পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি, বামপন্থী নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল আর নেই।

বুধবার দিবাগত রাতে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। গুরুত্বর অসুস্থ অবস্থায় তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট নেয়া হলে সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৬৫ বছর।

মুক্তিযুদ্ধে অসামন্য অবদান রাখা মহিয়সী এই নারীর জন্ম ১৯৫১ সালের ২রা সেপ্টেম্বর পাবনা জেলায়। বাবা খোন্দকার শাহজাহান মোহাম্মদ ও মা সেলিনা বানু।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। এছাড়াও ১৯৭০-১৯৭৩ সাল পর্যন্ত পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়ন এর সভানেত্রী এবং কিছু সময়ের জন্য পাবনা জেলা মহিলা পরিষদের যুগ্ম সম্পাদিকা ছিলেন।

২৫শে মার্চ ১৯৭১ সালে দেশের অন্যান্য স্থানের মত পাবনা জেলাও পাকহানাদারদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। সাধারণ মানুষের উপর নেমে আসে অবর্ণনীয় অত্যাচার। ২৭শে মার্চ পাবনার মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা আক্রমণ। ২৭শে মার্চ পাবনা পুলিশলাইনে যে যুদ্ধ সংগঠিত হয় সেখানে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেয়। নারী হয়েও শত প্রতিকূলতার মাঝে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এক আত্মীয়ের কাছে মাত্র ত্রিশ মিনিটে থ্রি নট থ্রি চালনা শিখে ফেলেন। কিন্তু নারী হিসেবে সে সময়কার সমাজে সম্মুখ যুদ্ধে যাওয়া ছিল খুবই কঠিন ব্যাপার। তাই তিনি শহীদ বীরকন্যা প্রীতিলতাকে অনুসরণ করে পুরুষের পোশাক পরিধান করে পুরুষবেশে যুদ্ধে যোগ দেন।

২৮শে মার্চ টেলিফোন এক্সচেঞ্জে ৩৬ জন পাকসেনার সাথে জনতার এক তুমুল যুদ্ধ সংগঠিত হয়। সেই যুদ্ধে তিনি ছিলেন একমাত্র নারী যোদ্ধা। এই যুদ্ধে ৩৬ জন পাকসেনা নিহত এবং ২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়। এছাড়াও ৩১শে মার্চ পাবনার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপিত হয়। ৯ এপ্রিল নগরবাড়িতে এক প্রচণ্ড যুদ্ধ সংগঠিত হয়। সে সময় কন্ট্রোল রুমের পুরো দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

এরপর ভারতের স্টেটসম্যান পত্রিকার সাংবাদিক মানব ঘোষ তাঁর ছবিসহ পুরুষ সেজে যুদ্ধ করার খবরটি পত্রিকায় প্রকাশ করলে তাঁর পক্ষে আর পুরুষ সেজে যুদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু তাঁর যুদ্ধ থেমে থাকেনি। পরবর্তীতে পাবনা শহর পাকবাহিনী দ্বারা দখল হলে তিনি ২০শে এপ্রিল সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেন। সেখানে বাংলাদেশ সরকার পরিচালিত একমাত্র নারীদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প গোবরা ক্যাম্পে যোগ দেন। পরবর্তীতে মেজর জলিলের নেতৃত্বে পরিচালিত ৯নং সেক্টরে যোগ দেন।

দুঃসাহসী এ মুক্তিযোদ্ধার অবদান ও সাহসিকতা সর্বজন স্বীকৃত। পাবনার মুক্তিযোদ্ধার কাছে মুক্তিযুদ্ধে তার অংশগ্রহণ ও অবদান নিয়ে কোন প্রশ্ন না থাকলেও, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অজুহাতে দীর্ঘদিন বন্ধ করে রাখা হয়েছে তার মুক্তিযোদ্ধা ভাতা। মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় স্থগিত করে রাখা হয়েছে তার নাম। পাবনার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কিত প্রায় প্রতিটি গ্রন্থ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণায় তাঁর গৌরবগাঁথা উচ্চারিত হলেও অজ্ঞাত কারণে জেলা প্রশাসনের তথ্য বাতায়নে সংযুক্ত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নেই তাঁর নাম ও অবদানের কথা। তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী ও সাথী মুক্তিযোদ্ধারা।

পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও সাংবাদিক বীর মুক্তিযোদ্ধা রবিউল ইসলাম রবি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, মিতিলের মত আন্তর্জাতিক স্কীকৃত মুক্তিযোদ্ধার ভাতা ও তালিকায় নাম স্থগিত করে রাখা তার অবদানকে অস্বীকার করার শামিল। এটা অন্যায় ও জাতির জন্য চরম লজ্জার।

জেলা গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি ও সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন নেতা, সুলতান আহমেদ বুরো ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ইতিহাস চর্চায় বামপন্থীদের অবদানকে সব সময়ই আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে। শিরিন বানু মিতিলও তার বাইরে নন। শেষ বিদায়ে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেয়া না হলেও, অবাক হওয়ার কিছুই নেই।

এদিকে, শিরিন বানু মিতিলের মৃত্যুতে জেলার মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

এমআইএস