একজন অনলাইন অ্যক্টিভিস্ট, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং অপরজন সমকামী অধিকার কর্মী। দু’সপ্তাহে মধ্যেই একের পর এক অর্থাৎ তিনটি বড় হত্যাকাণ্ড।

হত্যাকাণ্ডর ধরন একই রকম। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা। ইন্টারনেটে তিনটি ঘটনারই দায় স্বীকার করেছে উগ্র ইসলামপন্থী সংগঠন। এসব উগ্রপন্থী সংগঠনের ভাষায় হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিরা ইসলাম বিরোধী।

গত বছরের শুরুতে অভিজিৎ রায় হত্যাসহ যারাই হত্যার শিকার হয়েছে তাদের কে হয়তো নাস্তিক নতুবা ইসলাম বিদ্বেষী হিসেবে বলেছে এসব উগ্রপন্থী সংগঠন।

হত্যাকাণ্ড যখন চলছে তখন ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ধর্ম নিয়ে লেখালেখির ক্ষেত্রে ‘বাড়াবাড়ি’ করলে সরকার সেটি সহ্য করবে না।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলছেন তাদের দল কোন ধর্মকে অবমাননা করে কোন লেখার বিষয়ে কখনোই নীরব ভূমিকা পালন করতে পারে না।

হানিফ আরো বলেন, “ আমরা মুসলমান হিসেবে আমাদের ধর্মের প্রতি সমর্থন থাকবে। যে দেশের নব্বই ভাগ মানুষ মুসলমান, সে দেশের একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে কেন তার বিপক্ষে যেতে হবে?আমাদের ধর্মের প্রতি যেমন সমর্থন থাকবে তেমনি অন্য ধর্মের প্রতিও আমাদের শ্রদ্ধা আছে।”

আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবুল আলম হানিফ বলেন, যে দেশের নব্বই ভাগ মানুষ মুসলমান, সে দেশের একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে কেন তার বিপক্ষে যেতে হবে?

সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর সাথে ধর্মীয় বিষয়কে যেভাবে যুক্ত করা হচ্ছে সেজন্য দল হিসেবে এর বিপক্ষে রাজনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থান নেয়া বেশ কঠিন।

সেক্ষেত্রে দলটির ধর্মনিরপেক্ষতার যে নীতি আছে তার সাথে তারা আপস করছেন বলেও অনেকে অভিযোগ করছেন।

কিন্তু ধর্ম নিয়ে আওয়ামীলীগের এই অবস্থান নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ইসলাম বিরোধী লেখার কারণে কবি দাউদ হায়দারকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল।

নব্বই’র দশকে লেখিকা তসলিমা নাসরিন ইস্যুতেও আওয়ামীলীগ তার পক্ষে দাঁড়ায়নি। এমনকি অতি সম্প্রতি হজ্ব নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করায় দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে প্রভাবশালী নেতা লতিফ সিদ্দিকীকে।

কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ নজরুল বলছেন, ইসলাম ধর্মের বিপক্ষে যায় এমন কোন ইস্যুতে দলটি অতীতেও কোন আপোস করেনি।

অধ্যাপক নজরুল মনে করেন, “ধর্মকে আওয়ামী লীগ সবসময় গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি তারা অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথাও বলেছে। যারা মনে করে আওয়ামী লীগ নাস্তিকদের পক্ষে দাঁড়াবে তারা ভুল করেন। ”

সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। দেশের ভেতরে নাগরিক সমাজের কেউ কেউ এনিয়ে উচ্চবাচ্য করলেও সাধারণ মানুষের মাঝে এনিয়ে তমেন কোন প্রতিক্রিয়া নেই। কারণ বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে এর বিরুদ্ধে তেমন জোরালো অবস্থান দেখা যাচ্ছেনা।

অধ্যাপক আসিফ নজরুল এসব ঘটনার বিচার না হলে মানুষ সরকারকে ভুল বুঝবে।

অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি’র দিক থেকেও তেমন একটা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে জিজ্ঞেস করা হলো ব্লগারসহ অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোকে তারা কিভাবে দেখছেন?

