রাজধানীতে রেল দুর্ঘটনায় গত ৯ মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৩৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে ৪৬ জন নারী এবং ১৮২ জন পুরুষ রয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ৫ শতাধিক। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় নিহত হয়েছেন ১৬০ জন। নিহতদের মধ্যে ১৬ জনই নারী। এছাড়াও বাকি ১৪৪ জনের মধ্যে শিশুও রয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, ঝুকিপূর্ণ রেলক্রসিংগুলোতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে তদারকি না করায় এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি জনসাধারণের আবহেলাও এর জন্য দায়ি।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ৯টায় কারওয়ান বাজারের রেললাইনে এক দুর্ঘটনায় ট্রেনে কাটা পড়ে ২ নারীসহ চার জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও পাঁচ জন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুই দিক থেকে দু’টি ট্রেন কারওয়ানবাজার রেল ক্রসিং এলাকা অতিক্রম করছিল। হতাহতরা দুই ট্রেনের মাঝে আটকা পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হন। একইদিন বিকালে কুড়িল বিশ্বরোড রেল ক্রসিংয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে ডান হাত ও পা হারান আসমা আক্তার নামে এক গার্মেন্টস কর্মী।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও রেলওয়ের নিরাপত্তায় নিয়োজিত জিআরপি পুলিশ কর্তৃপক্ষ মনে করছেন, দুর্ঘটনাকবলিত রেলক্রসিং এলাকায় গড়ে ওঠা অস্থায়ী বাজার ও দোকানপাট, লোকজনের অসতর্কতা, রেলক্রসিং এলাকার নিরাপত্তা প্রহরীদের গাফিলতি আর ট্রেন চালকদের অদক্ষতাই মূলত এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ি।

তবে দুর্ঘটনা কবলিত এলাকার বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, মূলত জিআরপি পুলিশ ও বিশেষ করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের মদদে রেল লাইনের ওপর গড়ে উঠেছে ছোট ছোট বাজার। টাকার বিনিময়ে এসব এলাকায় ব্যবসা করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। এসব বাজার কেন্দ্রীক লোকজনের সমাগম ঘটায় দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে।

দুর্ঘটনা কবলিত রেলক্রসিং এলাকা ও রেল লাইনের আশপাশ দিয়ে গড়ে উঠা বাজার উচ্ছেদে নামকাওয়াস্তে অভিযান চালানো হলেও তা কোনো কাজে আসছে না। উচ্ছেদের দু'এক দিন পরই আবার বসতে দেখো যাচ্ছে এসব বাজার।

তবে রেলওয়ের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দাবি, দুর্ঘটনাকবলিত রেলক্রসিং এলাকাগুলোতে নজরদারি রয়েছে। প্রায়ই অভিযান চালানো হয়। তবে পর্যাপ্ত লোকবলের অভাবে চিহ্নিত স্থানগুলোতে নজরদারি রাখা সম্ভব হয় না। এই সুযোগে ভ্রাম্যমান দোকানপাট বসে পড়ে। যে কারণে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

কমলাপুর রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি) সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন মালিবাগ, খিলগাঁও, মগবাজার, কারওয়ান বাজার, মহাখালী, বনানী, খিলক্ষেত, কুড়িল বিশ্বরোড, কাউলাক্রসিং, হাজী ক্যাম্প এবং ঢাকা রেঞ্জের কসাইবাড়ি ১ ও ২ নং গেট, টঙ্গি ব্রীজ, পূর্ব আবিজপুর ও দক্ষিণ আবিজপুর, আহসান উল্লাহ মাস্টার উড়াল সেতুর নিচের রেলক্রসিংসহ প্রায় অর্ধশতাধিক রেলক্রসিং এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কিন্তু এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি রাখার কথা থাকলেও পর্যাপ্ত জনবল না থাকার কারণে তা সম্ভব হয় না। যে কারণে বেড়েই চলেছে দুর্ঘটনা।

অপরদিকে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী সারাদেশেও আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে রেল দুর্ঘটনা। গত বছরের মে থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত চার শতাধিক রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। আর বিগত পাঁচ বছরে ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছে দেড় হাজারেরও বেশি।

