চৈত্রের শেষ দিনেও প্রখর খরতাপে প্রকৃতিতে ভ্যাপসা গরম। চার দিকে খুন, গুম, রাহাজানি, হাহাকার, কষ্ট, নিপীড়ন এবং মানুষের প্রতিদিনকার জীবনে নেমে আসা অন্ধকারের ভেতর গত সন্ধ্যায় আরেকটি সূর্য অস্ত গেছে।
আজ ভোরে দশ দিগন্তে আলোর ফোয়ারা ছড়িয়ে যে সূর্য উঠবে পুবাকাশে, সেই সূর্য নিয়ে আসুক নতুন আলোক বার্তা। সেই কামনায় স্বাগত আরো একটি নতুন বৈশাখ। শুভ নববর্ষ ১৪২২।
বাংলা নতুন বর্ষবরণের সময়ে তাপদাহে অস্থির নগরের মানুষ। তবু নতুন পোশাক, খাবারের পসরা সব খানে। পুরনো দিনের কষ্ট-গ্লানি মুছে যাক, ঘুচে যাক জ্বরা। সে আশা করে নববর্ষ বরণ করার জন্য দেশের মানুষ প্রস্তুত হলেও গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা খুবই নির্মম-নিষ্ঠুর। চার দিকে মানুষের বেদনা, না পাওয়ার কষ্ট আর হতাশা। তবুও নতুন দিনের প্রত্যয়ে চৈত্রসংক্রান্তির শেষ সন্ধ্যায় গতকাল থেকেই রাজধানীসহ সারা দেশে বিভিন্ন আয়োজন। পাহাড়ে শুরু হয়েছে নতুন বছর বরণের উৎসব।
ইলিশের পসরা থেকে এক টুকরো উঠবে বিত্তবানদের পাতে। বিত্তহীনরা তাদের পণ্যের পসরা সাজিয়ে কিছু আয়ের চেষ্টা করছেন। রাজধানীর জনসমাগম বেশি হবে, এমন এলাকায় নেয়া তাদের ওই দোকান সাজানোর কাজ শেষ। কিছু জায়গায় আগের দিনেই বেশ সরগরম, আছে ক্রেতা-দর্শনার্থীদের বেশ ভিড়।
অন্যবারের মতো এবারো নববর্ষের সবচেয়ে বড় আয়োজনটি করবে ছায়ানট। ভোর সোয়া ৬টায় রমনার বটমূলে শুরু হবে এই আয়োজন। এ আয়োজনে গাইবেন ছায়ানটের শিল্পীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বের হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। চারুকলার বকুলতলায় চলবে বিভিন্ন আয়োজন। রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন আয়োজনে মুখর থাকবে পুরো দিন।
শুকিয়ে যাওয়া মানুষের চোখের পানি। সীমান্তে হত্যা, রাজনৈতিক নিপীড়ন তার মধ্যে নগরে বসে আমরা উন্নয়ন অগ্রযাত্রার যে বয়ান পাই তাকে মেলাতে না পারলেও সামনের দিনগুলো উৎকণ্ঠামুক্ত হবে, সেই আশা করছেন সবাই। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজনীতি অঙ্গন ঘিরে উৎকণ্ঠা সব মিলিয়ে দেশের অস্থিরতা নিয়ে কথা বলেছেন দেশ-বিদেশের অনেকে।
এরপরও কথা থাকে। সময় কারো অঙ্গুলি হেলনে চুপ থাকে না।
ক্রান্তিকালেও নববর্ষের আমেজ সর্বত্র। যে ইলিশ নিয়ে এত কাড়াকাড়ি এবং বর্ষবরণের অনুষঙ্গ, সেই ইলিশ কি সামনে মিলবে? সে জিজ্ঞাসা থেকেই যাচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধ তো রয়েছেই, টিপাইমুখসহ আরো অনেক বাঁধ নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে। দেশের নদীতে কমে যাচ্ছে মিঠা পানির প্রবাহ। ইলিশেরা উঠে আসছে নদী থেকে উপনদী, উপনদী থেকে খালে। তবুও মুক্তি মিলছে না তাদের। অন্য দিকে তিস্তা নদীতে পানি নেই। এক সময়ের খরস্রোতা নদী আজ ধু-ধু বালুচর।
বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল অনেক কিছুই। তার মধ্যে অস্থির রাজনৈতিক অঙ্গন, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদসহ বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গুম, হত্যা, নারায়ণগঞ্জে সাত খুন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু, বছরের শেষে এসে জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর প্রভৃতি বিষয়গুলো ছিল আলোচনার শীর্ষে। ইন্তেকাল করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযম। ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করে মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন লতিফ সিদ্দিকী।
এ ছাড়া বছরের মাঝামাঝি সময়ে দেশব্যাপী ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিপর্যয়, সুন্দরবনে তেলবাহী ট্যাঙ্কার ডুবি ছিল সারা বিশ্বের সচেতন মহলের আলোচনায়। সড়ক দুর্ঘটনা এবং লঞ্চডুবিতে শত শত মানুষের মৃত্যুর মিছিল নাড়া দিয়ে গেছে সবার অন্তরে। দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর সোনার খনি থেকে সোনা পাওয়া ছিল অব্যাহত। ধরা পড়েছে একের পর এক চালান। বছরের শেষে এসেও ছাত্রলীগের কোন্দলে খুন হয়েছে এক নেতা। ক্যাম্পাসগুলো সহাবস্থান ছিল না বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোর।
