দিনকে দিন নারী নির্যাতন বেড়েই চলেছে। নারী নির্যাতনের হার ও বীভৎসতা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে ধর্ষণের মাত্রা।
ব্র্যাকের এক প্রতিবেদন মতে, এক বছরে নারী নির্যাতন বেড়েছে ৭৪%। গণধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ১৪%। আর এসবের অনেক ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলছে অহরহ। দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রীরা যৌন নির্যাতনসহ নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন ছাত্রলীগের হাতে।
এ খবর নতুন নয়, আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় আসে তখনই যেন ধর্ষণের উৎসব শুরু হয়। অনিরাপদ হয়ে পড়ে নারী সমাজ। লোক দেখানো দু-একটি ঘটনায় আটক হলেও ফলাফল শূন্য। : ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার মতায় আসার পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের এক নেতা ধর্ষণের সেঞ্চুরি উৎসব করেছিল।
তখন তিরস্কৃত হলেও ওই ছাত্রলীগ নেতাকে পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি দেয়া হয়। সর্বশেষ কিছুদিন আগে রাজধানীতে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় সাইক পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের শিার্থী ফেরদৌস আফসানাকে। ধর্ষণের পর আফসানাকে পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করে তেজগাঁও কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রবিন।
এ নিয়ে সারাদেশে আন্দোলন চললেও এখনও রবিনকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। : কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় গত মে মাসে দিনাজপুর টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটের এক ছাত্রীর শরীরের পুরো কাপড় খুলে উলঙ্গ করে প্রকাশ্যে দাঁড় করিয়ে ভিডিও ধারণ করে ছাত্রলীগের দুই নেতা সুলতান মাহমুদ শিহাব ও ইমরান হোসাইন । ছাত্রীর আবরু রায় জামার ভেতরের সবকাপড় ও পরনের প্যান্ট খুলে নিয়ে প্রকাশে দাঁড় করিয়ে রাখে। এ সময় ইমরান মোবাইলে ওই ছাত্রীর ভিডিও ধারণ করে। নিজের গোপনাঙ্গ ঢাকার চেষ্টা করলে ওই সময় তারা ছাত্রীকে মারধরও করে।
এই ঘটনায় অভিযুক্ত একজনকে আটক করলেও মূল অভিযুক্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ওই ছাত্রী লিখিত অভিযোগ দিলেও টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট কর্তৃপ ক্ষমতাসীনদের চাপে বিষয়টিকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে। শিার্থীরা জানান, শিহাব কাসে না আসলেও বীরদর্পে এলাকায় চলাফেরা করছে। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় এক বছর ধরে এক মেয়েকে নিয়ে রূপনগর থানা এলাকায় বসবাস করে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক চালিয়ে আসছিলো গাজীপুর জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি একরামুল হক রনি।
পরে বিয়ে করতে রাজি না হওয়ায় ওই মেয়ে চলতি বছরের মে মাসের শেষের দিকে রনিকে আসামি করে থানায় মামলা দায়ের করেন। একরামুল হক রনি শ্রীপুরের পিয়ার আলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং গাজীপুর জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি। গত জুলাই মাসে ধর্ষণ মামলায় আটক হন খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন।
বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নবম শ্রেণির এক ছাত্রীকে দীর্ঘদিন ধরে ধর্ষণ করে আসছিলো ছাত্রলীগের এই নেতা। গত ২২ মে এসএসসি পরীায় উত্তীর্ণ এক ছাত্রীকে কেরানীগঞ্জ থেকে ঢাকায় এনে একটি আবাসিক হোটেলে তুলে ধর্ষণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক তারিকুল ইসলাম। প্রায় দু বছর ধরে রাজশাহীর পুঠিয়া কাউন্সিল পরিষদের কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মরত এক মেয়ের সঙ্গে প্রেমের ছিলো রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের নেতা মাহাবুরের। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অনেকদিন ধরে সে মেয়েটিকে ধর্ষণ করে আসছিল। এরই সূত্র ধরে গত ২৯ জানুয়ারিতে মাহাবুর মেয়েটির বাড়িতে গিয়ে তাকে ধর্ষণ করে। এ সময় এলাকাবাসী বুঝতে পেরে মাহাবুরকে আটকে পুলিশ দেয়।
