দক্ষিণাঞ্চলের চার জেলায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে চলছে পরিবার কেন্দ্রিক নেতৃত্ব। দলটির সহযোগী সংগঠনে স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, ভাগ্নে আর ভাতিজাদের নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে নিজের মতো করে দল চালাচ্ছেন প্রভাবশালী নেতারা।

বিশেষ করে পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরগুনা ও ভোলায় বেশিরভাগই এমপিরাই রাজনীতিতে পরিবারকে টেনে আনছে। সম্মেলনে যোগ্য পরীক্ষিতদের উপেক্ষা করে নিজ পরিবারের লোকজনকে বসানো হচ্ছে মূল দল বা সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ পদে। বঞ্চিতদের মতে এসব সম্মেলন লোক দেখানো।

এ নিয়ে দলের অভ্যন্তরে পোড় খাওয়া নেতাদেও মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বললেও প্রভাবশালীদের ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না তারা। বছরের পর বছর এই রীতি চলে আসলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না হাই-কমান্ড। মাঠ থেকে উঠে আসা নেতারা রাজনীতি ছেড়ে এখন ঘর মুখো হয়ে পড়েছে।

খোজ নিয়ে জানা গেছে, পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শাহজাহান মিয়া ১৭ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসের সম্মেলনে ফের সভাপতি করা হয় তাকে। অভিযোগ আছে, মন্ত্রী থাকাকালে নিজের পরিবারের প্রায় সব সদস্যকে দলের নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন শাহজাহান মিয়া। স্ত্রী মমতাজ বেগম ছিলেন জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। ছেলে আরিফুজ্জামান মনি জেলা যুবলীগের সভাপতি। ভাগ্নে শহিদুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক। শহর আওয়ামী লীগ সভাপতি জালাল খান তার প্রতিবেশী। সাধারণ সম্পাদক তারিকুজ্জামান মনি তার মেজ ছেলে। এই মনি আবার সদর উপজেলার চেয়ারম্যান।

সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কালাম মৃধা শাহজাহানের ভাইয়ের ছেলে। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান ভূইঁয়া দূরসর্ম্পকের আত্মীয়। জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে রিয়াজ মৃধা এবং দুলু মৃধা তার ভাতিজা। আরেক ভাতিজা কালাম মৃধা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি। উপজেলা পর্যায়ে দুমকির সভাপতি আনোয়ার হোসেন তার ভগ্নিপতি। মীর্জাগঞ্জের সভাপতি গাজী আতাহার উদ্দিন ছোট ছেলে রনির শ্বশুর।

পিরোজপুরেও একই অবস্থা। সদর আসনের এমপি জেলা আলীগের সাধারণ সম্পাদক একেএমএ আউয়াল। এখানে ২৩ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয় না।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক সাবেক ছাত্রনেতা ইসাহাক আলী খান পান্না বলেন- পিরোজপুরে আওয়ামী লীগ নেই, আছে আউয়াল লীগ। তিনি এবং তার পরিবারই আওয়ামী লীগের সবকিছু।

এ বিষয়ে এমপি আউয়াল বলেন, তার এলাকায় দলের যে কোন কমিটি হয় ভোটের মাধ্যমে। কর্মিরা ভোট দিয়ে যাকে নির্বাচিত করেন তিনিই দায়িত্ব পালন করেন।

পিরোজপুরের পৌর মেয়র আবদুল মালেক এবং উপজেলা চেয়ারম্যান খালেক আউয়ালের দুই ভাই। জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি মশিউর রহমান মহারাজ তার ছোট ভাই। তার স্ত্রী লায়লা ইরাদ জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ভাগ্নে তোফাজ্জেল হোসেন খান। সদর উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক সোহাগ তার ভাগ্নে।

ভোলা সদর এবং বোরহানউদ্দিন ও দৌলতখান উপজেলায় আত্মীয়-স্বজনদের দিয়ে দল সাজানোর গুঞ্জন রয়েছে বাণিজ্যমন্ত্রী আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা তোফায়েল আহমেদ সম্পর্কে। ভোলা জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক পৌর মেয়র মনিরুজ্জামান মনির তার বোনের ছেলে। ভগ্নিপতি আসাদুজ্জামান জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইউনুস মিয়া ভায়রার মেয়ে জামাই।

ভোলা-২ আসনের বর্তমান এমপি আলী আজম মুকুল বড় ভাইয়ের ছেলে। এক সময় দৌলতখান পৌরসভার মেয়র ছিলেন এই মুকুল। তিনি এমপি হওয়ার পর দৌলতখানের পৌর মেয়র হন মুকুলের বেয়াই জাকির হোসেন। বোরহানউদ্দিন পৌরসভার মেয়র রফিকুল ইসলাম মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের আরেক ভাগ্নে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকও এই রফিকুল।

এ বিষয়ে বানিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার ঘনিষ্টজনদের দাবি-পারিবারিক পরিচয়ে নয়, এরা সবাই যার যার অবস্থানে এসেছেন নিজেদের যোগ্যতায়। এরা সবাই দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

অন্যদিকে বরগুনা আ’লীগে চলছে দুই পরিবারের প্রতাপ।এখানে আবার স্থানীয় এমপি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর পাশাপাশি দলের নিয়ন্ত্রণ দখল করে আছেন আরও একজন।

তিনি হলেন- জেলা পরিষদ প্রশাসক এবং বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির। এমপি শম্ভু জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। স্ত্রী মাধবী দেবনাথ জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। ছেলে সুনাম দেবনাথ জেলা তরুণ লীগের সভাপতি। ভায়রা ইউপি চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান বরগুনা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবিরও এ নীতিতে হাটছেন। তার ছোট ছেলে জুবায়ের আদনান অনিক জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি। বড় ছেলে রুবায়েত আদনান এক সময় ছিলেন ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি। জাহাঙ্গীর কবিরের বড় ভাই আলমগীর কবির পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি। ছোট ভাই হুমায়ুন কবির জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। ভাগ্নে ইমাম হাসান শিপন বাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। চাচাতো ভাই গোলাম আহাদ সোহাগ ভাসান ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি।

বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলনে জাহাঙ্গীর কবিরের বিরুদ্ধে সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হয়েছিলেন একজন। সেই অপরাধে তার প্রস্তাবক সর্মথকের ওপর হামলা ভাংচুর হয়েছে। অবস্থা বেগতিক দেখে শেষ পর্যন্ত তাকেই আবার সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা দিয়ে আসেন কেন্ত্রীয় নেতারা।

এমআর, জেএ