আজিজ কো-অপারেটিভ সুপার মার্কেটে নিজ কার্যালয়ে গত ৩১ অক্টোবর কুপিয়ে হত্যা করা হয় জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সল আরেফিন দীপনকে। এরপর পেরিয়ে গেছে এক সপ্তাহেরও বেশি।

কিন্তু এখনো স্বস্তি ফেরেনি আজিজ সুপার মার্কেটে। নেই আগের সেই কর্মচাঞ্চল্য। কমেছে বিক্রি। অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না আজিজ সুপার মার্কেটের মতো জায়গায় ঘটেছে এমন ঘটনা। তবে সময়ের সঙ্গে বাড়বে মানুষের আনাগোনা, বাড়বে বিক্রি, স্বাভাবিক হবে সব—এমনটাই আশা ব্যবসায়ীদের।

গতকাল রোববার সন্ধ্যার পর আজিজ কো-অপারেটিভ সুপার মার্কেটে জাগৃতির কার্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা যায় মার্কেটের অন্যান্য জায়গার মতো কর্মব্যস্ততা নেই এখানে। সুনসান নীরবতা। জাগৃতির দরজায় তালা ঝুলছিল। তালা ঝুলছিল জাগৃতির দুপাশের দুটি দোকানেও। সেখানে কর্মরত এক নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এর একটি সমিতির কার্যালয় এবং অন্যটি একজন আইনজীবীর চেম্বার। জাগৃতির ঠিক উল্টো পাশে শর্ট ফিল্ম ফোরামের কার্যালয়, সেটিও তালাবদ্ধ।

মার্কেটের তিন দলায় দায়িত্ব পালনরত ওই নিরাপত্তাকর্মী বলেন, খুব কম সময় সমিতি এবং শর্ট ফিল্ম ফোরামের কার্যালয় খোলা থাকে। এ ছাড়া আইনজীবীও বেশি সময়ের জন্য থাকেন না। তাই এলাকাটা নীরব থাকে। তিনি আরও বলেন, আগে তিনি নিচে মার্কেটের ফটকের কাছে দায়িত্ব পালন করতেন। তবে ওই ঘটনার পর মার্কেট কমিটির পক্ষ থেকে সব জায়গায় নিরাপত্তাকর্মী দেওয়া হয়েছে। আগের চেয়ে মার্কেটে মানুষের আনাগোনা কিছুটা কমেছে বলে জানান তিনি।

আজিজ কো-অপারেটিভ সুপার মার্কেট দোকান মালিক ও ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি নাজমুল আহসানও বললেন এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি মার্কেট। ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ও অস্বস্তি কাজ করছে। তিনি বলেন, ওই ঘটনার পর থেকে তিন দিন মার্কেট বন্ধ ছিল। বুধবার থেকে মার্কেট খোলা হয়েছে। এখনো ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত। পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সপ্তাহখানেক সময় লাগবে।

জাগৃতির কার্যালয়ের এক দোকান পরেই উৎস প্রকাশন। উৎস প্রকাশনের গ্রাফিকস ডিজাইনার শিশির আহমেদ কাজ করছিলেন কম্পিউটারে। তিনি বললেন, ‘প্রতিটি মুহূর্ত ভয়ের। কাল (শনিবার) একজন লেখক এসে বই বের করতে চাইলেন। কিন্তু ভয়ে তেমন কথাও বলিনি। এখন যেখানেই যাচ্ছি মনে হচ্ছে কেউ যেন ফলো করছে। স্বস্তি নাই।’ তিনি বলেন, দীপনের জাগৃতির কার্যালয় আগে দ্বিতীয় তলায় ছিল। কিন্তু তিনতলাটি নীরব থাকে বলে দীপন তিন মাস আগে জাগৃতির কার্যালয় তিনতলায় স্থানান্তর করেন। নীরবতাটাই কাল হলো। ঘটনার সময় তাঁরা কয়েকজন দোকানের ভেতর উপস্থিত থাকলেও সামান্য চিৎকারও শোনেননি। তিনি মার্কেটের নিরাপত্তা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বলেন, ‘এখন এখানে নিরাপত্তাকর্মী দিয়ে লাভ কী, যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে।’

আজিজ সুপার মার্কেটে বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসের শো রুমের সংখ্যাই বেশি। মার্কেটের নিচতলা থেকে চতুর্থতলা পর্যন্ত প্রায় প্রতি তলাতেই রয়েছে ফ্যাশন হাউস। একটি ফ্যাশন হাউসের একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের অনুরোধ করে বলেন, ওই ঘটনার আগে দৈনিক কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার মতো বিক্রি হতো। এখন সেটি পাঁচ হাজারে নেমে এসেছে।

ফ্যাশন হাউজগুলোতে ভিড় নেই আগের মতো। ছবি: একরামুল হুদাআর্টিকেল নামে একটি ফ্যাশন হাউসের মালিক হাবিবুর রহমান বলেন, ২৮ অক্টোবর তিনি শীতের পোশাক দোকানে তোলেন। ২৮,২৯ এবং ৩০ অক্টোবর তিনি পাইকারি ক্রেতার কাছে কাপড় বিক্রি করেছেন। তবে ৩১ তারিখ দীপনকে হত্যার পর থেকে পোশাকের খুচরা ক্রেতারা এলেও পাইকাররা আসছেন না। ফোন করলে পাইকাররা বলেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হোক, তারপর আসবেন।

মার্কেটে বইয়ের দোকানও আছে বেশ কয়েকটি। দুর্লভ কিছু বই আজিজ কো-অপারেটিভ সুপার মার্কেটে পাওয়া যায় বলে সুনামও আছে। একটি দোকানের ব্যবস্থাপক বললেন, বইয়ের দোকানের কোনো মৌসুম থাকে না। কিছু নিয়মিত পাঠক যারা সব সময় আসতেন তাঁদের আনাগোনা কিছুটা কম। যেসব বইয়ের জন্য লেখক বা প্রকাশকেরা খুন হচ্ছেন সে সব বইয়ের খোঁজে কিছু মানুষ আসছেন। তিনি বলেন, ‘পাঠকের মধ্যেও ভয় কাজ করছে। কিছুক্ষণ আগে এক পাঠক অভিজিতের একটি বই কিনতে চাইলেন। বইটি আছে কি না, এমনভাবে জানতে চাইলেন যেন চুরি করতে এসেছেন।’প্রথম আলো

এমআর