ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। চার দিনের টানা বৃষ্টিতে সাংগু ও মাতামুহুরির পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ইতোমধ্যে জেলার কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ভারী বৃষ্টিতে বান্দরবানে পাহাড় ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এতে বিভিন্ন পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত প্রায় ৫০ হাজার পরিবারের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। গত দুই দিনে বান্দরবানে ৩০৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।
বান্দরবানে প্রতিবছরই বর্ষার সময় পাহাড় ধসে জীবন হারান অসংখ্য মানুষ।
এদিকে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো থেকে লোকজনদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। প্রশাসন ও পৌরসভার পক্ষ থেকে জেলা শহর ও উপজেলাগুলোতে মাইকিং করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৫টি সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্নি এনজিওর জরিপে দেখা গেছে, বান্দরবানের সাত উপজেলায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের ঢালুতে (পাদদেশে) বসবাস করছেন লক্ষাধিক পরিবার। যার মধ্যে পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি পরিবার অতিঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
সদর উপজেলার কাসেমপাড়া, ইসলামপুর, কালাঘাটা, বালাঘাটা, বনরূপাপাড়া, হাফেজঘোনা, বাসস্টেশন এলাকা, স্টেডিয়াম এলাকা, নোয়াপাড়া, কসাইপাড়া, লামা উপজেলার হরিনমারা, তেলুমিয়া পাড়া, ইসলামপুর, গজালিয়া, মুসলিম পাড়া, চেয়ারম্যানপাড়া, হরিণঝিড়ি, টিএ্যান্ডটি এলাকা, সরই, রুপসীপাড়া, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার উত্তরপাড়া, বাইশফাঁড়ি, আমতলী, রেজু, তুমব্রু, হেডম্যানপাড়া, মনজয় পাড়া, দৌছড়ি, বাইশারী, রুমা উপজেলার হোস্টেলপাড়া, রনিনপাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ের পাদদেশে অপরিকল্পিতভাবে বসতি গড়ে তুলেছে ৫০ হাজার পরিবার। এদের বেশিরভাগই হতদরিদ্র মানুষ।
অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা ও বৃক্ষ নিধণের কারণেই প্রতিবছর ঘটছে পাহাড় ধসের ঘটনা। অতিঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের একটি তালিকাও তৈরি করা হয়েছিল গত বছর। কিন্তু পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী লোকদের স্থায়ী পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য কাজী মুজিবর রহমান বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে বান্দরবানে পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো থেকে লোকজন সরিয়ে স্থায়ীভাবে পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ সরকারিভাবে এখনো নেওয়া হয়নি। বৃষ্টির সময় শুধুমাত্র ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো থেকে লোকজনদের সরে যেতে প্রশাসনের পক্ষে মাইকিং করা হয়। তাদের জন্য সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়।’
ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো থেকে লোকজনদের সরিয়ে সরকারি খাস জমিতে পুনর্বাসন করে স্থায়ী সমাধানের পরামর্শ দেন তিনি।
স্থানীয় অধিবাসী ওমর ফারুক ও ছকিনা বেগমসহ অনেকে জানান, থাকার কোথাও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের ঢালুতে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন। সরকারি কোথাও নিরাপদ স্থানে থাকার সুযোগ করে দিলে তারা এখান থেকে চলে যাবেন।
সরকারি সূত্র মতে, পাহাড় ধসে ২০০৬ সালে জেলা সদরে মারা যান তিনজন, ২০০৯ সালে লামা উপজেলায় শিশুসহ ১০ জন, ২০১০ সালে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় পাঁচজন, ২০১১ সালে রোয়াংছড়ি উপজেলায় দু’জন, ২০১২ সালে লামা উপজেলায় ২৮ জন ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় ১০ জন মারা গেছেন।
বান্দরবান মৃত্তিকা গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান জানান, পাহাড় ধস তাৎক্ষণিক ঘটনা মনে হলেও এটি আসলে দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার ফল। নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন, অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটার কারণে ভূমি ক্ষয় হয়, যা পরবর্তী সময়ে ধস আকারে নেমে আসে।
জেলা প্রশাসনের ডেপুটি নেজারত (এনডিসি) শামীম হুসেন জানান, পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। জেলা সদরে পাঁচটি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
জেআই





