নানামুখী প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়েই ইসলামী সাহিত্য দুনিয়া এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশে ইসলামি সাহিত্যের কদর দিনদিন বাড়ছে। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মরহুম ড. আবব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীরের বইগুলো, গার্ডিয়ান পাবলিকেশনের বই প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ, বি স্মার্ট উইথ মোহাম্মদ ও সাইমুম সিরিজের বইগুলো এখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। এমনটাই জানালেন মেলার কয়েকজন দর্শনার্থী পাঠক ও প্রকাশক।
এই বইগুলো পড়তে তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে ব্যাপকহারে। অনেকে মনে করেন বইগলো প্রকাশের পর থেকে নতুন করে তরুণদের ইসলামি বই পড়তে আগ্রহী করে তুলেছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে অমর একুশে বইমেলায় ইসলামি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানসমূহ বরাবরই অবহেলিত হয়ে থাকে। অন্যদিকে প্রতিবছর মাহে রবিউল মাসে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে ইসলামি ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে হয় মাসব্যাপী ইসলামি বইমেলা। দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো ইসলামি ফাউন্ডেশন বইমেলার আয়োজন করেই দায়সারা। রাষ্ট্রীয় বা অন্যান্য প্রচার মাধ্যমে এই মেলা সম্পর্কে প্রচারণার কোনো উদ্যোগ নেই। নেই গণমাধ্যমগুলোর নিজ উদ্যোগে উপচেপড়া ভিড়। তাই ঢাকা শহরের ইসলামি সাহিত্যপ্রেমীরাও এই বইমেলা সম্পর্কে জানতে পারে না খুব একটা। মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশকদের অভিযোগ, ইসলামি ফাউন্ডেশন মেলা উপলক্ষে স্টল বরাদ্দের জন্য শুধুমাত্র লটারী দিয়েই দায় সারে। প্রতি সিঙ্গেল স্টলের জন্য ৮ হাজার টাকা এবং ডাবল স্টলের জন্য ১৬ হাজার টাকা দিয়ে বরাদ্দ নিতে হয় একেকটি বইয়ের স্টল। অথচ প্রতিবারই দেখা যায় ব্যবসা দূরে থাক খরচটাও তাদের ওঠে না। শুধু ঐতিহ্য রক্ষায় তবু তারা মেলায় অংশ নেন।
এবারও ইসলামি ফাউন্ডেশনের উদ্যোগের অভাব দেখে এগিয়ে আসেন কয়েকজন প্রকাশক। তারা নিজেরাই সোশ্যাল সাইটের মাধ্যমে ইসলামী বইমেলার প্রচার প্রচারণায় এবার বেশ সাফল্য দেখিয়েছেন। প্রকাশকদের মধ্য থেকে কেউ কেউ বলেছেন, তাদের টার্গেট ছিল ৫০ হাজার পাঠক দর্শনার্থীর সমাগম, কিন্তু তারা ধারণা করছেন এবারের বইমেলায় পাঠক সমাগম হয়েছে লক্ষাধিক।
যেটি গত ৫ বছরে দেখা যায়নি। কারও মতে গত ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে সাড়াজাগানো ইসলামী ব্ইমেলা হয়েছে এবার। বর্তমানে ইসলামিক চিন্তাধারার বই কেনা ও পড়ার মতো পাঠকের সংখ্যা বাড়ছে তাই মেলায় ক্রেতাদের উপস্থিতিও বাড়ছে, বলে মনে করছেন প্রকাশকেরা।
মেলায় আসছেন স্ত্রী সন্তানসহ বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন পেশার মানুষ। বিক্রি হচ্ছে তাফসীর গ্রন্থ, বুখারী শরীফ ও সীরাত গ্রন্থ ছাড়াও অন্যান্য ইসলামী বই। তবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বাজেটের অভাবে বুখারী শরীফ ও সীরাত ইবনে কাসিরের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ দিতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি।
