সম্প্রতি বাংলাদেশে সব কিছুর দাম বাড়লেও জীবনের দাম দিনে দিনে শুধু কমছে।অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় খুনের মত ঘটনা ঘটছে অহরহ।গত এক মাসের খুনের ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, আলোচিত কোন খুনের ঘটনায় আসামীকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।

গত ২০ মার্চ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুকে সেনানিবাস এলাকায় নৃশংসভাবে খুন করা হয়। এ হত্যার বিচারের দাবীতে সারাদেশে তোলপাড় হলেও কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।গত ৬ এপ্রিল পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে কুপিয়ে হত্যা করা হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও সিলেটের গনজাগরণ মঞ্চের কর্মী নাজিমুদ্দিন সামাদকে।এ ঘটনায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে শূধু সন্দেহের তালিকায় রাখা ছাড়া তদন্তে আর কোন কোন অগ্রগতি করতে পারেনি পুলিশ।

২৩শে এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদালয়ের ইংরেজী বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী খুন হওয়ার ঘটনায় পুরো জাতির বিবেক নাড়া দিয়েছে আরো একবার।

রেজাউল করিম খুন হন তার বাসার ১০০ গজের মধ্যে।পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী রেজাউল করিম সিদ্দিকী ছিলেন সংস্কৃতমনা মানুষ, তার একটি ছোট সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিলো যেখানে সংগীত চর্চা হতো, সেতার বাজাতেন তিনি।

এ শিক্ষককে নৃশংসভাবে কেন হত্যা করা হলো এমন প্রশ্ন আজ সবার মনে।এই নিয়ে গত এক যুগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষককে খুন করা হলো।

এর আগে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড.ইউনুস, ড. তাহের এবং ড. শফিউল দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হন।অধ্যাপক এস তাহের আহমেদ খুন হয়েছিলেন ২০০৬ সালে।ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের এক শিক্ষক ও এক শিবিরনেতাসহ চারজনের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল আদালত।পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করলে ২০১৩ সালের ২১ এপ্রিল মাত্র দু’জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে।

এর দুবছর পর ২০০৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ইউনূস।এ মামলার তদন্ত শেষে ৮ জেএমবি সদস্যকে আসামি করে মামলার চার্জশিট দাখিল করে সিআইডি।পরে ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি ছয়জন বেকসুর খালাস পায়।

রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল অপর দুই আসামির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়।আর ২০১৪ সালে খুন হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক একে এম শফিউল ইসলাম।তাকেও নিজ বাসার কয়েক গজের মধ্যেই খুন করা হয় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে।

এ হত্যা মামলায় ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয়া ছাড়া আর কোন অগ্রগতি হয় নি।প্রায় একই কায়দায় এসব এসব হত্যাকান্ড করা হয়েছে।বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে একের পর এক এরকম শিক্ষক হত্যাকাণ্ড ঘটেই চলছে।

তাই শিক্ষক, কথা সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক একটি দৈনিককে বলেছেন, প্রত্যেকটি মানুষ এখন নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।তবে এঘটনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল দাবী করেছেন চাপাতির কোপে নিহত মুক্তমনা লেখক, ব্লগার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে পেরেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভাল বলে দাবি করলেও পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা।একটি দৈনিক সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে হত্যা, খুন ধর্ষণ অপহরণের মত সব ধরনের অপরাধ বেড়েছে।এ সময় হত্যাকান্ড ঘটেছে প্রায় দেড় হাজার।শুধু এ মাসের প্রথম ২০ দিনে সাড়ে তিনশ’টি হত্যাকান্ড ঘটেছে।

শিক্ষক হত্যাকান্ডের পর কাশিমপুর কারা ফটকের সামনে গুলিতে খুন হন সাবেক এক কারারক্ষী।আর একইদিনে দুবৃত্তরা গলাকেটে হত্যা করেছে মার্কিন দূতাবাসের সাবেক কর্মকর্তা জুলহাস মান্নান ও তার বন্ধুকে।

সরকারের পক্ষ থেকে বার বার বলা হচ্ছে এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা।আর এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রে বেড়ে চলেছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি।তাই বাংলাদেশে সর্বত্র আজ আতঙ্ক।

এ রাষ্ট্রে সাত সকালে জাতির বিবেক শিক্ষক খুন হন।

শিক্ষক থেকে কারারক্ষী বা ১৯ বছরের তরুণী তনু কেউই রক্ষা পায়না খুনীদের কাছ থেকে, যেখানে খুনিরা নির্ভয়ে চলে সেখানে আজ আমি, কাল তুমি, পরশু সে খুন হবেই।সত্যিই আমরা আতঙ্কিত।তার ওপর এসব অপরাধের বিচার চাওয়া এখন বৃথা আস্ফালন হয়ে দাঁড়িয়েছে।তাই আজ অন্যের দেশে আমরা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজি।

ওএফ