ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে কেন্দ্র দখল, জাল ভোট আর কারচুপি করে ফলাফল পাল্টানোর ঘটনায় প্রার্থীদের অভিযোগের পাহাড় জমছে নির্বাচন কমিশনে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এমন শতাধিক লিখিত অভিযোগ এসেছে। অভিযোগকারীদের বেশিরভাগই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী।
তাদের কেউ অভিযোগে বলেছেন, পুলিশের সহায়তায় সরকার সমর্থক প্রার্থীর লোকজন কেন্দ্র দখল করেছে। এজেন্টদের মারধরের পর বের করে দিয়েছে। আবার কারো দাবি, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় ভোট পেলেও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশে ফল পাল্টে দেয়া হয়েছে।
এসব অভিযোগের সঙ্গে কেউ কেউ অনিয়মের নানা ছবি, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও ছবির ক্লিপিংও সংযুক্ত করেছেন। অভিযোগে বেশিরভাগ প্রার্থীরা নির্বাচনী গেজেট প্রকাশ না করে পুনঃনির্বাচন দাবি করলেও বৃহস্পতিবার রাতেই তড়িঘড়ি করে গেজেট প্রকাশ করেছে কমিশন।
ঢাকা উত্তরের বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ভোটের দিনই নির্বাচন কমিশনের কাছে ৩৪টি অভিযোগ করেছেন। ভোটের পরের দিনও তিনি লিখিত অভিযোগ করেন।
এদিকে ঢাকা দক্ষিণের বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাসের পক্ষ থেকেও এজেন্ট বের করে দেওয়াসহ নানা অভিযোগ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগের আবেদন গ্রহণ করে তাদের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এমনকি উচ্চ আদালতেও যেতে পারেন প্রার্থীরা। এক্ষেত্রে গেজেট প্রকাশের পর ৩০ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, প্রার্থীদের লিখিত অভিযোগে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রতিপক্ষ প্রার্থীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগের সঙ্গে কেউ কেউ ভোট কারচুপির চিত্র, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও ছবির ক্লিপিংসহ নানান তথ্য-উপাত্ত দিয়েছেন। অভিযোগকারীরা বেশিরভাগই নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ না করা ও পুনঃ ভোটের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে নির্বাচন কমিশন সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, নিয়ম অনুযায়ী প্রার্থীদের অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে জানাতে পারেন। তারা ট্রাইব্যুনালে বিচার পাবেন। ভোটের দিন ইসিতে তাবিথের ৩৪ লিখিত অভিযোগ: ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচন বাতিল করে মেয়র পদে পুনর্র্নিবাচন দাবি করেছেন বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল।
তিনি বলেন, গত মঙ্গলবার রাতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের কাছে পাঠানো এক ফ্যাক্স বার্তায় এ দাবি জানান তিনি। তাবিথ আউয়াল স্বাক্ষরিত ফ্যাক্স বার্তায় উল্লেখ করা হয়- সদ্য সমাপ্ত সিটি নির্বাচন ‘পক্ষপাতদুষ্ট, প্রহসনমূলক ও অগ্রহণযোগ্য উল্লেখ করে তা বাতিলপূর্বক পুনরায় তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন দেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে বুধবারও নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করেছেন ঢাকা উত্তরের বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল। ইসিতে দায়ের করা অভিযোগে নির্বাচনে কারচুপি, কেন্দ্র দখলসহ বিভিন্ন অনিয়ম এনে গেজেট প্রকাশ না করতে ইসির প্রতি অনুরোধ জানান। অভিযোগের সঙ্গে ভোটগ্রহণের অনিয়মের বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও ছবির ক্লিপিং জমা দেন তিনি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ভোটগ্রহণের দিন সকাল ১০টার মধ্যে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সব কেন্দ্র দখলে নেয়। ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ কর্মীরা অবাধে কেন্দ্রে বিচরণ করে এবং প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারদের সহযোগিতায় ব্যালট পেপারে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর পক্ষে সিল মেরে অবাধে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখে।
অভিযোগে তিনটি দাবি তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্বাচনে যেসব অনিয়ম হয়েছে তা সুষ্ঠু তদন্ত করা, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্যালট পেপার সিলগালা করে নিরাপদে সংরক্ষণ করা এবং তদন্ত কমিটির সুপারিশসহ প্রতিবেদন না হওয়া পর্যন্ত মেয়র পদের ভোটের সরকারি ফলাফল সংবলিত গেজেট প্রকাশ বন্ধ রাখা।
এদিকে ভোটের দিন বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র থেকে মির্জা আব্বাস সমর্থিত পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন তার স্ত্রী আফরোজা আব্বাস। শান্তিনগরে একটি ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন শেষে তিনি এমন অভিযোগ করেন এবং লিখিত অভিযোগ দেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ৪২টি কেন্দ্রে আমাদের এজেন্টদের বের করে দিয়েছে।
জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে বাতিল ভোটের রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। এবার তিন সিটিতে ১ লাখ ২১ হাজার ৫টি ভোট বাতিল হয়েছে, যা প্রদত্ত ভোটের শতকরা ৪ দশমিক ৫৬ ভাগ। অতীতে ভোট বাতিলের হার ছিল ১ থেকে ২ শতাংশ। এর মধ্যে ঢাকা উত্তরে ৩৩ হাজার ৫৮১, দক্ষিণে ৪০ হাজার ১৩০ ও চট্টগ্রামে ৪৭ হাজার ২৯২টি বাতিল ভোট রয়েছে।
ইসি কর্মকর্তারা বলেছেন, নির্বাচন নিয়ে প্রতিবারই বিভিন্ন অভিযোগ আসে। এবার নির্বাচনে অভিযোগের সংখ্যা অন্য যেকোনো নির্বাচনের চেয়ে অনেক বেশি। গত দুই দিনে ইসিতেই ৪০ থেকে ৪২টি অভিযোগ জমা পড়েছে। ঢাকা দক্ষিণে প্রায় অর্ধশত অভিযোগ জমা পড়েছে। ঢাকা উত্তরে অভিযোগ জমা নেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। সবমিলিয়ে তিন সিটিতে অভিযোগের সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে।
এআর





