূত্র:বাংলানিউজ

এমএনজে