নিম্নচাপের প্রভাবে টানা বৃষ্টির পর চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও বান্দরবানের বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসে মঙ্গলবার (১৩ জুন) রাত ১২টায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নারী ও শিশুসহ মারা গেছে অন্তত ১৩২ জন। হতভাগ্যদের বেশির ভাগই একই পরিবারের সদস্য।
প্রশাসন, পুলিশ, স্থানীয় লোকজনসহ বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী রাঙামাটিতে ৯৮ জন, চট্টগ্রামে ২৮ জন ও বান্দরবানে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। রাঙামাটিতে নিহতদের মধ্যে মানিকছড়ি আর্মি ক্যাম্পের দুই সেনা কর্মকর্তাসহ
৪ সেনা সদস্যও রয়েছেন। উদ্ধারকাজ চালানোর সময় পাহাড়ধসের কবলে পড়েন তাঁরা। এ ছাড়া পাহাড়ধসে ১০ সেনা সদস্যসহ আহত হয়েছে শতাধিক। আরেক সেনা সদস্যসহ বেশ কয়েকজনের নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
সোমবার রাত ও গতকাল ভোরে পাহাড়ধসের এসব ঘটনা ঘটে। পরে বৃষ্টির মধ্যেই সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় লোকজন উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। তবে বৃষ্টির কারণে দুর্গম এলাকায় তাত্ক্ষণিকভাবে উদ্ধারকাজ শুরু করা যায়নি। ফলে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায়নি। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থানীয়রা জানিয়েছে, অনেক জায়গায় ধসের মাটি সরানো যায়নি।
বৃষ্টি, ঢল ও পাহাড়ধসের কারণে পার্বত্যাঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়ায় চট্টগ্রামের সঙ্গে রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজারের সড়ক যোগাযোগ সোমবার রাতেই বন্ধ হয়ে যায়। অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
পাহাড়ধসে হতাহতের ঘটনায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। খবর পেয়ে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক গতকাল বিকেলেই ঘটনাস্থলে পৌঁছেন। তিনি উদ্ধার কার্যক্রম পরিদর্শন করেন এবং হতাহত সেনা সদস্য ও তাঁদের শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আজ বুধবার রাঙামাটির দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করবেন।
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজুরুল মান্নান জানান, তাত্ক্ষণিকভাবে রাঙামাটি সদরে ২ সেনা কর্মকর্তা ও ২ সেনা সদস্যসহ ২০ জন, কাপ্তাইয়ে ১৩ জন, কাউখালীতে ১২ জন ও বিলাইছড়িতে ২ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহত অবস্থায় ৫৬ জনকে রাঙামাটি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় ১ শিশুসহ নিহত হয়েছে ২৮ জন। শুধু রাঙ্গুনিয়াতেই মারা গেছে ২১ জন। নিখোঁজ রয়েছে সাতজন।
বান্দরবানের কালাঘাটা এলাকায় তিনটি স্থানে পাহাড়ধসে ৩ শিশুসহ ৬ জন নিহত হয়ছে। নিখোঁজ রয়েছে ২ জন। আহত হয়েছে কমপক্ষে ১৫ জন।
চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও বান্দরবানের যেসব এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে সেসব জায়গায় অন্তত ৪ হাজার মানুষকে ১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া গতকাল সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নেওয়া মানুষের জন্য তাত্ক্ষণিকভাবে ৫০০ মেট্রিক টন চাল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে ১২ লাখ টাকাও দেওয়া হয়েছে।
