আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, সম্প্রতি হাইকোর্ট নির্বাচনকালীন সরকারের যে রূপরেখা দিয়েছেন সেটি অসাংবিধানিক। তিনি বলেন, সংবিধানে যা লেখা আছে, সেটা না বদলিয়ে কেউ যদি বলেন এটার বিপরীত কিছু করতে হবে, সেটা শুধু অগ্রহণযোগ্যই নয়, অসাংবিধানিকও।

হাইকোর্ট যে রূপরেখা দিয়েছেন সেটিকে সরকার বিবেচনা করতে পারে কিনা- এমন প্রশ্নে আইনমন্ত্রী বলেন, আমার মনে হয় না হাইকোর্ট এ ধরণের প্রস্তাব দিতে পারে। হাইকোর্টের রায় যদি ডাইরেকটিভ (নির্দেশনামূলক) হয় তাহলে সেটি অসাংবিধানিক। যদি অবজারভেশন (পর্যবেক্ষণ) হয় তাহলে সেটা সেই আলোকেই দেখা হবে।

আজ রোববার রাজধানীর টিসিবি অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপের একশ’ পঁচিশতম পর্বে আইনমন্ত্রী একথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্যানেল সদস্য হিসেবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ছাড়াও ছিলেন বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, রাষ্ট্র বিজ্ঞানী এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রওনক জাহান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম।

অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান মত দেন রাজনৈতিক দলগুলোকেই এই সমস্যার সমাধান করতে হবে।

তিনি বলেন, এখানে কোর্ট অথবা পার্লামেন্টে ৫০ জনকে সিলেক্ট করে, তাদের মাধ্যমে কোনো সমস্যার সমাধান হবে বলে আমি মনে করি না। তবে অনুষ্ঠানের আরেকজন প্যানেলিস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম মনে করেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে হাইকোর্ট যদি কোনো প্রস্তাব করে তাহলে সেটিও আমলে নেয়া উচিত।

তিনি বলেন, সবাই এখন চায় যে নির্বাচন যেন সুষ্ঠু হয়। তবে সে সিদ্ধান্ত আমরা নিতে পারবো না। এটা নিতে হবে জনপ্রতিনিধিদের এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে।

অপরদিকে এধরনের প্রস্তাবের সাথে দ্বিমত পোষণ করেন আরেকজন প্যানেলিস্ট যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রওনক জাহান। তিনি মনে করেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়ালে দেশে দ্বৈতশাসনের পথ তৈরি হতে পারে।

সম্প্রতি এক রিট আবেদনের রায়ের পর্যবেক্ষণে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন অন্তরবর্তী সরকার গঠনের দুটি ফর্মুলা দিয়েছেন হাইকোর্ট। প্রথম ফর্মুলায় বলা হয়েছে, অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান হবেন প্রধানমন্ত্রী। নতুন ৫০ জন মন্ত্রী নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ওই সরকারের মন্ত্রিসভা গঠন করবেন। সংসদে প্রতিনিধিত্ব করা দলগুলো থেকে ভোটের হারের অনুপাতে মন্ত্রী নেয়া হবে।

হাইকোর্টের দ্বিতীয় ফর্মুলায় বলা হয়েছে- সংখ্যাগরিষ্ঠ দল প্রথম চার বছর ক্ষমতায় থাকবে। আর সংসদের প্রধান বিরোধী দল সর্বশেষ এক বছর ক্ষমতায় থাকবে। প্রথম ফর্মুলার জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে না। তবে দ্বিতীয় ফর্মুলার জন্য সংবিধান সংশোধন করতে হবে।

বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের হাইকোর্ট বেঞ্চ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা সংক্রান্ত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ১৯ ধারার বৈধতা প্রশ্নে জারি করা রুল গত বছরের ১৯ জুন খারিজ করে দেন। রুল খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এই অভিমত দিয়েছে হাইকোর্ট।

রায়ে পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছেন, নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষ হবার পর শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে অসীম বিরোধ সমাধানে কোনো ফর্মুলাই জাতির উপকারে আসবে না যতদিন না যদি না রাজনৈতিক দলগুলো সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা গড়ে তুলতে আন্তরিক ও ঐকান্তিক হয়।

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপ অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন ছিলো- সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে কমিশন গঠনের জন্য একটি নাগরিক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে যে পরামর্শ দেয়া হয়েছে, অনেক দিন ধরে চলা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যে তা কি বিবেচনা করা উচিত?

উত্তরে রওনক জাহান বলেন, প্রথমেই দেখতে হবে কেন আমাদের এই ২০ বা ২৫ বছর ধরে বড় দুটি দলের মধ্যে সমঝোতা হচ্ছে না। ১৯৯১ সালের পর থেকে কোনো বিরোধীদল পার্লামেন্টে আসছে না। আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর হাতে ক্ষমতা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার দরকার নেই।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির হাতে ক্ষমতা পুর্নসংজ্ঞায়িত করার দরকার নেই। কারণ তা সংবিধানে সংজ্ঞায়িত আছে। আর দলগুলো থেকে ক্ষমতার ভারসাম্য অনুশীলন করা দরকার।

আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, নাগরিক সমাজের প্রস্তাব সমগ্র জাতির প্রস্তাব হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে, ভারসাম্য বলতে রাষ্ট্রপতিকে কিছু ক্ষমতা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে দ্বৈত শাসন সৃষ্টি হওয়ার কোন আশঙ্কা নেই।

আনিসুল হক বলেন, নির্বাচন কমিশনকে শুদ্ধ হতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা খর্ব করে রাষ্ট্রপতির হাতে ক্ষমতা দিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না বরং তা আরো ঘণীভূত হবে।

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপ অনুষ্ঠানটির প্রযোজনা করেন ওয়ালিউর রহমান মিরাজ এবং উপস্থাপনা করেন আকবর হোসেন।

এএইচ