কুষ্টিয়ায় প্রতি বছরের মত এবারো কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা নদী থেকে গড়াই নদীর ড্রেজিং করা হচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে ঢিমেতালে ড্রেজিংয় করায় এ অঞ্চলের মানুষের সামান্যতম উপকারে আসছে না।
এলাকাবাসীর মতে এ প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা পানিতেই ভেসে যাচ্ছে। যদিও এ প্রকল্পের কর্মকর্তারা দাবি করছেন বিপুল অর্থের এই প্রকল্পের সুফল জনগণ ইতোমধ্যে পেতে শুরু করেছে।
সুত্র জানায়, ১৯৯৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গড়াই নদীর মুখে মাটি কেটে পরীক্ষামূলক নদী খননের কাজ উদ্বোধন করেন। কিছু দিনের মধ্যেই বৃষ্টির পানিতে মাটি ও বালুতে নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় ওই কাজে আর কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। ওই সময় বিপুল অর্থের অপচয় হয়েছে। পরের বছর ১৯৯৮ সালে এ নদী পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়।
জিআরসির মাধ্যমে জোরে-সোরে এ কাজটি শুরু হলে এলাকাবাসীর মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল। সবাই আশা করছিল গড়াই নদীতে আবারো সব সময় পানি প্রবাহের অবস্থা সৃষ্টি হবে।
তখন হরিপুর অংশে ড্রেজিংয়ের মাটি ও বালু ফেলে মহানগরের টেকে নানা প্রজাতির বৃক্ষরাজি দিয়ে একটি দৃষ্টি নন্দন সবুজে ঘেরা সুন্দর পার্ক গড়ে তোলা হয়। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই পার্কটি আজ এলাকার মানুষের কাছে শুধুই স্মৃতি।
বর্তমান মহানগর টেকের সেই পার্কটির আর অস্তিত্ব নেই। জিআরসির কাজ শেষ হওয়ার পরের বছর থেকেই আবারো মরুকরণের প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। শুষ্ক মওসুমে পদ্মার পানির স্তর নেমে যাওয়ায় গড়াই নদীর মুখে বিশাল বালুরাশি জমে যাওয়ায় গড়াই নদী একেবারে মরাখালে পরিণত হতে থাকে। এর বড় প্রভাব পড়তে শুরু করে দক্ষিণাঞ্চলের নদী এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্রের ওপর।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গড়াই নদীর পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা, এলাকার খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা করা, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা, সুন্দরবন এলাকার লবণাক্ত দূরীকরণ, দক্ষিণাঞ্চলের মিষ্টি পানির প্রবাহ বৃদ্ধি, সেচ সহযোগিতা প্রদান, মৎস্যচাষ সুবিধা, সুন্দরবনের বৃক্ষরাজির উৎপাদন বৃদ্ধিসহ কুষ্টিয়া, যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, ফরিদপুর, যশোর ও খুলনা এলাকাকে মরুকরণের হাত থেকে রক্ষাসহ আরো বেশ কয়েকটি মহৎ লক্ষ্য নিয়ে ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে চার বছর মেয়াদি ব্যাপকভিত্তিক ড্রেজিং করতে ‘গড়াই নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প-২’ প্রকল্প গ্রহণ করে।
এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৪২কোটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় কুষ্টিয়ার গড়াই নদীর মুখ থেকে শুরু করে কুমারখালী উপজেলার নন্দলালপুর ইউনিয়ন অফিস পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৪০ মিটার প্রস্থ গড়াই নদীর ৯৩ লাখ ঘন মিটার মাটি খনন করা হয়।
এ প্রকল্পে পানি উন্নয়ন বোর্ড দু’টি ড্রেজার মেশিন কেনে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে জমা দেয়ার আগেই এই দু’টি ড্রেজার মেশিন নিয়ে কেলঙ্কারির ঘটনা ঘটে। ফলে তৎকালীন পিডি ও নির্বাহী প্রকৌশলীকে এ প্রকল্প থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। প্রথম বছরে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলেও আকস্মিক বৃষ্টি ও পদ্মার পানির চাপ বৃদ্ধিতে পুরো নদী যৌবন ফিরে পেলে কর্তৃপক্ষ শতভাগ সফল বলে দাবি করেন।
এরপরের বছর থেকে একই চিত্র লক্ষ করা যায়। পুরো গড়াই নদী মরা নদীতে পরিণত হয়। চারদিকে শুধু বালু আর বালু। নদীর এপার ওপার পারপারের একমাত্র উপায় পায়ে হাঁটা। প্রতি বছরই গড়াই নদীর মুখ থেকে পদ্মার গভীরে দীর্ঘ খনন কাজ করা হয় এ প্রকল্পের ক্রয়কৃত ড্রেজার দিয়ে।
প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারভিত্তিক এই প্রকল্পে ইতোমধ্যে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা খরচ হয়ে গেলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। চলতি শুষ্ক মওসুম আসতে না আসতেই এ নদীর পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। নদীর বুকে জেগে উঠেছে ধূ-ধূ বালুচর।
গত চার বছরে নদীর উৎসমুখ তালবাড়িয়া থেকে খোকসা উপজেলা শহর পর্যন্ত মোট ৩০ কিলোমিটার নদী খননে ৫০৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়ে গেলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। গত মওসুমের খননকাজ শেষ হওয়ার কয়েক মাসের মাথায় গড়াই এখন একেবারে শুকনো। নদীর উৎসমুখে পলি জমে উঁচু হয়ে যাওয়ায় গড়াইয়ের পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। মানুষ হেঁটে নদী পাড়ি দিচ্ছে।

এ ছাড়া উত্তোলন করা বালু নদীর পাশে ফেলায় বর্ষা মওসুমে পানির তোড়ে সেই বালু নদীতে চলে যাওয়ায় নদী আবার ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়ে এ প্রকল্প পরিদর্শনে আসেন। মন্ত্রী গড়াই নদীর ড্রেজিং ব্যবস্থা ঘুরে দেখেন এবং কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় করেন।
এ সময় মন্ত্রী দাবি করেন,এ প্রকল্পের সুফল এলাকাবাসী পাচ্ছে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের নদীর পানির লবণাক্ততা আশানুরূপ কমেছে। তবে এ প্রকল্পটি সচল রাখতে সরকার গঙ্গা ব্যারাজের বিষয়ে চিন্তা করছে। গঙ্গ ব্যারেজ নির্মাণের পর এ নদীর পানির স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে।
এ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী নৈমুল ইসলাম জানান, বাস্তবিক অর্থে এ প্রকল্পের সুফল শুরু হয়েছে। এ কাজের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে সরকার ১৯১৭ সাল পর্যন্ত প্রকল্পের সময় বৃদ্ধি করেছে। তিনি জানান, গড়াই নদীর গতিপথকে সচল রাখতে পদ্মা নদীর চ্যানেল ঠিক রাখতে হবে। আর গঙ্গা বাঁধ নির্মাণ হলে নদীর চ্যানেল ঠিক রাখা সম্ভব হবে সেই সাথে গড়াই নদীর পানিপ্রবাহ সারা বছর সচল থাকবে।
কেএইচ





