ছোট্ট সোনামণিদের কাঁধে বইখাতা ভর্তি ভারী স্কুলব্যাগ বহনে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও  কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। দিন যতো যাচ্ছে শিশুদের স্কুলব্যাগের ওজনই যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। তাই প্রশ্ন- মেধাবিকাশের নামে ছোট্ট শিশুদের আর কতদিন ভারী স্কুলব্যাগ বহন করতে হবে?

এ প্রসঙ্গে কিন্ডারগার্টেনের এক ছাত্রকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, ব্যাগে বই কয়টি? উত্তরে জানালো ১৫টি, কোন ক্লাসে পড় প্লে-২তে। স্কুলের নাম কি? ‘প্রি-ক্যাডেট কিন্ডারগার্টেন’। সায়হাম নামে এই শিশুর বাসা রাজধানীর ফার্মগেটের রাজাবাজার। প্রতিদিন বাসা থেকে বইখাতা ভর্তি ব্যাগটি সেই কাঁধে বহন করেন। ব্যাগ ওঠাতে নামাতে তার মা কখনো সাহায্য করে থাকেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তার মা জোবাইদা হালিম বলেন, স্কুল থেকে তাদের ওপর বইয়ের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। তাদের ভাষায় বেশি বই বেশি মেধা। মেধার বিকাশেই আমরা পরিস্থিতির শিকার। আমরা বাচ্চাদের শুধু জিপিএ-৫ পাওয়ার জন্যই শিশুদের মানসিক চাপ দেই। আর স্কুল দেয় বইয়ের বোঝা। খেলাধুলার বালাই নেই শুধু পড়া আর পড়া।

তিনি নিঃসংকোচে বলেন, আমরা বাচ্চাদের মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছি বেশি চাপ প্রয়োগ করে। কিন্তু পড়াশোনা হচ্ছে না, হচ্ছে অন্য কিছু। অথচ শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন খেলাধুলার পাশাপাশি পড়াশোনা করা।

আর সেই জন্য ১৮৩৭ সালে জার্মানির ব্যাড ব্ল্যাংকেনবার্গে ফ্রেডরিখ ফ্রোয়েবল কিন্ডারগার্টেন নামক শিশুদের খেলাধুলার ছলে পড়াশোনা করা ও ছবি আঁকাসহ নানা শিশুতোষ কার্যক্রম চালায়।

কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র হলো উল্টো। এখন ঢাকা শহরের আনাচে-কানাচে ব্যাঙের ছাতার মতো শত শত কিন্ডারগার্টেন গড়ে উঠেছে। যা ২০১১ সালের কিন্ডারগার্টেন নীতিমালা ভঙ্গ করে গড়ে ওঠে। সেখানে শিশুদের খেলার জায়গা তো দূরে থাক ভালো পরিবেশ নেই, নেই কোনো প্রশস্ত কোনো জায়গা, খোলামেলা ক্লাসরুম। আছে শুধু বইয়ের বোঝা আর অভিনব যতো সব কলাকৌশল।

সায়মা আজাদ নামে ফার্মগেটের বাসিন্দা এক অভিভাবক টাইমনিউজবিডি’কে বলেন, আমার ছেলে কেজি-২তে পড়ে তার বইয়ের সংখ্যা ১৬টি। আর মাস গেলেই এই পরীক্ষা, ওই পরীক্ষা করে হাতিয়ে নেয় পাঁচশ বা হাজার টাকা। প্রতি মাসে বইখাতা কেনা ও প্রাইভেট পড়াসহ খরচ হয় ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৬ হাজার টাকা। শিক্ষাকে তারা বাণিজ্যিকীকরণ এবং পণ্য হিসেবে ব্যবহার করছে। আর তার শিকার হচ্ছে আমরা সাধারণ জনগণ আর আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। আমরা নিরুপায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফার্মগেট নাজনীন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষক টাইমনিউজবিডি’কে বলেন, বই যদি বেশি না হয়, তাহলে তাদের অভিভাবকরা প্রাইভেট পড়াতে চায় না। আর তাই স্কুল কর্তৃপক্ষ একপ্রকার সুকৌশলে বইয়ের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে।

বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী মোতাহার হোসেন চৌধুরী টাইমনিউজবিডি’কে বলেন, শিক্ষা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগ্রত করে। আর সেই শিক্ষাকে আমরা বাণিজ্যিককরণ করে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করছি। এটা একটি জাতির জন্য বড় অশনিসংকেত। এ থেকে উত্তরণে সরকারের যথাযথ মনিটরিংসহ ২০১০ সালের শিক্ষানীতি ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে। তা না হলে কোমলমতি শিশুরা বইয়ের বোঝা কাঁধে নিয়ে রোজ স্কুলে যাবে আর মানসিক বিকারগ্রস্ত হবে আমাদের নতুন প্রজন্ম। আর ফায়দা লুটবে অসাধু শিক্ষকরা। জাতি হবে মেধাশূন্য ও বিকারগ্রস্ত।

এমবি