স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ ও আমেরিকার সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। দশ মাস আগে ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে প্রহসনের নির্বাচন বলে দাবি করেছিলো ওয়াশিংটন। কিন্তু গত ২৮ থেকে ২৯ অক্টোবর ওয়াশিংটনে শেষ হওয়া বাংলাদেশ ও আমেরিকার তৃতীয় অংশীদারিত্ব সংলাপে নির্বাচন নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি আমেরিকা।
কূটনীতিক সূত্র জানায়, সংলাপে দুই দেশ নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা আরো বৃদ্ধির বিষয়ে জোর দেয়। এছাড়া বৈঠকে আমেরিকার বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব ও উঞ্চতার বিষয়টি চোখে পড়ার মতো।
অংশীদারিত্ব সংলাপে অংশ নেয়া এক কূটনীতিক বলেন, ‘‘সাধারণত আমেরিকা সব সময় চায় আমাদের চাপে রাখতে। কিন্তু এবারের বিষয়টা ছিল অন্যরকম। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সমর্থনমূলক ও সহযোগীর মতো।’’
আগামী কয়েক মাসের মধ্যে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় সফরের বিষয়ে সম্মত হয়েছেন। আর এটাকে নিভে যাওয়া কূটনীতিক সম্পর্কের বড় সফলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংলাপে অংশ নেয়া ওই কূটনীতিক বলেন, ‘‘আমি খুবই আশাবাদী যে, আগামী বছরই বাংলাদেশ সফরের আসবেন আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি।’’
তিনি বলেন, ‘‘দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে দেখা করতে যাবেন।’’
২০০৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর থেকে এখনো আমেরিকার পক্ষ থেকে সে দেশ সফরে যাবার কোনো আমন্ত্রণ পাননি শেখ হাসিনা। এর আগে ২০১৩ সালের ১৭ মে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির সঙ্গে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির বৈঠকই ছিল দুই দেশের মধ্যকার শেষ সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠক।
বিগত তিন বছর ধরে আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনীতিক সম্পর্ক ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছিল। ড. মোহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক ইস্যুতে সরকারের অবস্থানকে ভালো চোখে নিতে পারেনি আমেরিকা। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করে। আর এ নির্বাচনের পরই ওয়াশিংটন বাংলাদেশ সরকারকে আহ্বান জানায়, খুব দ্রুতই নির্বাচন নিয়ে সংলাপে বসতে এবং নতুন আরেকটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচনের আয়োজন করতে, যাতে বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে।
বাংলাদেশি ওই কূটনীতিক জানান, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে এবার কোনো কথাই বলেনি আমেরিকা। এমনকি তারা নতুন নির্বাচন, সংলাপ এসব নিয়েও কথা উঠায়নি।
তিনি বলেন, ‘‘আমি মনে করি আমেরিকা তার পূর্বের মূল অবস্থান থেকে অনেক সরে গেছে। বাংলাদেশের উচ্চ পর্যায়ের সূত্রের সঙ্গে আমেরিকার বৈঠক হয়েছে। দেশটি এখন সংলাপ আয়োজনের বিষয়টিতে তাদের সম্মতির বিষয়টি জানিয়েছে।’’
তিনি আরো বলেন, ‘‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠক করার ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছে আমেরিকা।’’
তৃতীয় অংশীদারিত্ব সংলাপে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক ও আমেরিকার রাজনৈতিক বিষয়ক সচিব ওয়েন্ডি শেরম্যান প্রতিনিধিত্ব করেন। সংলাপের পাশাপাশি আমেরিকার দক্ষিণ এমিয়া বিষয়ক সহকারি সেক্রেটারি নিশা দেশাই বিসওয়াল, আমেরিকার সহকারী ট্রেড রিপ্রেজেনটিটিভ মাইকেল জে ডিলানির সঙ্গেও বৈঠক করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব।
বৈঠকে ওয়েন্ডি শেরম্যান বলেন, ‘‘এমডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।’’
আমেরিকার সহকারী ট্রেড রিপ্রেজেনটিটিভ মাইকেল জে ডিলানি বলেন, ‘‘ভয়াবহ রানা প্লাজার ভবন ধসের পর পোশাক কারখানার উন্নয়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে।’’
কূটনীতিক সূত্র জানায়, অংশীদারিত্ব সংলাপে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক স্বার্থের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় স্থিতিশীল উন্নয়ন, জলবায়ু প্রভাব, অভিবাসন, তথ্য-প্রযুক্তি সহায়তা, সাইবার নিরাপত্তা, শিক্ষা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা বিষয়েও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৈঠকে অংশ নেয়া কূটনীতিক জানান, ইসলামিক স্টেট জঙ্গিদের মোকাবেলায় আমেরিকান কোয়ালিশনে বাংলাদেশের যোগ দেয়া প্রসঙ্গেও কোনো কথা উঠায়নি আমেরিকা। সম্প্রতি কোয়ালিশনে যোগ দেবার আমেরিকান প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছিলো বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, ‘‘আমাদের চিন্তায় তৃতীয় অংশীদারিত্ব সংলাপ একটা বড় ধরনের সফলতা। সংলাপে আমেরিকার কাছ থেকে আমরা অনেক কিছু অর্জন করেছি।’’-ডেইলি স্টার।
জাতীয়
বাংলাদেশ-আমেরিকা সম্পর্কে নতুন মোড়?
স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ ও আমেরিকার সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে।