উত্তরে রিজভী বলেন, “ যে শক্তি এ কাজটি করছে তারা দেশ ও মানুষের শত্রু। বিচারের দায়িত্ব সরকারের। যারা এসব কাজ করছে তাদের সমূলে ধ্বংস করতে হবে। ”

হত্যাকাণ্ডর শিকার হওয়া ব্লগারদের কারও কারও নাস্তিক হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের অনেকেই তাদের নাস্তিক হিসেবে বিবেচনা না করে ইসলাম-বিদ্বেষী হিসেবে মনে করেন। কারণ তাদের বিভিন্ন লেখায় ইসলাম ধর্মের সমালোচনা উঠে এসেছে।

এসব ব্লগারদের ক্ষেত্রে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি একই রকম।

বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী বলছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ধর্ম নিয়ে সমালোচনার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

 

রিজভীর বর্ণনায়, “ একটা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মনে আঘাত দিয়ে কোন কিছু লেখা খুবই দু:খজনক। ”

ব্লগারসহ অন্যান্যদের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি যাই হোক না কেন, এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার জরুরী বলে মনে করেন মানবাধিকার কর্মীরা। তারা মনে করেন হত্যাকাণ্ডের সূচনা ব্লগার দিয়ে শুরু হলেও এর পর বিভিন্ন ধরনের মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।

বিএনপি নেতা রুহুল কবীর রিজভী বলেন, বিচারের দায়িত্ব সরকারে। যারাই এই কাজ করুক তাদের সমূলে ধ্বংস করতে হবে।

এই ধরন বিস্তৃত হয়েছে মন্দিরের পুরোহিত, মুসলিম পীর, ধর্মান্তরিত খ্রিষ্টান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিয়া, আহমদিয়া, বিদেশী এবং সর্বশেষ সমকামী অধিকার কর্মী।

অধিকাংশ ঘটনায় অপরাধীদের ধরতে না পারায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আন্তরিকতা এবং দক্ষতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠছে তেমনি এখানে সরকারের রাজনৈতিক দোদুল্যামানতাও প্রকাশ পাচ্ছে বলে অনেকেই মনে করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ নজরুল মনে করেন,ঘটনার বিচারের সাথে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবার কোন সম্পর্ক নেই। তিনি মনে করেন দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি ঘটাতে হলে এসব হত্যাকাণ্ডের বিচারের কোন বিকল্প নেই।

অধ্যাপক নজরুল বলেন, “ এসব ঘটনার বিচার হলে মানুষ সরকারকে ভুল বুঝবে না। এসব ঘটনার বিচার হলে দেশের মানুষ ভাববেনা যে আওয়ামী লীগ ধর্মদ্রোহীদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। বরং বিচার না হলে মানুষ সরকারকে ভুল বুঝবে।”

মানবাধিকার কর্মী নুর খান লিটন মনে করেন, এসব হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে যেসব কথা-বার্তা বলা হচ্ছে সেটি তদন্তকারীদের নিরুৎসাহিত করতে পারে।

ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলছেন বিচারে নিয়ে সরকারের মাঝে কোন দোদূল্যমানতা নেই। ২০১৩ সালে খুন হওয়া ব্লগার আহমেদ রাজিব হায়দার হত্যাকাণ্ডের বিচার নিম্ন আদালতে শেষ হওয়া তারই প্রমাণ।

সরকার অবশ্য স্বীকার করছে যে জঙ্গিদের অতর্কিত সন্ত্রাসী আক্রমণের কৌশল মোকাবেলার উপায় তারা এখনো খুঁজে পাননি। কিন্তু এসব ঘটনার বিচারের ক্ষেত্রে সরকার উদাসীন নয় বলে উল্লেখ করেন আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবুল আলম হানিফ।

এসব ঘটনার অপরাধীদের ধরার জন্য মানুষ যাতে পুলিশের উপর আস্থা রাখে কর্মকর্তারা সে আহবান জানাচ্ছেন।

তবে এজন্য সময় লাগবে বলেও তারা উল্লেখ করছে। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের তালিকা তথাকথিত নাস্তিক ব্লগারদের ছাপিয়ে যেভাবে আরও বিস্তৃত হচ্ছে সেটিই উদ্বেগের তৈরি করছে অনেকের মাঝে।

সূত্র : বিবিসি বাংলা