বন্দরনগরী চট্টগ্রাম এখন ইয়াবা চোরাচালানের ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। র‌্যাব, পুলিশ, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ দেশের সকল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি, একের পর এক অভিযান সত্ত্বেও থামানো যাচ্ছে না মরণ নেশা ইয়াবার পাচার আর চোরাচালান। কোনভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না পাচারকারীদের।
কখনো গাড়িতে সংবাদপত্রের স্টিকার লাগিয়ে, কখনো ল্যাপটপ ও মোবাইলের ভেতর, কখনো দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি কিংবা গ্যাসের সিলিন্ডারের ভেতর ঢুকিয়ে পাচার হচ্ছে লাখ লাখ পিস ইয়াবা। আমড়ার বস্তা, পানের খাঁচা, ফিশিং ট্রলার কোন কিছুই এখন আর বাদ যাচ্ছে না ইয়াবা পাচারের মাধ্যম থেকে।

সাম্প্রতিক সময়ে ইয়াবা ট্যাবলেটের বেশ কিছু বড় বড় চালান চট্টগ্রামে আটক হলেও এর চেয়েও অনেক বেশি সংখ্যক চালান চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে নির্বিঘ্নে পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে। সর্বশেষ গত ১৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরের কাছে বহিনোঙরে একটি ফিশিং ট্রলারে অভিযান চালিয়ে প্রায় ১৫ কোটি টাকার ২ লাখ ২০ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে চট্টগ্রাম নৌবাহিনীর চোরাচালান বিরোধী বিশেষ টাস্কফোর্স। এর পরও গত দুই সপ্তাহে প্রায় ১৫টির বেশি ইয়াবার চালান আটক করতে সক্ষম হয় পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনী।

চট্টগ্রাম মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মেট্রো সাব রিজিয়নের তত্ত্বাবধায়ক চৌধুরী ইমরুল হাসান জানান, ইয়াবা ট্যাবলেটের মূল উৎসস্থল টেকনাফ, কক্সবাজার হলেও পাচারকারীরা চট্টগ্রামকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে দেশের বিভিন্নস্থানে ইয়াবা পাচারে সক্রিয় রয়েছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি থাকায় ইয়াবা পাচারকারীরা তাদের কৌশল বদল করে সমুদ্র পথসহ নানা অভিনব পন্থা অবলম্বল করছে ইয়াবা পাচারে। এর পরও বিপুল সংখ্যক ইয়াবার চালান আটক করা হচ্ছে। গ্রেফতার করা হচ্ছে পাচারকারীদের।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের টেকনাফ সার্কেলের পরিদর্শক মো. ইব্রাহিম হোসেন জানান, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়। এ জন্য ইয়াবা বহনে সনাতন পদ্ধতি পরিহার করে নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে এর ব্যবসায়ীরা।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ইয়াবা বহনে পাচারকারীরা এনেছে নতুনত্ব। ইয়াবা বহনে নতুন কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে সুন্দরী নারী, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের। পরিবহনের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করছে দামি ব্র্যান্ডের প্রাইভেটকার ও বিলাসবহুল দূরপাল্লার গাড়ি। এছাড়া সমুদ্রপথে চট্টগ্রামে ইয়াবা আনার জন্য ব্যবহার করছে কুতুবদিয়া-মহেশখালী চ্যানেলকে। আর পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে ফিশিং ট্রলার ও ইঞ্জিন বোটকে।

ইয়াবা চোরাচালানীদের নতুন কৌশল সম্পর্কে ইয়াবার অসংখ্য চালান আটককারী বাকলিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ মোহসিন জানান, আমরা গত দুই মাসে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম পাচার হয়ে আসার পথে অর্ধশতাধিক ইয়ারার চালান আটক করতে সক্ষম হয়েছি। এসব চালান আটকের ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছে প্রায় ৭০ জন ইয়াবার পাচারকারীকে। পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রেফতার এড়াতে ইয়াবা পাচারকারীরা সুন্দরী নারী ও ছাত্রদের ব্যবহার করছেন। পুলিশ যাতে সন্দেহ না করে এ জন্য সুন্দরী নারীরা শরীরে পরিধান করেন স্বর্ণের অলঙ্কার ও সঙ্গে রাখেন বাচ্চা। ফলে অনেক সময় পুলিশের তল্লাশি এড়িয়ে ইয়াবা পাচারকারীরা ইয়াবার চালান নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম মহানগরীর সিটি গেইট এলাকায় একটি প্রাইভেট জিপে সংবাদপত্রের স্টিকার লাগিয়ে ইয়াবা পাচারের সময় ১৩শ’ ইয়াবা ট্যাবলেটসহ তিন যুবককে গ্রেফতার করে পুলিশ। একই দিন ৫০০ পিস ইয়াবাসহ নজরুল ইসলাম নামে আইনজীবীর এক সহকারীকে গ্রেফতার করে নগরীর বাকলিয়া থানা পুলিশ।

পরদিন শুক্রবার কক্সবাজার থেকে আমড়ার বস্তার ভেতরে নিয়ে পাচার করার সময় ৭ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হয় এক যুবককে। এর আগে ১৭ সেপ্টেম্বর ল্যাপটপের ভেতর দিয়ে তিন হাজার পিস ইয়াবা পাচারের সময় আবদুল আউয়াল নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে একই থানার অভিযানকারী দল। ১৬ সেপ্টেম্বর শিমের বস্তায় নিয়ে পাচারের সময় ৬ হাজার পিস ইয়াবাসহ নুর হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে লোহাগাড়া থানা পুলিশ।

গত ২১ জুলাই গ্যাসের সিলিন্ডারের ভেতর ভরে ১৫ হাজার পিস ইয়াবা পাচারের সময় তিনজনকে গ্রেফতার করে কর্ণফুলী থানা পুলিশ। ২০ জুলাই পানবাহী ট্রাকে ইয়াবা পাচারের সময় জিয়াউর রহমান ও মনির হোসেন নামের দুই যুবককে গ্রেফতার করা হয়। ৪ এপ্রিল সাউন্ড বক্সের ভেতর ঢুকিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ইয়াবা পাচারের সময় একটি চালান আটক করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এর আগে পিঠা ও আচারের ভেতর করে ইয়াবা পাচারের সময় তিন রোহিঙ্গাকে গ্রেফতার করা হয়।

ঢাকা, ২৩ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, জেআই