মিডিয়ার রাজনীতি এবং সরকারের সাথে হাত মিলিয়ে চলার একটি প্রবণতাও ছিল বছরজুড়েই। এ ছাড়া শেষ সময়ে এসে ঢাকা এবং চট্টগ্রামের তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচন ও প্রার্থীদের নিয়ে নানা ধরনের নাটকীয় পরিবর্তন ছিল মিডিয়ার আগ্রহের শীর্ষে।
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ২০ দলীয় জোটের আন্দোলন, এর বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান এবং সব আলোচনা-সমলোচনার মধ্যেও কঠোর হস্তে সব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়েছে সরকার, এটি নিশ্চিতভাবেই বলা চলে। তবে বছরের শেষ দিকে জনগণের জন্য কিছুটা হলেও আনন্দের উপলক্ষ হয়ে আসে ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশের টাইগারদের প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা।
গেল বছর অনেক জ্ঞানী-গুণীজন আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেছে। এর মধ্যে ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের নাম উল্লেখ না করলেই নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজন : নগরীর উৎসব আনন্দে বরাবরই শীর্ষে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। এবারো এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না। বাঙালির প্রাণের উৎসব পয়লা বৈশাখ ১৪২২ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে বর্ণাঢ্য কর্মসূচি নিয়েছে। চারুকলা অনুষদ থেকে চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা শুরু হয়েছে। গতকাল চৈত্রসংক্রান্তি উদযাপনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ অনুষ্ঠানমালার।
আজ সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের নেতৃত্বে বের হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। এ বছর ‘অনেক আলো জ্বালতে হবে মনের অন্ধকারে’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে শোভাযাত্রাটি চারুকলা থেকে বের হয়ে রূপসী বাংলা হোটেল চত্বরে ঘুরে আবার চারুকলার সামনে এসে শেষ হবে। আগামীকাল সন্ধ্যায় মঞ্চস্থ হবে যাত্রাপালা। অনুষ্ঠিত হবে লোকগানের আসর। বাংলা বিভাগের প্রযোজনায় সন্ধ্যা ৬টায় সেলিম আল দীনের ‘কীত্তনখোলা’ কলাভবন প্রাঙ্গণে মঞ্চস্থ হবে।
থিয়েটার অ্যান্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগ বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রথমবারের মতো নাটমণ্ডল প্রাঙ্গণে ও মিলনায়তনে চৈত্রসংক্রান্তি ও বৈশাখ উদযাপন উপলক্ষে চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। সঙ্গীত বিভাগ সকাল ৮টায় কলাভবনের সামনে বটতলায় বাংলা গানের আসরের আয়োজন করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাবও বিকেল ৫টায় কাব চত্বরে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
এ ছাড়া শিল্পকলা একাডেমী, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরসহ বিভিন্ন সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন আয়োজন করবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের। টিভি চ্যানেলগুলো এবং এফএম রেডিওতে প্রচারিত হবে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে বের করা হবে নতুন বছরের ক্যালেন্ডারসহ বিশেষ ক্রোড়পত্র। রাজধানীতে একাধিক কনসার্টের আয়োজন হবে বলেও জানা গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা
বাসস জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে দেশবাসী ও প্রবাসী বাঙালিসহ সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। ১৪২২ সন সব জরা ও গ্লানি মুছে দিয়ে বাঙালির জীবনে সুখ, সমৃদ্ধি ও অনাবিল আনন্দ বয়ে আনবে বলে প্রত্যাশা করেছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল বাংলা নববর্ষ উপলে দেয়া এক বাণীতে এ প্রত্যাশার কথা বলেন।
