ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দুপল্লীতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার হয়নি।

দীর্ঘ এ সময়ে সরকারি-বেসরকারি নানা সহযোগিতায় ঘুরে দাঁড়িয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। এবারও মহা ধুমধামে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে নাসিরনগরে। হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া আট মামলার মধ্যে সাত মামলার তদন্ত কাজ শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিতে পারেনি পুলিশ। এর ফলে দেশ-বিদেশে আলোচিত এ হামলার ঘটনার বিচার কাজ নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। তাদের দাবি, দ্রুত প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক।

জানা যায়, গত ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর নাসিরনগরের হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের জগন্নাথ দাসের ছেলে রসরাজ দাসের ফেসবুক আইডি থেকে পবিত্র কাবা শরীফকে ব্যঙ্গ করে একটি পোস্ট দেয়া হয়। ওই পোস্টটি বিভিন্নজনের কাছে ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে ২৯ অক্টোবর রসরাজকে আটক করে তার বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনে মামলা করে পুলিশ। রসরাজ তখন পুলিশের কাছে ওই পোস্ট করেননি বলে দাবি করেন। এরপরও রসরাজের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তার ফাঁসির দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে নাসিরনগর।

৩০ অক্টোবর নাসিরনগর উপজেলা, সদরে দুইটি ইসলামী সংগঠনের ডাকা সমাবেশ শেষে হিন্দু অধ্যুষিত কয়েকটি এলাকায় হামলা চালিয়ে অন্তত ১০টি মন্দির ও শতাধিক ঘর-বাড়িতে ভাঙচুর এবং লুটপাট করে দুষ্কৃতিকারীরা। এ ঘটনার পর দুষ্কৃতিকারীরা ফের ৪ নভেম্বর ও ১৩ নভেম্বর হিন্দুদের অন্তত ছয়টি ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। হামলার ঘটনায় পুলিশ ও ক্ষতিগ্রস্তদের দায়ের করা আটটি মামলায় অজ্ঞাত দুই হাজারেরও বেশি মানুষকে আসামি করা হয়। তখন হামলার ভিডিও ফুটেজ ও ছবি দেখে ১২৫ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তবে গ্রেফতার সবাই এখন জামিনে।

ঘটনার ১৩ মাস পর ২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর গৌরমন্দির ভাঙচুর মামলায় পুলিশ নাসিরনগর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল হাশেম ও হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখিসহ ২২৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। তবে ঘটনার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও বাকি সাত মামলার তদন্ত কাজ শেষ করতে পারেনি পুলিশ। মামলাগুলোর তদন্ত কাজের অগ্রগতি সম্পর্কেও জানেন না ক্ষতিগ্রস্তরা।

নাসিরনগর উপজেলা সদরের দত্তবাড়ি মন্দির ভাঙচুর মামলার বাদী কাজল জ্যোতি দত্ত বলেন, হামলার পর পুলিশের কথায় বিচারের আশায় মামলা করেছিলাম। এরপর আর বিচারের কোনো লক্ষণ দেখছি না। শুনেছি, একটি মামলার অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। আমার মামলার অভিযোগপত্র এখনও দেয়া হয়নি। তবে আমরা চাই হিন্দু-মুসলমান সবাই একত্রে বসবাস করতে।

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদ নেতাদের মতে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে একটি চক্র ফেসবুকের অপব্যবহার করে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটাচ্ছে। এসব ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ ব্যাপারে নাসিরনগর উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদের সাধারণ সম্পাদক সুজিত চক্রবর্তী বলেন, যারা নাসিরনগরের হামলার ঘটনার মূল নায়ক তাদের আইনের আওতায় আনা হয়নি। তাদের আইনের আওতায় আনলে ভোলার ঘটনা ঘটত না। আমরা চাই এ হামলার নেপথ্যে যারা ছিল তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক।

সাত মামলার তদন্ত কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিক্তি পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) মুহাম্মদ আলমগীর হোসেন বলেন, আমাদের তদন্ত কাজ শেষ পর্যায়ে। আসামি সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন সেজন্য সাক্ষ্য-প্রমাণগুলো আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করে দেখছি। যাচাই-বাছাই শেষে দ্রুত আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়া হবে।

এমবি