ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা এবং বালু নদীতে প্রতিদিন  প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন বিষাক্ত তরল ও  কঠিন বর্জ্য পড়ছে। এসব বর্জ্যের ৬০ ভাগই ট্যানারি ও স্যুয়ারেজের, ৩০ ভাগ নানা শিল্প কারখানার এবং বাকি ১০ ভাগ বর্জ্য অন্যান্য উৎসের।
জানা যায়, রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকাগুলোতে ছোট বড় মিলে প্রায় আড়াই লাখ শিল্প কারখানা রয়েছে। এসব শিল্প কারখানার ৯৯ ভাগেরই তরল বর্জ্যের পানি শোধনাগার নেই।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1400686936.jpg[/img]
বুড়িগঙ্গার পানি পরীক্ষার রিপোর্টে  ক্রোমিয়াম,নাইট্রেট, সিসা ও উচ্চ মাত্রায় পারদসহ ৬৮ প্রকার অপরিশোধিত রাসায়নিক পদার্থের অস্থিত্ত্বের কথা বলা হয়েছে। বুড়িগঙ্গার প্রতি লিটার পানিতে প্রায় দশমিক ৪৮ মিলিগ্রাম ক্রোমিয়াম রয়েছে। তবে পানিতে ক্রোমিয়ামের মাত্রা দশমিক ৫০ মিলিগ্রাম মিশ্রন পানি পান করলেই মানুষ মারা যাবার সম্ভাবনার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
অবশেষে সরকার  বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা এবং বালু নদীর  হারানো ঐতিহ্য এবং সৌন্দর্য পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছে। আর সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে একাধিক পরামর্শক টিম মাঠে কাজ  করছে। এই পরামর্শক টিম ঢাকার ৪টি নদীর পানি দূষণ ও  অবৈধ দখলমুক্ত করার বিষয়ে  ইতোমধ্যে একাধিক প্রতিবেদন তৈরি করেছে বলে জানা যায়।
এই ৪টি নদীর পরামর্শক টিমের যুগ্মসদস্য সচিব ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের  সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়ার স্বাক্ষরিত তাদের গবেষণা মূলক রিপোর্টে এই নদীগুলো দূষণের বিরুপ প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1400686975.jpg[/img]
কমিটির কর্মকতা মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া টাইমনিউজবিডিকে জানান, ২০০৯ সালের ২৩ জুন উচ্চ আদালতের দেয়া নির্দেশ অনুযায়ী ওই বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ট্যানারি শিল্পকে হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরের কথা ছিল। কিন্তু অদ্যাবধি এই ট্যানারি শিল্প সাভারে স্থানান্তরিত হয়নি। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বুড়িগঙ্গা নদী। ট্যানারি দূষণে জনস্বাস্থ্যও হুমকির মুখে পড়েছে।
তিনি বলেন, ট্যানারি শিল্পের মালিকরা সাভারে এই শিল্প স্থানান্তরের ব্যাপারে সরকারের কাছে ক্ষতিপুরণের পাশাপাশি আরও ৩টি শর্ত জুড়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, মালিকরা সাভারে জমির পরিমাণও বাড়িয়ে চেয়েছে। বর্তমানে হাজারীবাগে ৫০ একর জমিতে ১৭৮টি ট্যানারি শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু  সভারে ২শ' একরের বিশাল জমিতে ৪৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ট্যানারী শিল্প কারখানা গড়া হচ্ছে। কিন্তু ট্যানারি শিল্পের মালিকরা সাভারের এই নির্ধারিত এলাকায় যেতে চাচ্ছে না।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1400687052.jpg[/img]
মালিকদের দেয়া শর্তের মধ্যে রয়েছে, ব্যাংকের আগের ঋনের সুদ মওকুফ করতে হবে, সহজ শর্তে স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ দিতে হবে এবং সাভারের ট্যানারি শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যয় সরকারকে বহন করতে হবে। মালিকদের বেধে দেয়া শর্তের ফলে জটিলতা আরও বেড়েছে।