বাণীতে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি, পয়লা বৈশাখে বাঙালি সংস্কৃতির এ চর্চা আমাদের জাতিসত্তাকে আরো বিকশিত করবে। সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার শক্তি জোগাবে। রাজনীতির নামে আগুনে পুড়িয়ে নিরীহ মানুষ হত্যা ও দেশের সম্পদ ধ্বংসকারী অপশক্তির বিরুদ্ধে আমাদেরকে আরো ঐক্যবদ্ধ করবে।’
প্রধানমন্ত্রী আশা করেন, দেশব্যাপী বৈশাখীমেলা, চৈত্রসংক্রান্তির পালা-পার্বণ, নববর্ষের প্রতিটি মিছিল-শোভাযাত্রা পরিণত হবে মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, অন্যায়-অবিচার, শোষণ-বৈষম্য এবং ক্ষুধা-দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের হাতিয়ারে।
বাংলা নববর্ষ আমাদের জাতীয়তাবোধ ও চেতনাকে শাণিত করে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বর্ষবরণের উৎসবে এ চেতনাকে নস্যাৎ করার জন্য স্বাধীনতার আগে ও পরে বহু ষড়যন্ত্র হয়েছে। আঘাত করা হয়েছে বারবার। বোমা মেরে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। ধর্মান্ধ, সাম্প্রদায়িক শক্তির কোনো অপচেষ্টাই সফল হয়নি। বাঙালি জাতি নববর্ষকে ধারণ করেছে তার জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির অনুষঙ্গ হিসেবে।
রওশন এরশাদ : বাংলা নববর্ষ উপলে দেশে ও দেশের বাইরে থাকা সব বাঙালিকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ।
গতকাল এক শুভেচ্ছা বার্তায় রওশন বলেন, বাঙালির নববর্ষ এক অনন্য বৈশিষ্ট্যময় উৎসব। পয়লা বৈশাখ বাঙালির সার্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসব। তিনি বলেন, নতুন বছর ১৪২২ বঙ্গব্দে দেশের সব মানুষ হিংসা-বিদ্বেষ ও ভেদাভেদ ভুলে কাক্সিত অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জনে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাবে নতুন বছরে এমনই প্রত্যাশা করেন তিনি।
জামায়াতে ইসলামী : বাংলা নববর্ষ উপলে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলের ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদ গতকাল এক শুভেচ্ছা বার্তায় বলেন, ১ বৈশাখ ঐতিহ্যবাহী বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। আবহমানকাল থেকে বাংলাদেশের জনগণ এ দিনটি উৎসবের সাথে পালন করে আসছে। ১ বৈশাখ বাংলাদেশের মানুষের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তিনি আরো বলেন, এমন এক সময় শুভ নববর্ষ আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে, যখন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিদ্যমান। জনগণ আজ উন্মুক্ত পরিবেশে সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় সরকার সামাজিক অনুষ্ঠান থেকেও সাধারণ মানুষকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে। এমনই এক ভীতিকর পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জনগণের প্রাচীনতম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে সম্পৃক্ত বাংলা নববর্ষ শুরু হচ্ছে।
মকবুল আহমদ দেশবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, নতুন বছর আমাদের জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল শান্তি, স্বস্তি ও সমৃদ্ধি। দেশ ও জাতি তাদের ন্যায্য অধিকার ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে পাক এ কামনাই করছি।
বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি : বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবদুল মোবিন ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আবু তাহের চৌধুরী এক যুক্ত বিবৃতিতে শুভ বাংলা নববর্ষ ১৪২২ উপলক্ষে পার্টির সর্বস্তরের নেতাকর্মী তথা দেশবাসীকে আন্তরিক অভিনন্দন ও প্রাণঢালা শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
ইআর





