কালিহাতীতে পুলিশের গুলিতে নিহত ফারুক, শামীম মিয়া ও শ্যামল দাসের বাড়িতে মাতম চলছে।
কালিহাতী পৌর এলাকার কুষ্টিয়ায় পুলিশের গুলিতে নিহত ফারুকের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, সেখানে প্রতিবেশীদের ভিড়। শারীরিক প্রতিবন্ধী ফারুকের বড় ছেলে আসিফকে (৮) নিয়ে আহাজারি করে যাচ্ছেন মা শ্যামলা বেগম। পাশেই তিন বছরের ছোট মেয়ে ফাতেমাকে নিয়ে বাকরুদ্ধ স্ত্রী আসিয়া বেগম।
ভ্যানচালক ফারুক ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। স্থানীয় এক নারীর শ্লীলতাহানির ঘটনায় শুক্রবার দোষীদের বিচারের দাবিতে সেখানে গিয়েছিলেন ফারুক। কিন্তু পুলিশের নির্মম গুলিতে আহত হন। পরে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট কালিহাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে সেখানে তার মৃত্যু হয়।
একই অবস্থা ঘাটাইল উপজেলার কালিয়া গ্রামের শামীম মিয়ার (৩৫) বাড়িতে। ঘটনার দিন জুমার নামাজ আদায় করতে গিয়েছিলেন শামীম। কিন্তু নামাজ শেষে আর বাড়ি ফেরা হয়নি তার। আসন্ন ঈদের পরেই সৌদি আরবে চলে যাওয়ার কথা ছিল তার। এর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে টাকা জমাও দিয়েছিলেন তিনি।
সন্তান হারানোর বিচার চান নিহত শামীমের মা আমেনা খাতুন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে তো মিছিল মিটিংয়ে যায়নি। তবে কেন তাকে পুলিশ গুলি করল। তার দুটি ছোট ছোট ছেলে রয়েছে। এই সন্তানগুলোকে এখন কে বড় করবে? কে আমাদের পরিবারের জন্য রোজগার করবে?’
স্বামীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন স্ত্রী বিথি। আদরের দুই সন্তান বাদল (৮) ও দেড় বছরের মীনকে নিয়ে স্বামীর লাশের পথ চেয়ে আছেন তিনি।
এদিকে শামীমের বাড়িতে আসা এলাকাবাসী জানান, শামীম এলাকার অন্যায়ের অন্যতম প্রতিবাদকারী যুবক ছিলেন। যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা তার স্বভাবসুলভ আচরণ ছিল। তারা দোষীদের উপযুক্ত বিচার দাবি করেন।
একই অবস্থা আরেক নিহত কালিহাতী উপজেলার সালেঙ্গা গ্রামের শ্যামল দাশের বাড়িতে। স্থানীয় একটি সেলুনে কাজ করা শ্যামল সেদিন গিয়েছিলেন শ্লীলতাহানির প্রতিবাদ জানাতে। তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুত্রশোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন বাবা রবি দাশ। আপনজনদের ধরে বিলাপ করছেন মা ভারতী রানী। তিন ভাইয়ের মধ্যে শ্যামল ছিলেন সবার বড়। নিরীহ এই পরিবারের স্বজন হারানোর বিচার দাবি করল স্থানীয় এলাকাবাসী।
এদিকে সকাল থেকেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কালিহাতী বাসস্ট্যান্ড ও হামিদপুর এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে বিপুলসংখ্যক পুলিশ।
অপরদিকে কালিহাতী থানায় পুলিশের ওপর হামলা ও তাদের কাজে বাধা দেওয়ায় সাধারণ জনগণকে আসামি করে মামলার প্রস্তুতি চলছে। তবে এই ব্যাপারে মিডিয়ার সামনে কোনো কথা বলতে রাজি হননি কালিহাতী থানার অফিসার ইনচার্জ শহিদুল ইসলাম।
ঘাটাইল থানার অফিসার ইনচার্জ মোখলেছুর রহমান জানান, পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক রয়েছে। সড়কে যানবাহন চলাচল করছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ সতর্ক রয়েছে।
শুক্রবারের এই ঘটনার পর পুরো কালিহাতীজুড়ে সাধারণ জনগণের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। কিছু কিছু দোকানপাট খুললেও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। ঈদের সামনে এই ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার জের ধরে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।
নিহতদের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য টাঙ্গাইল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে লাশগুলো হস্তান্তর করা হবে।
উল্লেখ্য, কালিহাতী উপজেলা সদরের সাতুটিয়া এলাকার মোজাফফর হোসেনের ছেলে রফিকুল ইসলাম ওরফে রোমার স্ত্রী হোসনে আরার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী ঘাটাইল উপজেলার শ্রমজীবী আলামিনের (১৭) প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কয়েক মাস আগে আলামিনের সঙ্গে পালিয়ে যায় হোসনে আরা। পরে তাকে ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর গত ১২ সেপ্টেম্বর আবারো আলামিনের সঙ্গে পালিয়ে যায় হোসনে আরা। ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে রোমা ও তাদের পরিবারের লোকেরা আলোচনার কথা বলে আলামিন, তার মা ও হোসনে আরাকে রোমাদের বাড়িতে ডেকে আনা হয়। পরে বাড়ির উঠানে আলামিনকে বিবস্ত্র করেন রোমা ও তার ভগ্নিপতি হাফিজ। এ সময় আলামিনের মাকেও বিবস্ত্র করা হয়। মারধরের পাশাপাশি আলামিনের মাকে ঘরে নিয়ে রোমা ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এই ঘটনার বিচারের দাবিতে শুক্রবার স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতার মিছিলে হামলা করে পুলিশ। সে সময় পুলিশ অবরোধকারীদের হটাতে লাঠিপেটা করে, প্রায় ৬০ রাউন্ড গুলি, রাবার বুলেট ও টিয়ার শেল ছোড়ে। এতে এক নারীসহ ছয় ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হন। এ ছাড়া আরো প্রায় ৫০ জন আহত হন। পরে গুলিবিদ্ধ ছয়জনের মধ্যে তিনজন মারা যান।
জেআই





