নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান আসামি নূর হোসেনের বিশাল সাম্রাজ্য এখন স্থানীয় সাত নেতার দখলে। নূর হোসেনের বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা বাণিজ্য দখল করে তারা পরিচালনা করছেন।

আলোচিত ওই খুনের ঘটনার পর নূর হোসেন ও তার বাহিনীর সকলেই আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় ওই সকল নেতার নেতৃত্বে দখলে চলে যায় তার অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য। গত এপ্রিলে সাত খুনের মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করার পর ফিরতে শুরু করে নূর হোসেনের সহযোগীরা। ওইসব স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা এক সময় নূর হোসেনের বডি গার্ড, ক্যাশিয়ার ও চাঁদা আদায়ের আটটি গ্রুপ পরিচালনা করতো।

বর্তমানে তাদের মধ্যে কয়েকজন কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। সেটিও নূর হোসেনের বদৌলতে। নূর হোসেনের সহযোগীরাও এখন ওই নেতাদের দলে যোগ দিয়েছে। সাত খুনের মামলার রায়ের পর নেতারা নিশ্চিত হয়ে যান নূর হোসেন আর কোনোদিন এলাকায় ফিরতে পারবেন না। এখন তারা প্রকাশ্যে নূর হোসেনের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসাসহ তার অবৈধ বাণিজ্যগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছেন।

বর্তমানে শিমরাইল মোড়, ট্রাকস্ট্যান্ড, বাসস্ট্যান্ড, ট্যাক্সি ও মাইক্রোস্ট্যান্ড, সিদ্ধিরগঞ্জ হাউজিং, কাঁচপুর সেতুর নিচের বালুমহাল, সিদ্ধিরগঞ্জ পুলসংলগ্ন বিদ্যুত্ কেন্দ্র, আদমজী ইপিজেড, মেঘনা ও পদ্মা ডিপোসহ সকল সেক্টর ওইসব নেতাদের দখলে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা থেকে প্রতিমাসে কোটি কোটি টাকা আদায় করতেন নূর হোসেন। এর ভাগ স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনসহ বিভিন্ন প্রশাসনের এক শ্রেণীর কর্মকর্তারা নিয়মিত পাচ্ছেন। এই কারণে অপরাধীরা নীরবে এ বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনা করে আসছেন বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল মোড় ও বাসস্ট্যান্ডের চাঁদাবাজি বর্তমানে নূর হোসেনের উপদেষ্টাখ্যাত দুই ব্যক্তি ওই নেতাদের আস্থাভাজন হিসেবে নিয়ন্ত্রণ করছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে যাতায়াতকারী সকল যানবাহন থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা আদায় করে তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ৮টি গ্রুপ। গত সেপ্টেম্বর মাসে এদের সঙ্গে যোগ দেয় নূর হোসেনের এক ভাই ও ভাতিজা।

বর্তমানে শিমরাইলের ট্রাক ট্রার্মিনালটিও নূর হোসেনের এক ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণে। এখানে দৈনিক ট্রাক প্রতি ৩শ’ টাকা হারে চাঁদা আদায় করছে জজ বাহিনী। গত সেপ্টেম্বর মাসে এলাকায় এসে ওই নেতাদের সহায়তায় ট্রাক টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ নেয় এই বাহিনী।

শিমরাইল মোড়ের সিংহভাগ আয় আসত মাদক থেকে। বর্তমানে ওই মাদক ব্যবসা জমজমাট। ওই নেতাদের পরিচালিত গ্রুপ এ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। সাত খুনের ঘটনার পর শিমরাইল মোড়ে উচ্ছেদ অভিযানের কারণে ট্যাক্সি ও মাইক্রোস্ট্যান্ড ছিল না। পরবর্তীতে মনির বাহিনী ডিএনডি খাল ভরাট করে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড দখল করলেও বর্তমানে এটি সাত খুন মামলার এজাহার থেকে বাদ পড়া নূর হোসেনের দুই সহযোগীর নিয়ন্ত্রণে। দৈনিক ট্যাক্সি বা মাইক্রো থেকে লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে তারা।

শীতলক্ষ্যা নদীর তীর দখলে রেখে অবৈধ বালু ব্যবসা সরকার বন্ধ করতে পারলেও বর্তমানে নদীর তীরের মাটি কেটে বিক্রি করছে একটি মহল। এখানেও স্থানীয় দুই নেতার হাত রয়েছে। শিমরাইলস্থ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নিয়ন্ত্রণ করত নূর হোসেনের এক ভাই। তার আত্মগোপনের পর নজরুলের এক আত্মীয় এটি নিয়ন্ত্রণ করত।

পরবর্তীতে নূর হোসেনের ওই ভাই এলাকায় ফিরে এলে সড়ক ও জনপথের বিভাগীয় অফিস তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুত্ কেন্দ্র ও আদমজী ইপিজেড এলাকা নূর হোসেন ও স্থানীয় এক নেতার নিয়ন্ত্রণে ছিল। সাত খুনের পর এ এলাকা দখলে নেন যুবলীগের ওই নেতা। তার বাহিনীর দখলে পদ্মা, মেঘনা তেলের ডিপো ও সরকারি জমি।

এদিকে সাত খুন মামলার চার্জশিট থেকে এজাহারভূক্ত ছয় আসামিকে বাদ দেওয়া হয়। এই ছয় নেতাই এখন নূর হোসেনের অপরাধ জগতের বেশিরভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে। নূর হোসেনের এক নিকট আত্মীয় এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। স্থানীয় দুই নেতা বলেন, নূর হোসেনের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল।

এর বাইরে কোনো সম্পর্ক নেই। তারা জনগণের সেবার জন্য রাজনীতি এবং ব্যবসা করেন বলে জানান। তাদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সঠিক নয় বলেও দাবি করেন তারা। গতকাল বুধবার সন্ধ্যার পর নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার মইনুল হক বলেন, নূর হোসেনের সাম্রাজ্যের কোনো অস্তিত্ব নেই বা দখলের কোনো অভিযোগ নেই।সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক

এমএনজে