২১ মার্চ বিশ্ব বন দিবস। বন আমাদের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। জীবমণ্ডলের স্থলভাগে প্রাকৃতিক পরিবেশ বলতে বোঝায় অজস্র গাছপালা-ঢাকা সবুজ তৃণভূমি বা বনভূমি, যেখানে উদ্ভিদের সংখ্যা প্রাণীদের তুলনায় অতি বিপুল এবং বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী যেখানে পর্যাপ্ত খাদ্য ও আশ্রয় পেয়ে বংশপরম্পরায় বসবাস করছে।
পরিবেশ রক্ষায় গাছপালা, বন-বনানীর ভূমিকার কথা স্বীকার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ দিবসটি যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পালন করা হলেও আমাদের দেশে দিবসটিতে তেমন কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় না।
বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনে সামাজিক বনায়নের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।বেঁচে থাকার প্রয়োজনে মানুষ বিনষ্ট করে পরিবেশ ও প্রকৃতিকে। এভাবে সমস্যা বাড়তে বাড়তে এখন পরিবেশই হুমকির মুখে।
১৯৮৭ সালে বাংলাদেশের বনের পরিমাণ ছিল ২৪ শতাংশ। ১৯৭৪ সালে যার পরিমাণ এসে দাড়ায় ১৬.৭ শতাংশে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে কোন দেশের স্থলভাগের শতকরা২৫ ভাগবনাঞ্চল থাকা প্রয়োজন।কিন্তু বাংলাদেশে মোট বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১৭ শতাংশ হলেও বৃক্ষাচ্ছাদিত প্রায় ১০ শতাংশ মাত্র।

সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপে বায়ুদূষণের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে। ৯১টি দেশের ১ হাজার ৬০০টি শহরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দূষিত ২৫টি শহরের তালিকায় রয়েছে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ঢাকা। ঘরের বাইরে (আউটডোর) বায়ুদূষণের ওপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সর্বশেষ জরিপে এ তথ্য জানা যায়।
১৯৯২ সালে রিও ঘোষণায় বন সৃজন ও রক্ষার্থে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরও সারা পৃথিবীতে উজাড় হয়েছে ২০টি বাংলাদেশের সমান আয়তনের বনভূমি। পৃথিবীতে আয়তনে অতি ছোট এই বাংলাদেশ কিন্তু জনসংখ্যার বিচারে বিশাল। প্রয়োজনের তুলনায় ন্যূনতম আকারের এই বনভূমিও আজ ভয়াবহ হুমকির মুখে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে উপকূলবাসীর একমাত্র রক্ষাকবচ সবুজ বেষ্টনী। অথচ প্রতিনিয়ত চলছে এ বন ধ্বংসের মহোত্সব। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কোথাও কোথাও মরে যাচ্ছে শত শত একর বনভূমি। আবার কোথাও বন পাহারার নামে বনের ভেতর বসবাস করা বনরক্ষীরা নিজেদের খেয়াল খুশিমত বনের সম্পদ ব্যবহার করছে।
সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে কৃষিজমি, সবজি চাষ, ফলজ ও বনজ বৃক্ষ থেকে লাখ লাখ টাকা আয় করলেও সরকারের কোনো লাভ হচ্ছে না। বরং বছরের পর বছর ধরে এখানে বসবাসকারী গোপনে বনের গাছপালা কেটে নিজেদের কাজে ব্যবহার করছে।
অনেকেই বনের জঙ্গল কেটে চাষের জমিও তৈরি করেছে। উপকূলের জনজীবন রক্ষায় বিশাল আয়তনের বনভূমি ধ্বংস করার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে উপকূলীয় প্রাণীসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য। এসব বনভূমি রক্ষায় সকলের এগিয়ে আসা একান্ত প্রয়োজন।
বিগত দুই শতকে বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষের হাতে উদ্ভিদ ও প্রাণীসহ ক্রমবর্ধমান হারে বিশাল অরণ্য ভূমির অবলুপ্তি এবং অন্যান্য পানি ও পানিভূমির বাস্তুতন্ত্রের অবক্ষয়ের ফলে জীবমণ্ডলের ক্ষতি হয়েছে অপূরণীয়।
