বেনাপোল বন্দরে শত কোটি টাকার মালামাল পুড়ে ছাই, আমদানিকারকরা ক্ষতিপুরন দাবি করেছে। পুড়ে যাওয়া বেনাপোল ন্থলবন্দরের ২৩ নম্বর শেড থেকে এখনো ধোঁয়া বের হচ্ছে।
এ শেডের আশপাশে পোড়া গন্ধে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল গলে পানিতে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে মালামাল খালাশ ও লোড-আনলোডে সাময়িক অসুবিধা দেখা দিয়েছে।
কিন্তু তদন্ত কমিটির কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত শেডের মধ্যে পুড়ে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ফেলা যাচ্ছে না। যাদের পণ্য পুড়ে গেছে, সেই ক্ষতিগ্রস্ত আমদানিকারকরা দ্রুত ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন।
বেনাপোল বন্দরের ২৩ নম্বর শেডে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলে বন্দর ব্যবহারকারী বৃহওর সংগঠন সিএন্ডএফ এজেন্টস এসোশিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন দাবি করেছেন।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্থ আমদানিকারকরা পুড়ে যাওয়া মালের ক্ষতিপুরন দাবি করেছেন। অধিকাংশ আমদানিকারকরা বেনাপোলে এসে ধংস্ স্তুপ পরিদর্শন করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তবে পুড়ে যাওয়া ধ্বংস স্তুপ এখনও সরানো হয়নি। শেডের ভেতরে ধ্বংস স্তুপের মধ্যে পুড়ে যাওয়া থেকে কোন মালামাল রেহাই পেয়েছে কিনা তা নিয়ে ব্যাবসায়ীরা আশংকা করছেন।
অন্যদিকে, প্রতি বছর শতকরা পাঁচ ভাগ ভাড়া বাড়ানো হলেও বেনাপোল বন্দর উন্নয়নে তেমন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। বন্দরের অব্যবস্থাপনা নিজ চোখে না দেখলে বোঝা কঠিন।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্থ আমদানিকারকরা বেনাপোল বন্দর থানায় জিডি এন্ট্রি করার জন্য ভীড় জমাতে শুরু করেছে সকাল থেকে ।
অগ্নিকান্ডের পর বেনাপোল বন্দরের সহকারী পরিচালক আব্দুল হান্নানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি আগামী দশ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দেবে।
অপরদিকে বেনাপোল কাস্টমস কর্তৃপক্ষও একটি কমিটি গঠন করেছে। অতিরিক্ত কমিশনার ফিরোজ উদ্দিনকে প্রধান করে গঠিত এই কমিটিতে রয়েছেন আরো চার সদস্য। তারা সাত দিনের মধ্যে রিপোর্ট দেবেন। এছাড়া একজন যুগ্ম-সচিবকে প্রধান করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় চার সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
তিনটির মধ্যে স্থলবন্দর ও কাস্টমসের দুটি তদন্ত কমিটি সোমবার সকাল থেকে কাজ শুরু করেছে। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি এখনো কাজ শুরু করেনি। তারা মঙ্গলবার সকালে বেনাপোলে তদন্ত কাজ শুরু করবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে, বন্দরের ২৩ নম্বর শেডে আগুন নিয়ে নানা কথা শোনা যাচ্ছে। শনিবার অনেক রাত পর্যন্ত ওই শেডে আমদানিকৃত কয়েকটি ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাক থেকে পণ্য আনলোড করা হয়। সেখানে কোনো শ্রমিকের ফেলে দেওয়া জ্বলন্ত সিগারেট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে বলে অনেকের ধারণা।
ওই শেডের ইনচার্জ জানান, শেডের পাশে একটি পোস্ট লাইনে গত ১১ সেপ্টেম্বর আগুন লাগে। হ্যান্ডলিং শ্রমিকদের সহযোগিতায় সে যাত্রা রক্ষা হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর লিখিতভাবে বৈদ্যুতিক লাইন মেরামতের জন্য আবেদন দেওয়া হয় কর্তৃপক্ষের কাছে। তারপরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আর এ কারণে শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে।
অভিযোগ রয়েছে, বন্দরের অব্যবস্থাপনা ও চুরির প্রমাণ লুকাতে অগ্নিকান্ডের মতো নাশকতামূলক কাজ করা হয়ে থাকে এ বন্দরে। বন্দর প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত সাত বার এখানে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার মালামাল পুড়ে যায়। যার কোনো ক্ষতিপূরণ আজও পাননি আমদানিকারকরা। বন্দর কর্তৃপক্ষ বন্দরে রক্ষিত মালামালের ভাড়াসহ অন্যান্য অর্থ আদায় করলেও পণ্যের বীমা করেন না রহস্যজনক কারণে। বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত অগ্নিকান্ডে- তদন্ত গঠিত হলেও রিপোর্ট পাওয়া যায় না কখনো।
দেশের সব চেয়ে বড় বেনাপোল স্থলবন্দরে ৩৮টি ওয়্যার হাউজ বা শেড আছে। আর ওপেন ইয়ার্ড রয়েছে পাঁচটি। এ সব শেড ও ইয়ার্ডে আমদানি করা ৪৫ হাজার টন পণ্য রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সেখানে প্রায় সব সময়ই দ্বিগুণেরও বেশি পণ্য থাকে। প্রতিটি শেডে ঠাসাঠাসি করে রাখা হয় এসব পণ্য। পণ্যবাহী ট্রাকগুলো রাখার জায়গায় মাসের পর মাস রাখা হয় বিভিন্ন কোম্পানির ট্রাক চেচিসসহ পরিবহন। যার ফলে পণ্যবাহী ট্রাক রাখা হয় সড়কে।