২০১৪ সালের জুন মাসে চিকিৎ?সা নিতে রাজধানীতে এসে হোটেলকে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক গৃহবধূ (২৬)? ঘটনার দিন গভীর রাতে মগবাজারের এক আবাসিক হোটেলে পাশের কে স্বামীকে বেঁধে রেখে তাকে ধর্ষণ করা হয়? ধর্ষণের অভিযোগে পুলিশ ওই ক থেকে মহানগর ছাত্রলীগের এক নেতা ও তার এক সহযোগীকে ছুরিসহ গ্রেফতার করে? : রমনা থানার পুলিশ জানায়, গ্রেফতার হওয়া দুজন হলেন ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক ইকবাল হোসেন (২৭) ও তার সহযোগী উজ্জ্বল মিয়া (৩৩)। ২০১২ সালের ১০ই এপ্রিল ঢাকা পলিটেকনিক্যাল ইনস্টটিউটের এক ছাত্রীকে দিনে-দুপুরে পালাক্রমে ধর্ষণ করেছে ছাত্রলীগের দুই কর্মী। ক্যাম্পাসের ভেতরেই ওই ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হন।
২০১২ সালে যশোরে দশম শ্রেণির এক মুসলমান ছাত্রীকে সিঁদুর পরিয়ে ধর্ষণ করে শিশির ঘোষ নামে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মী। ২০১০ সালের ৫ জুলাই টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলায় মধ্যযুগীয় কায়দায় এক কিশোরীকে ধর্ষণ করে ছাত্রলীগের যুগ্ম আহবায়ক হাবিবুল্লাহ হাবিব, উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা আরিফ আহমেদসহ কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা। তার পৈশাচিকতা শুধু ধর্ষণ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করে তারা উল্লাস প্রকাশ করে।
এ নিয়ে মামলায় আকাশ নামে একজন গ্রেফতার হলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শওকত শিকদার থানায় গিয়ে আসামি ছেড়ে দেয়ার জন্য পুলিশের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন ও অশোভন আচরণ করেন বলে পরিবারের অভিযোগ। ধর্ষকদের হুমকিতে আত্মরার্থে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় ওই ধর্ষিতার পরিবার। এভাবে প্রতিনিয়তই সরকারি দলের নেতাকর্মীদের ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন নারীরা। এ নিয়ে অভিযোগ করলে অপরাধীর বিচার তো হয়ই না বরং হুমকি-ধমকি ও নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। বাধ্য হয়ে নির্যাতিতদের নিশ্চুপ থাকা ছাড়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। : বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যমতে, চলতি বছরের জুলাই মাসে ৩৭০ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৮০টি।
এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৬ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩ জনকে। তবে বাস্তবে এর সংখ্যা আরো বেশি। পরিষদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সাল থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত, ১১ বছর ২ মাসে বিভিন্নভাবে নির্যাতিত, হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন এবং আত্মহত্যা করেছেন মোট ৫৬ হাজার ৬৫৬ জন নারী। বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের মোট মামলা ছিল ১৭ হাজার ৭৫২টি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ২২০টি।
হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, বিচারাধীন মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হলে এ ধরনের ঘটনা কমে যেত। মূলত বিচার না হওয়ার কারণেই অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছে। তিনি বলেন, পুলিশ অনেক সময় চার্জশিট দিতে দেরি করে। আবার আইনজীবীদেরও কিছুটা গাফিলতি ল্য করা যায়। মানবাধিকার কর্মী ও আসকের পরিচালক (তদন্ত) মো. নুর খান বলেন, দেশে বিচারহীনতা ও প্রতিবাদের ভাষা সংকুচিত হওয়ায় এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। যত বেশি অবাধ গণতন্ত্র ও প্রতিবাদ-প্রতিরোধ বহমান থাকবে, তত বেশি এ ধরনের সামাজিক নৈরাজ্যকর ঘটনা কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি।
গত ২৪ আগস্ট সারাদেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়েছে। রাজধানীর প্রেসকাবের সামনে বিক্ষাভ-সমাবেশে নেতৃবৃন্দরা অভিযোগ করেন, শিশু থেকে বৃদ্ধ কোন নারীই আজ নিরাপদ নেই। একের পর নির্যাতনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। ক্ষমতাসীন দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে পেশী শক্তি আর অর্থশক্তির বলে বলীয়ান অন্যায়কারীরা সহজেই পার পেয়ে যায়।
যে কারণে আমরা দেখেছি বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে নারী নির্যাতনকারী ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বাঁচাতে তৎপর বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিরা। ক্যান্টনমেন্টে খুন হওয়া মেধাবী ছাত্রী তনুর ময়না তদন্তের রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি এতদিনেও। বরং বিচার চাওয়ার কারণে হুমকির শিকার হতে হচ্ছে তার পরিবারকে। আফসানা হত্যায় জড়িত তেজগাঁও কলেজ ছাত্রলীগের নেতাকে বাঁচানোর চেষ্টা চলছে।
এসএ