মেলায় এবার নূর নামের একটি প্রকাশনী নিয়ে এসেছে ডিজিটাল কুরআন শরীফ । জানা যায়, মেলার আয়োজক কর্তৃপক্ষ প্রচার-প্রচারণায় তেমন কোনও ব্যায় বরাদ্দ না করলেও প্রকাশকদের উৎসাহে সাড়া দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।
মেলার শেষ দিন এসে জানা গেলো মেলার সময়সীমা আরও ৭দিন বাড়ানো হয়েছে। এতে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন প্রকাশকেরা।
এ বছর মেলায় স্থান পেয়েছে ৩২ টি স্টল। প্রায় প্রতিটি স্টলেই ক্রেতাদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। মেলার স্টলে স্টলে মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.) সহ অন্যান্য নবী-রাসুলদের জীবনীর বই রয়েছে। আছে কোরানের অনুবাদ, হাদিস, সীরাতগ্রন্থ, ইসলামের ইতিহাস নিয়ে বিভিন্ন গ্রন্থ, সাহাবীদের জীবনীসহ কয়েক শ’ বই। বই ছাড়াও মেলার বিভিন্ন স্টলে টুপি, জায়নামাজ, আতর, মেসওয়াক ও তজবি বিক্রি করা হচ্ছে। মেলা প্রতিদিন সকাল ১০ টা থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। প্রতি বছরই ইসলামি ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা বিভাগ এ মেলার আয়োজন করে থাকে।
মেলায় আগত একজন ক্রেতা বলেন, বায়তুল মোকাররমে নামাজ পড়তে এসে দেখলাম এখানে ইসলামি বইমেলা চলছে। যদি এখানে নামাজে না আসতাম, তাহলে জানতেই পারতাম না এখানে সুন্দর একটি মেলা বসেছে। এই ধরনের আয়োজন মানুষকে জানানো ফাউন্ডেশনের দায়িত্ব বলেও তিনি মনে করেন।
মেলায় প্রকৃত প্রকাশকদের আরও বেশি সুযোগ দেয়ার দাবি জানিয়েছেন সুধী পাঠক ও পর্যবেক্ষক মহল।
মেলায় অংশগ্রহণকারী গার্ডিয়ান পাবলিকেশনের কর্ণধার নূর মোহাম্মদ বলেন ইসলামী বইমেলা বলা হলেও এর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তারা মননশীল ও রুচিশীল বেশকিছু্ বই পাঠকদের হাতে তুলে দিতে পেরেছেন। তাদের বইয়ের সংখ্যা ৪৫। মেলা উপলক্ষে সব বইতেই রয়েছে ৪০ পার্সেন্ট মূল্যছাড়।
বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি মেলা উপলক্ষে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ছাড় দিয়ে বই বিক্রি করছে বলে জানান তাদের বিক্রয় কর্মকর্তা। দারুস সালাম বাংলাদেশ নামের একটি প্রকাশনি মেলায় ১০৮ টি বই নিয়ে এসেছেন। তাদের বইও ৪০ থেকে ৫০% কমিশনে বিক্রি করছেন। তাদের বেশি বিক্রিত বইগুলো হচ্ছে: কুরআনুল কারীম বাংলা তাফসীর, সহীহ আর বুখারী, সাহাবীদের জীবন চিত্র, সাইন্টিফিক আল কুরআন, বাইবেল কুরআন ও বিজ্ঞান, আর রাহীকুল মাখতুম, খোলাফায়ে রাশেদীন, ইসলামে হালাল হারামের বিধান, কিয়ামত কখন হবে, লা তাহযান হতাশ হবেন না, জীবন উপভোগ করুণ নামের বইগুলো ।
বাংলাদেশ ইসলামিক ল’ রিসার্চ এন্ড লিগ্যাল এইড সেন্টার প্রকাশিত বেশি বিক্রি হওয়া বইগুলো হলো: ইসলামের পারিবারিক আইন ১ম ও ২য় খন্ড, মাকাদিস আশ-শারিয়াহ, সমকালীন খুতবা, ইসলামী দন্ডবিধি, ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার পতন ও পুনরুথান, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ইতিহাস, ইসলামী শরিয়াত ও বিচারব্যবস্থার বৈশিষ্ট ইত্যাদি।
মাকতাবাতুল হাসান প্রকাশনির বেশি বিক্রয় হওয়া বইগুলো হলো ফজর আর করবো না কাযা, গীবত ও পরনিন্দা, সনাতন হিন্দু ধর্ম ও ইসলাম, নারী তুমি ভাগ্যবতী ইত্যাদি। এমদাদিয়া লাইব্রেরি, সুলেখা লাইব্রেরি, করুণাধারা প্রকাশনী, এমদাদিয়া বুক হাউস, বাংলাদেশ এমদাদিয়া লাইব্রেরি, রাহনুমা প্রকাশনি, নূর লাইব্রেরি, মিনা বুক হাইসসহ ৩২ টি স্টল ঠাঁই পেয়েছে এবারের বইমেলায়।
মাহমুদ রনি/ মামা