তিনি বলেন, তাদের গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে এই নদীগুলোর পানি দূষণের কারণ। প্রতিদিন কি পরিমান শিল্প,কারখানা, ট্যানারী,হাসপাতাল ও বাসা বাড়ির বর্জ্য নদীর পানি এবং পরিবেশ দূষণ করছে তার পরিসংখ্যান তৈরি করেছে।
গবেষণায় রিপোর্টে রাজধানীর হারজারীবাগে প্রায় ৩ শতাধিক ট্যানারিতে দৈনিক ৩৫৫ মেট্রিকটন চামড়া উৎপন্ন হয়। প্রতিদিন এই ট্যানারি শিল্পের নির্গত  হচ্ছে অপরিশোধিত  বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশ্রিত ৫ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন লিটার পানি এবং ৯৫ মেট্রিক টন কঠিন বর্জ্য।
এই  বিষাক্ত বর্জ্যের মধ্যে রয়েছে  লেদার কাটিং, ফ্লেশিং লোম, চুন, ক্রোমিয়াম, হাইড্রোজেন, সালফিরিক, সালফাই, গ্লীজ ও তেল জাতীয় পদার্থ। সেই সঙ্গে ঢাকা ওয়াসার নিয়ন্ত্রিত ৮০ ভাগ বর্জ্য বুড়িগঙ্গাতে পড়ছে।
এছাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকার ১৫ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্যের সঙ্গে  ঢাকা শহরের প্রায় ২ কোটি মানুষের প্রসাব-পায়খানার ৭০ ভাগ অর্থাৎ ২ হাজার ৫শ' মেট্রিক টন বর্জ্য নদীতে পড়ছে।
গবেষণা রিপোর্টে, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর দুই পাড়ে প্রায় ৫ হাজার শিল্প কারখানার কথা বলা হয়েছে। আর এই শিল্প কারখানার অপরিশোধিত ডাইং এান্ড প্রিন্টিং ইন্ডাস্ট্রিজ, সল্ট ক্রাশিং ইন্ডাস্ট্রিজ,২ শতাধিক সিসা গলাই কারখানা, কয়েক শত ব্যাটারী কারখানা।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1400687084.jpg[/img]
সদরঘাট, ওয়াইজঘাট, সোয়ারীঘাট, বাদামতলী, শ্যামবাজার, গাবতলী গরুর হাটসহ ১২/১৩টি সবজি এবং মাছের আড়ৎ রয়েছে। ৩ শতাধিক ডকইয়ার্ড, শতাধিক স'মিল, রাবার ও প্লাস্টিক কারখানা।
আরও রয়েছে, কয়েক হাজার লেদ ও ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ,  ছোট বড় গার্মেন্টস। রয়েছে কেমিক্যাল কারখানা, তামাক কারখানা, সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, সার কারখানা। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জের পাগলা এলাকায় ২৮৬টি ইটের ভাটা।
পরিবেশ অধিদফতরের জরীপ রিপোটে বলা হয়েছে, ঢাকা অঞ্চলের ৩৮৪টি লাল তালিকাভুক্ত শিল্প কারখানার মধ্যে ২৮১টিতে ইটিপি পাওয়া গেছে। এরমধ্যে কমলা 'খ'  শ্রেণীর তালিকাভুক্ত ১৩৯টি শিল্পকারখানার মধ্যে ইটিপি আছে মাত্র ৬৭টিতে। ৭০৯টি কলকারখানায় ইটিপির জরুরী প্রয়োজনীয়তা থাকলেও এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে তা নেই।
তাদের রিপোর্টে বলা হয়েছে, পরিবেশ অধিদফতরের উদ্যোগে শিল্প কারখানায় অভিযান (এনফোর্সমেন্ট) চালানোর আগে ১৩৯টিতে ইটিপি চালু ছিল,অভিযান পরিচালনার পরে ১৪৭টি শিল্প কারখানায় ইটিপি চালু করা হয়। তবে খরচ বাঁচানোর জন্য মালিকরা অধিকাংশ শিল্প কারখানায় ইটিপি বন্ধ রাখেন। বর্তমানে মাত্র ৫১টি প্রতিষ্ঠানে ইটিপি চালু আছে।
বিআইডব্লিউটিএ'র জরীপ রিপোর্টে বলা হয়েছে, পলিথিন,শিল্প কারখানা এবং মানববর্জ্য'র কারণে বুড়িগঙ্গ নদীর তলদেশে প্রায় ১২ ফুট স্তর জমা পড়েছে। বুড়িগঙ্গার তলদেশের এইসব বর্জ্য উত্তোলনের জন্য যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়েছিল। কিন্তু বর্জ্য উত্তোলন করা হয়নি।
[b]ঢাকা, একে, ২১ মে (টাইমনিউজবিডি.কম) // এআর[/b]