কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়াতে শুরু হওয়া পাঁচ দিনব্যাপী লালন স্মরণোৎসব যেন পরিণত হয়েছে বাউল, সাধু-সন্তু, সাঁই আর ভাববাদী মানুষের মিলনমেলায়। বাউল সম্রাট লালন ফকিরের ১২৪তম তিরোধান দিবসে লালন একাডেমি ছেঁওড়িয়াতে এ স্মরণোৎসবের আয়োজন করেছে।

বৃহস্পতিবার ভোর ৬টায় পায়েস, মুড়ি দিয়ে বাল্যসেবা এবং তারপর গোষ্ঠগানের মধ্যদিয়ে শুরু হয় ভক্ত, অনুসারী, ভাবশিষ্য, সাধু, বাউলদের- লালন সাঁইয়ের তিরোধান স্মরণের উৎসব।

আর দুপুরে পূর্ণসেবার পর, বিকালে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় উৎসবের। আর সন্ধ্যায় আখড়াবাড়ীর মূলমঞ্চে আলোচনা সভার পর রাতভর চলে লালনের বিভিন্ন ধরনের গান। এতে দেশের খ্যাতনামা বাউল শিল্পীদের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বাউলরা লালনের গানে জাগিয়ে রাখে পুরো ছেঁউড়িয়াকেই।

শুক্রবার ভোর ৬টায় যথারীতি বাল্যসেবা ও পরে গোষ্ঠগান দিয়ে শেষ হয় উৎসবের দ্বিতীয় দিনের প্রথমার্ধ।

উৎসবের দ্বিতীয় দিন (শুক্রবার) ভোর ৬টা থেকে সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত চলে এ বাল্যসেবা। কলা পাতায় পায়েশ, মুড়ির বাল্যসেবা গ্রহণ করেন বাউল, সাধু, সন্যাসী, ভক্ত, অনুরাগীরা।

এরপর শুরু হয় গোষ্ঠগানের পালা। অসংখ্য আসরে ধূপ, আগরবাতি জ্বালিয়ে খোল-কর্তাল, মন্দিরা, একতারা-দোতারার সুরে-তালে চলে এ গান।

এরপর দুপুরে কালীগঙ্গা নদীতে স্নান-গোসল করে লালন অনুসারীরা পূর্ণসেবা (দুপুরের খাবার) গ্রহণ করেন। লালন একাডেমি প্রাঙ্গণের একপাশে বড় বড় কড়াই, হাড়িতে রান্না করা হয় মাছ, ঘন্ট, ডাল, ভাত প্রভৃতি খাদ্য। পূর্ণসেবায় ছিল মিঠা দইও।

মূলত এই পূর্ণসেবার মধ্যদিয়ে শেষ হলো, লালন উৎসবের সার্বিক আনুষ্ঠানিকতা। লালন মাজারের প্রধান খাদেম মহম্মদ আলী  এমনটাই জানালেন।

এর পরপরই বাউল, সাধকরা যে যার গন্তব্যে বেরিয়ে পড়বেন। অনেকে আবার থেকে যাবেন শেষদিন পর্যন্ত।

লালন স্মরনোৎসব উপলক্ষে লালন আখড়াকে কেন্দ্র করে প্রায় এক কিলোমিটার জায়গা জুড়ে বসেছে মেলা। প্রতি বছরের মতো এবারও লালনের আধ্যত্মিক দর্শন লাভের আশায় সারাদেশ থেকে মানুষ এসেছেন ছুটে।

একতারা, দোতারা, ঢোল ও বাঁশির সুরে মুখরিত হয়ে উঠেছে লালনভূমি ছেঁউড়িয়া। লালন শাহ তার জীবদ্দশায় দোল পূর্ণিমায় আখড়াবাড়িতে ভক্ত-অনুসারীদের নিয়ে সারা রাত গান-বাজনা ও নানা তত্ত্বকথা আলোচনা করতেন। তার দেহত্যাগের পরও এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। আর তাই তো সারা আখড়াবাড়ি ও মাঠ এখন লালন গানের মঞ্চ।

‘ধর চোর হাওয়ার ঘরে ফাঁদ পেতে, বদ হাওয়া লেগেছে পাখির গায়, বাড়ির পাশে আরশী নগর, মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই কূল হারাবি, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি, সত্য বল সুপথে চল, এলাহি আলামিন গো আল্লা বাদশা আলমপনা তুমি’--এ রকম অসংখ্য লালন সঙ্গীত; লালন একাডেমির শিল্পী ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বাউলরা পরিবেশন করে চলেছেন এখানে।

এছাড়াও লালন মাজারের আশপাশে ও কালীগঙ্গা নদীর তীর ধরে বাউলরা আসন পেতে লালনকে স্মরণ করছেন তার পদ-বাণী পরিবেশনের মাধ্যমে।

স্মরণোৎসবের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শুরু হয় আলোচনা সভা। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা প্রফেসর ড. গওহর রিজভী। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন, কুষ্টিয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুর রউফ, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার প্রলয় চিসিম, জেলা পরিষদ প্রশাসক জাহিদ হোসেন জাফর প্রমুখ।

জেআই