দাহ্য পদার্থের জন্য আলাদা জায়গা থাকার পরও অনেক শেডেই রাখা হয় সেগুলো। বন্দরের অভ্যন্তরে বৈদ্যুতিক লাইনগুলো ঠিকমতো মেরামত না করায় শর্ট সার্কিটের কারণেও আগুন লেগেছে কয়েকবার। এতো বড় বন্দরে মাত্র দুইজন বাইরের বৈদ্যুতিক মিস্ত্রিকে মাস্টার রোলে কাজ করানো হচ্ছে। এখানে নেই কোনো বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী। বন্দরের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার না করে বাইরে পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
অন্যদিকে বন্দরের ঐ শেডে বিভিন্ন মালামালের সাথে কেমিকেল জাতী য় পন্য রাখায় আগুন লেগে এটি আরো ভয়াবহ রুপ নেয়। তবে এই শেডে কেমিকেল রাখা হয় অবৈধভাবে। কারন কেমিকেল রাখার জণ্য আলাদা শেড থাকলেও সেখানে তা রাখা হয়নি। ২০১৩ সালের ২৩ মার্চ বন্দরের তিন লাখ টাকার বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বাইরে পাচারের সময় জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় এক কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুতও করা হয়।
বন্দরের নিজস্ব হাইড্রেন পানি সাপ্লাই ব্যবস্থা থাকলেও অগ্নিকা-ের সময় তা কাজে আসে না। পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় না। বন্দরের ফায়ারম্যানদের তেমন কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। দায়িত্ব পালনেও তাদের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ রয়েছে। বন্দরের নিজস্ব পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ছাড়াও কাছেই বেনাপোল ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের একটি ইউনিট রয়েছে। নিজস্ব ব্যবস্থাপনার বাইরে ওই একটি ইউনিটই ভরসা।
বন্দরে একজন সহকারী ফায়ার পরিদর্শকের নেতৃত্বে তিনজন ফায়ারম্যান কাম হাইড্রেন অপারেটর থাকলেও অগ্নিকান্ডের সময় তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। রোববারের অগ্নিকা-ের সময় তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল। বন্দরের অভ্যন্তরে তাদের সর্বক্ষণিক থাকার কথা থাকলেও ওইদিন তারা কেউ ছিলেন না বলে অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বন্দরের শেড ও ইয়ার্ড থেকে প্রায়ই পণ্য চুরির ঘটনা ঘটছে। চুরির প্রমাণ লুকাতে বন্দরের এক শ্রেণির কর্মচারী অনেক সময় অগ্নিকান্ডের মতো নাশকতামূলক কর্মকান্ড চালায় বলে অনেকের সন্দেহ। সব মিলিয়ে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দরটির নিরাপত্তা যথেষ্ট ঢিলেঢালা।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন বলেন, ‘বেনাপোল বন্দরে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় আমদানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। যা ব্যবসায়ী মহলে চরম উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত আমদানিকারকদের প্রতিনিধিদের কাছে জরুরি চিঠি পাঠিয়েছি। ক্ষয়ক্ষতির তালিকা হাতে পাওয়ার পর পরই বিষয়টি নিয়ে বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের উপ-পরিচালক (ট্রাফিক) আব্দুল জলিল বলেন, ‘অগ্নিকান্ডের কারণ এখনো জানা যায়নি। আর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনই বলা সম্ভব নয়। এ পর্যন্ত ওই শেডে ১১৫টি পণ্য চালানের কাগজপত্র পাওয়া গেছে। ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত এই শেডে আর কী পণ্য আনলোড করা হয়েছে তা নিশ্চিত হতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে। এছাড়া আর কোনো পণ্য ছিল কিনা তাও পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। সব কিছু হাতে পেলে তবেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যাবে।’
তদন্ত কমিটির রিপোর্টের আগে কোনো পোড়া পণ্য ওই শেড থেকে সরানো যাবে না বলে জানান তিনি।
রোববার ভোরে বেনাপোল স্থলবন্দরের ২৩ নম্বর শেডে ভয়াবহ অগ্নিকা- ঘটে। এতে বিপুল টাকার আমদানিকৃত মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
এই শেডে বিভিন্ন গামেন্টস ইন্ডাষ্ট্রিজ ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের নামে আমদানিকৃত কাপড়, ডাইস, বিভিন্ন কেমিকেল, মেশিনারি পার্টস, মোটর পার্টস, ফাইবার, মশা তাড়ানো স্প্রে নিউ হিট, তুলা অ্যাসোসিয়েটস গুডস, কাগজ, রক্ষিত ছিল।
এসএম/নাসির





