কুষ্টিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক বাহিনীর নির্মমতার শিকার হয়েছিলেন মাসুদা বেগম। স্বাধীনতার পর ১০ বছরেরও বেশি সময় ছিলেন একঘরে। দীর্ঘ ৪৪ বছরে অধিকাংশ সময়ই সঙ্গী কেবলই লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা।

বীরাঙ্গনা এ নারীকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ হাতে পুরস্কৃতও করেছিলেন। তবু মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মেলেনি আজো। কিছুদিন আগে যে ৪১ জনের নাম সরকার ঘোষণা করেছে তার মধ্যে মাসুদা বেগমের নাম নেই।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতা ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, কুষ্টিয়ার চার বীরাঙ্গনার নাম মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, নারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও মহিলা পরিষদের কর্মকর্তাসহ পাঁচ সদস্যের কমিটি তদন্ত করে এ প্রতিবেদন পাঠায়।

যার ২ নম্বরে ছিলেন মাছুদা বেগম। কিন্তু চুড়ান্ত তালিকায় তার নাম ওঠেনি। বরং উঠেছে আরেক নাম- মজিরন নেসা। যিনি বীরাঙ্গনা ছিলেন বলে কোনো তথ্য নেই। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, কুমারখালীর হাশিমপুরে মাছুদার বসবাস। ৭১-এ স্থানীয় দালালরা তাকে তুলে দিয়েছিলেন পাক বাহিনীর হাতে। স্বাধীনতার স্বাদ বলতে মাছুদা পেয়েছেন সীমাহীন অপমান, লাঞ্ছনা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য।

১৯৯২ সালে গণ-আদালতে সাক্ষ্য দেয়ার অপরাধে ১০ বছর একঘরে ছিলেন তিনি। মাছুদা খাতুন বলেন, আমি গণ-আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছিলাম। জাহানারা ইমামের সঙ্গে বীরাঙ্গনাদের অধিকার আদায়ে কাজ করেছি। অথচ আমার স্থান হয়নি মুক্তিযোদ্ধা তালিকায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক বাহিনীর নির্যাতন সয়েছি। স্বাধীনতার পর উপহাস করেছে জামায়াত-শিবির। আর এখন উপহাসের পাত্র হলাম সরকারের কাছে।

মাছুদা আরও বলেন, যুদ্ধের পর থেকে অনেক কষ্ট করেছি। কিন্তু ১৯৯৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেদিন বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন, পা ছুঁয়ে সালাম করেছিলেন, সেদিন সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল আসলেই আমি মানুষ। আমি দেশের জন্য কিছু করতে পেরেছি। তার দাবি, আর্থিক সাহায্য নয়, মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম চাই। মাথা উঁচু করে মরতে চাই। মাসুদার ছেলে লালন বলেন, মা বীরাঙ্গনা হওয়ার কারণে নানাভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছি। অথচ তালিকায় নাম নেই।

কুমারখালীর নাতুড়িয়ার মজিরন নেসা বলেন, প্রশাসনের তদন্তদলের সঙ্গে তার দেখা হয়নি। ঢাকার এক এনজিও তার কাছ থেকে কাগজপত্র নিয়ে যাওয়ার পর তালিকায় নাম ওঠে। তবে তিনি দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি নিজ বাড়িতে হানাদার বাহিনীর সহিংসতার শিকার হন। স্বামী ওয়াসেল আলী শেখ জানান, তিনি মাঠে কাজ করছিলেন। এ সময় সংবাদ পান তার ঘরে পাক বাহিনী উঠেছে। কুমারখালীর বাসিন্দা কুষ্টিয়া জেলা মুক্তিযুদ্ধ ইউনিট কমান্ডের সদস্য এসএম আবু আহসান বরুন বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি। একজন নারী সে সময় নির্যাতনের শিকার হলে অবশ্যই জানতাম।

ওই এলাকায় খোঁজ নিয়েছি, ব্যাপারটি কেউ জানে না। কুমারখালী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সহকারী কমান্ডার ও দফতর সম্পাদক সোহরাব উদ্দিন বলেন, এ ঘটনায় বীরাঙ্গনাদের হেয় এবং সরকারের ভাবমূর্তি চরম ক্ষুন্ন হয়েছে। কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাহেলা আক্তার বলেন, আমরা তদন্ত করে মাছুদা খাতুনের নাম পাঠিয়েছিলাম। তালিকায় নাম থাকলেও কেন তাকে বাদ দেয়া হয়েছে তা বলতে পারি না।

তিনি আরও বলেন, মজিরন নেছা বীরাঙ্গনা কিনা এ বিষয়েও কমিটির কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।
কুষ্টিয়া জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার রফিকুল আলম টুকু বলেন, মজিরনের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিপ্রাপ্তি আমাদেরও বিস্মৃত করেছে। আমাদের কাছে বীরাঙ্গনা হিসেবে যাদের নাম রয়েছে তারা হচ্ছেন-কুমারখালীর গুলজান, এলেজান, মোমেনা ও মাছুদা। জাহানারা ইমামের গণআদালতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আমরা এ চারজনকেই কুষ্টিয়া থেকে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেদিন ঢাকায় গণআদালতে অসীম সাহস দেখিয়েছিলেন তারা।

এমএ