পৃথিবীতে গড়ে প্রতিবছর ০.৯ শতাংশ ক্রান্তীয় বনভূমি অবলুপ্ত হচ্ছে। গত শতাব্দীর মধ্যভাগের পর থেকে ৫০ শতাংশের বেশি ক্রান্তীয় অরণ্য ধ্বংস হয়েছে।
কৃত্রিম উপগ্রহ মারফত্ অপসৃয়মাণ অরণ্যের যে ছবি পাওয়া গেছে, তা বিশ্লেষণ করে বলা হয়, পৃথিবীতে প্রতিবছর ১.৭ থেকে দুই কোটি হেক্টর অরণ্য অদৃশ্য হচ্ছে, যার আয়তন বেলজিয়াম রাষ্ট্রের সাত গুণের সমান।
আরও সহজ করে বলা যেতে পারে, প্রতি মিনিটে চারটি ফুটবল মাঠের আয়তনের সমান অরণ্য পৃথিবী থেকে চিরতরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অরগানাইজেশন (FAO) দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়া—এ তিনটি মহাদেশের ক্রান্তীয় অঞ্চলে (৯৭টি ক্রান্তীয় রাজ্যে) যে পরিমাণ অরণ্য অবশিষ্ট আছে এবং তা প্রতিবছর যে পরিমাণে অবলুপ্ত হচ্ছে, তার সমীক্ষা করেছিল।
বাংলাদেশের গোটা ভৌগোলিক অঞ্চলের শতকরা ৭ অংশ মাত্র বনভূমি আচ্ছাদিত। প্রকৃতির ভারসাম্য সঠিকভাবে বজায় রাখতে হলে এটি হওয়া উচিত ছিল ৩৩ শতাংশ, কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার মতো আমাদের দেশে বনাঞ্চল জনসংখ্যার চাপে দ্রুত সঙ্কুচিত হচ্ছে।
সামাজিক বনসৃজন : অরণ্যের এ ক্রমবর্ধমান অবক্ষয় রোধের জন্য বাংলাদেশব্যাপী সামাজিক বনসৃজন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। পতিত জমিতে, গ্রাম ও লোকালয়ের খালি উদ্বৃত্ত জমিতে বৃক্ষরোপণে উত্সাহ দেয়া হচ্ছে।
আমাদের দেশে সামাজিক এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে লক্ষণীয় পরিমাণ জমিতে বনসৃজন ঘটলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় মাথাপিছু অরণ্যভূমির পরিমাণের বিশেষ উন্নতি ঘটেনি।
বিপন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি : অরণ্যের ব্যাপক অবক্ষয়ের ফলে পৃথিবীতে বিশালসংখ্যক উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতির জীবন আজ বিপন্ন, তাদের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে, তারা অবলুপ্তির পথে চলেছে।
প্রাণীদের মধ্যে পক্ষী, স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ ও উভচর প্রাণীদের জীবন বেশি বিপন্ন অন্যান্য পর্বের প্রাণীদের থেকে। বাংলাদেশে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ১৫০টি প্রজাতির মধ্যে ৮১টি প্রজাতির প্রাণীর জীবন আজ বিপন্ন, তাদের সংখ্যা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। স্তন্যপায়ীদের মধ্যে ১৯টি, প্রাইমেট প্রজাতির মধ্যে ১৩টি প্রজাতি বিপন্ন।
বাঘ-সিংহের মতো ৩৬টি মাংসাশী প্রজাতির মধ্যে ২৮টি প্রজাতি বিপন্ন, ৯টি হরিণ প্রজাতির মধ্যে ৫টি প্রজাতি আজ বিপন্ন। পৃথিবীতে অতি দুর্গম পার্বত্য অঞ্চল, সমুদ্রবেষ্টিত দ্বীপ অথবা শীতল তুন্দ্রা অঞ্চলে এমন কিছু বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী বাস করে, পৃথিবীর অন্য কোথাও যাদের দেখা পাওয়া যায় না, এদের ‘এন্ডেমিক’ জীব বলে। যেমন, হিমালয়ের তুষার চিতা, ব্রহ্মকমল, নীল অর্কিড, তুন্দ্রা অঞ্চলে ভালুক (পোলার বিয়ার) বা গ্যালাপাগোস দ্বীপের উভচর সরীসৃপ ইগুয়ানা।
ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে এমন অনেক প্রজাতির এন্ডেমিক উদ্ভিদ ও প্রাণী আছে। এদের বাস্তুতন্ত্র আজ বিপন্ন, নিজেদের বাসভূমি থেকে এরা উত্খাত হলে পৃথিবী থেকে এরা সম্পূর্ণ অবলুপ্ত হয়ে যাবে।
বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয় । এর সংরক্ষণে এগিয়ে আসতে হবে এখনই, আর বিলম্ব বিপর্যয় ডেকে আনবে। বাংলাদেশের বন রক্ষায় সকলকে আরও সচেতন হতে হবে। আর এ সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক হারে প্রচার-প্রচারণা বৃদ্ধি করতে হবে।
এমকে





