দুর্নীতি আমাদের জাতীয় জীবনের প্রধান সমস্যা- এ বক্তব্যের সাথে দেশের সচেতনমহল একমত। ঐতিহাসিক ও বাস্তবধর্মী বহুবিধ কারণে আমরা দুর্নীতিগ্রস্ত জাতিতে পরিণত হয়েছি। বার্লিনভিত্তিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-এর জরিপে ইতঃপূর্বে আমরা দুর্নীতির ক্ষেত্রে দু'একবার বিশ্বে শীর্ষস্থান লাভ করেছি।
দেশের ভাল-মন্দ নিয়ে যারা কম-বেশি চিন্তা-ভাবনা করেন তারা আমাদের জাতীয় জীবনের এ করুণ দশায় রীতিমত হতাশ হয়ে পড়েছেন। এ মরণ ব্যাধি আমাদের কতখানি আক্রান্ত করেছে তার উজ্জ্বল প্রমাণ বিগত ২৩/০৭/২০০৮ তারিখের দৈনিক ইত্তেফাকের ১ম পাতায় প্রকাশিত একটা সংবাদ- যেখানে তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যানের ঠাকুরগাঁয়ে সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের এক সমাবেশের বিবরণ আছে।
ঐ সমাবেশের এক পর্যায়ে ঘুষগ্রহণ করেন না এমন কেউ এখানে আছেন কিনা জানতে চাইলে কেউ দাঁড়াতে পারেনি- এমন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এ কথাও বলা হয়েছে, ঘুষ নেয়া-দেয়া ধরিয়ে দিতে পারলে তাকে পুরস্কৃত করা হবে।
এটা কি অবনতির অতল গহবরে নিমজ্জিত হবার আলামত নয়? এভাবে চলতে থাকলে আমাদের ভবিষ্যৎ পরিণতি চিন্তা করে অনেকেই দুর্নীতি প্রতিরোধের উপায় নিয়ে বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন, যা দেশের পত্রপত্রিকা, রেডিও-টিভি, সভা-সেমিনার ইত্যাদি অঙ্গনে লক্ষ্য করা যায়।
নিজেদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ, আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকেই এসব পরামর্শ উপস্থাপিত হতে দেখা যায়। কেউ সর্বগ্রাসী এ ব্যাধি প্রতিরোধে সুবিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, কেউ বিদ্যমান আইন সংশোধন করে কঠোর আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এটা নিয়ন্ত্রণে আনার কথা বলেছেন। কেউ হয়তোবা দেশের বেকারত্ব নিরসনের রোডম্যাপ প্রদান করেছেন, আবার কেউ নৈতিক চরিত্র পরিবর্তনের পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ প্রদান করেছেন।
প্রকৃতপক্ষে এটা একটা জটিল ও কঠিন সমস্যা। দু'একটা কারণে দুর্নীতি জন্মলাভ করেনি এবং এ মর্মান্তিক পর্যায়ে পৌঁছেনি। এছাড়া ঠুনকো কোন ধাক্কায় বা পদক্ষেপে তা প্রতিরোধ করাও সম্ভব নয়। দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা ও বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে আমাদের চারিত্রিক পরির্বতন সাধনই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আনার সর্বোত্তম উপায়।
আর এ উপায় কার্যকরী করার ক্ষেত্রে নৈতিকতাভিত্তিক শিক্ষার রয়েছে একটা যুগান্তকারী ও পরীক্ষিত ভূমিকা। আলো যেমন অন্ধকার দূর করে শিক্ষা তেমন অজ্ঞতা, অন্যায় ও অসত্যের অন্ধকার অপসারণে সক্ষম। এ প্রসঙ্গে ইংরেজ কবি ইয়েটস-এর কথা স্মরণীয়। তিনি বলেছেন Education is not filling of a fail but lighting of fire অর্থাৎ শিক্ষা অর্থ খালি বালতি পূরণ করা নয় বরং আলো প্রজ্বলিত করা।
একটা জাতির জন্য সব দিকের একজন যোগ্য মানুষ তৈরি যে শিক্ষার মহৎ উদ্দেশ্য একথা উল্লেখ করেছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের সম্রাট দার্শনিক ইবনে সিনা। তাঁর ভাষায় The task of education as creating a compleate citizen, physically, mentally and morally and preparing him for a professon whereby he could earn his own livelyhood and contribut to the society.
আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার উপরোক্ত উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর মানবিক ও নৈতিক বিকাশের সুযোগ নেই। আধুনিক শিক্ষা আমাদের সভ্যতার অঙ্গনে বৈপ্লবিক পরির্বতন সাধন করেছে ঠিকই কিন্তু নৈতিক মানে গুণান্নিত করতে পারেনি।
বসনিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দার্শনিক আলীযা আলী ইজেত বিগোভিচ বলেছিলেন-আধুনিক শিক্ষা মানুষকে অধিকতর ভাল, অধিকতর স্বাধীন বা অধিকতর মানবিক করে না পরিবর্তে এ শিক্ষা মানুষকে অধিকতর দক্ষ, সামর্থ্য ও সমাজের জন্য অধিকতর উপযোগী হিসেবে গড়ে তোলে।
এ শিক্ষা মানুষকে ভোগবাদী করে সম্পদের আসক্ত করে রেখেছে। নৈতিকতাবিহীন শিক্ষার পরিণতি উল্লেখ করেছেন বস্তুবাদী শিক্ষার অন্যতম দার্শনিক স্টানলি হল। তার কথায়-lf you teach your children the three R’s (Reading, writing and Arithmatics) and leave the fourth (r) religion you will get fifth’R (Rascality).
তাই দেখা যায় অন্যায় অবিচার জুলুম প্রতিরোধে মানুষের চারিত্রিক পরিবর্তন সাধনে আধুনিক শিক্ষার সাথে নৈতিক শিক্ষার সমন্বয় সাধন ছাড়া জাতীয় অধঃপতন ঠেকানো সম্ভব নয়। ইতিহাস আলোচনা করলে দেখা যায় প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে দার্শনিক প্লেটো, অ্যারিস্টেটল তাদের দর্শন চিন্তায় সত্যিকারের সৎ ও নিষ্ঠাবান নাগরিক তৈরি করতে নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজনের কথা বলেছেন।
নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড.অর্মত্য সেন তার দীর্ঘ গবেষণায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির সাথে সামন্তরালভাবে Ethics-কে গুরুত্ব দেয়ার কথা তুলে ধরেছেন। দুঃখের সাথে বলতে হয়, পূর্বে আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে যতটুকু নৈতিক শিক্ষার চর্চা ছিল বর্তমান সময়ে এসে তাও বিলুপ্তির পথে।
আগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আদর্শলিপি দেখে হাতের লেখা অভ্যাস করতে হতো আর তাতে লেখা ছিল ‘সর্বদা সত্য কথা বলিবে', ‘চুরি করা মহাপাপ', ‘গুরুজনের সম্মান করিবে', ‘অহংকারই পতনের মূল' ইত্যাদি। পড়ান হতো লিও টলস্টয়ের একজন মানুষের কতটুকু জমির প্রয়োজন- যার নীতি কথা হলো লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। এভাবে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা থাকলে শিশু-কিশোরদের নীতিবোধ জাগ্রত হতো।
পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতার অনুপ্রবেশ ও প্রচলিত শিক্ষার সংশোধন ছাড়া জাতিকে রক্ষার কোন উপায় নেই। আমাদের বিদ্যমান দুর্নীতির মূল উৎপাটনের জন্যে এবং নতুন প্রজন্মকে দুর্নীতির ব্যাধিমুক্ত, সংক্রমণমুক্ত রাখতে সকল প্রকার শিক্ষায় নৈতিকতার অনুপ্রবেশ চাই- এটা হোক জাতীয় প্রত্যাশা। লেখক: আব্দুল হাছিব মল্লিক
এমএনজে