রেলওয়ের কর্তৃপক্ষের দাবি, পাঁচ কারণে সারা দেশে এই রেল দুর্ঘটনা বাড়ছে। সেগুলোর মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ লোকমোটিভ ও কোচ, ওয়ার্কশপ সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটি, দক্ষ চালকের অভাব, রেললাইন রক্ষণাবেক্ষণে গাফিলতি এবং দুর্বল সিগন্যালিং ব্যবস্থা অন্যতম।

রেলওয়ের অপর এক সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে বিভিন্ন রুটে ৩৩৪টি ট্রেন চলাচল করে। এই ট্রেনগুলোর ৮০ শতাংশ ইঞ্জিনই মেয়াদোত্তীর্ণ। ওয়ার্কশপে নেই পর্যাপ্ত লোকবল। এই অব্যবস্থাপনার কারণে যান্ত্রিক ত্রুটিপূর্ণ ট্রেনই চালানো হচ্ছে। আর নতুন লোকমোটিভ কেনার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার কারণে রেল দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চলতি বছরের গত ২৩ মে মহাখালী রেলক্রসিংয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। ২২ মার্চেও একই স্থানে এক পথচারীর নিহত হন।

এর আগে২৯ এপ্রিল রাত সোয়া ১০টার দিকে কমলাপুরের টিটিপাড়া এলাকায় যাত্রীবাহী একটি বাসের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়। ট্রেন স্টেশনে প্রবেশের সময় বাসটি উল্টো পাশ দিয়ে আসছিল। এতে যানবাহন দুটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

এব্যাপারে কমলাপুর রেলওয়ে থানার (জিআরপি) অফিসার ইনচার্জ(ওসি) আব্দুল মজিদ টাইমনিউজবিডি’কে জানান, রেলওয়ে পুলিশের দায়িত্ব রেলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যাত্রীরা যাতে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে তা নিশ্চিত করা। আর কোনো গোষ্ঠী যাতে নাশকতা চালাতে না পারে তা দেখভাল করা। রেললাইনকে কেন্দ্র যে দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে তা দেখার ও নিয়ন্ত্রণ করার মতো সময় ও জনবলকোনোটিই আমাদের নেই। আমাদের যেখানে জনবল দরকার তিন হাজার সেখানে রয়েছে মাত্র ৩শ'।

তিনি জানান, বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর থেকে কাউরাইদ, জয়দেবপুর থেকে নারায়ণগঞ্জসহ প্রায় পৌনে ৪শ' কিলোমিটার এলাকার জন্য রয়েছে এই অল্প লোকবল। এই রুটে মোট ১৯২টি ট্রেন চলাচল করে। এর মধ্যে শতাধিক ঝুকিপূর্ণ রেলক্রসিংরয়েছে। আমাদের এই অল্প লোকবল নিয়ে এতো বিশাল এলাকার নিরাপত্তা দেয়া কষ্টকর।

তিনি আরও বলেন, মূলত এই দুর্ঘটনা কবলিত এলাকাগুলোর উপর নজরদারি থাকার কথা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের। রেল লাইনের দু'পাশে ২০ গজের মধ্যে কোনো ধরণের ভবন দোকান ও বাজার বসানোর নিয়ম নেই। এসবই তদারকি করার কথা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের।

এব্যাপারে রেলওয়ের ঢাকা রেঞ্জের ডিভিশনাল ম্যানেজার কামরুল আহসান বলেন, মানুষের অসচেনতার জন্যই বারবার দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে। রেল ক্রসিং এলাকাগুলোতে বারবার অভিযান চালিয়ে অস্থায়ী বাজার ও দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়েছে। তবে নিয়মিত নজরদারির অভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে আবারো বাজার বসছে।

তিনি বলেন, এবার আর কোনো ছাড় দেয়া হবে না। বাজার উচ্ছেদে যথাযথ ব্যবস্ঘা গ্রহণ করা হবে। বাজার যেন পুনরায় বসতে না পারে সেজন্য কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা হবে।

ঢাকা, জেইউ, ১২ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, এআর