রাঙামাটিতে নিহত ৯৮ : রাঙামাটি সদর এবং কাউখালী ও কাপ্তাই উপজেলাসহ বিভিন্ন স্থানে প্রবল বর্ষণের ফলে পাহাড়ধসে অন্তত ৯৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। গতকাল সকালে সদরের যুব উন্নয়ন, ভেদভেদী, শিমুলতলী, রাঙাপানিসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পাহাড়ধসের খবর আসতে থাকে। সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত রাঙামাটি শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে রাঙামাটি সদর হাসপাতালে ১১ জনের মৃতদেহ এসেছে। নিহতরা হলো- রুমা আক্তার, নুরিয়া আক্তার, হাজেরা বেগম, সোনালি চাকমা, অমিয় চাকমা, আইয়ুশ মল্লিক, লিটন মল্লিক, চুমকি দাশ, আব্বাস আলী, শাহ আলম, শফিকুল ইসলাম, প্রিন্সশো চাকমা, সুস্মিতা চাকমা, কামাল, মিন্টু ত্রিপুরা ও অজ্ঞাতপরিচয় ১- জন।
এ ছাড়া কাপ্তাই উপজেলার রাইখালী ইউনিয়নের কারিগরপাড়া এলাকায় মাটিচাপায় উনু চিং মারমা এবং নিকি মারমা নামের ২জন নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন রাইখালী ইউপি চেয়ারম্যান ছায়ামং মারমা। কাপ্তাই উপজেলার নতুন বাজার এলাকায় গাছচাপা পড়ে আবুল হোসেন (৪৫) নামের এক ব্যক্তি মারা গেছেন। ইকবাল নামের এক ব্যক্তি কর্ণফুলী নদীতে নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর মৃতদেহ পাওয়া যায় বিকেলে। মিতিঙ্গাছড়ি এলাকায় নুর নবি, তাঁর ছেলের স্ত্রী রুবি ও নাতি রোহানের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন ওই এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চৌধুরী বেবি। বিকেলে মুরলিপাড়ায় আরো ছয়জনের মৃত্যুর খবর জানা গেলেও তাত্ক্ষণিক তাদের বিস্তারিত পরিচয় জানা যায়নি।
কাউখালী থানার ওসি আব্দুল করিম জানিয়েছেন, কাশখালী এলাকায় একই পরিবারের তিনজন, ঘিলাছড়িতে স্বামী ও স্ত্রী, বেতবুনিয়ায় চারজন, সুগারমিল আদর্শগ্রাম, ঘাগড়ায় দুজনসহ ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
রাঙামাটির কোতোয়ালি থানার ওসি মুহম্মদ রশীদ জানিয়েছেন, মৃতের সংখ্যা আরো বাড়বে। অনেক স্থানেই এখনো মানুষ মাটিচাপা পড়ে আছে।
কাউখালী উপজেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে নিহতরা হলো ঘাগড়া ইউনিয়নের জুনুমাছড়া এলাকার বাসিন্দা অমর শান্তি চাকমার মেয়ে বৈশাখী চাকমা, ঘাগড়া বাজার এলাকার বাসিন্দা ছৈয়দ আলীর স্ত্রী নাছিমা বেগম, নোয়াপাড়া এলাকার মৃত মঙ্গল চাকমার স্ত্রী শোভা রানী চাকমা, কাশখালী এলাকার আব্দুল রশিদের স্ত্রী ফাতেমা বেগম, তাঁর ছেলে ইসহাক ও মনির (২৫), ঘিলাছড়ি এলাকার মাওলানা ইসহাকের স্ত্রী হাফিজা খাতুন, দুদু মিয়ার ছেলে দবির উদ্দিন, দবির উদ্দিনের স্ত্রী খোদেজা বেগম, বাকছড়ি এলাকার ফুলমোহন চাকমার স্ত্রী মণি মালা চাকমা ও মেয়ে তিশা মণি চাকমা। বেতবুনিয়া ইউনিয়নে নিহতরা হলো অংচাপ্রু মারমার ছেলে অংচিং মারমা, অংখ্যাইচিং মারমার স্ত্রী আশেমা মারমা (৩৪), মেয়ে তেমা মারমা (১২) ও ছেলে ক্যাথোয়াইচিং মারমা (৭), ফটিকছড়ি ইউনিয়নের ধুপছড়ি গ্রামের কুজাইঅং মারমার স্ত্রী লাইপ্রু মারমা ও কলমপতি ইউনিয়নের সুগারমিল এলাকার দুলালের স্ত্রী।
রাঙামাটির পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান বলেন, ‘এটি আকস্মিক ঘটে যাওয়া একটি বড় ধরনের দুর্যোগ। আমরা মানুষের পাশে আছি। চেষ্টা করছি সার্বিক সহযোগিতার। ’
উদ্ধারকাজের সময় দুই কর্মকর্তাসহ নিহত ৪ সেনা সদস্য: রাঙামাটিতে উদ্ধার কার্যক্রম চালানোর সময় গতকাল সকাল ১১টার দিকে দুই সেনা কর্মকর্তাসহ চার সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। তাঁরা সবাই ২০ বীর ইউনিটে কর্মরত ছিলেন। নিখোঁজ রয়েছেন একজন এবং আহত হয়েছেন আরো ১০ সেনা সদস্য। তাঁদের মধ্যে ৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারযোগে ঢাকা সিএমএইচে নিয়ে আসা হয়েছে।
নিহতরা হলেন- সেনাবাহিনীর রাঙামাটি জোনের জোনাল স্টাফ অফিসার মেজর মোহাম্মদ মাহফুজুল হক, কোয়ার্টার মাস্টার ক্যাপ্টেন তানভীর সালাম শান্ত, করপোরাল আজিজুল হক ও সৈনিক শাহীন আলম। সৈনিক মো. আজিজুর রহমান নিখোঁজ রয়েছেন।
সেনাবাহিনী সূত্র জানায়, প্রবল বর্ষণের ফলে সোমবার থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস শুরু হয়। এতে সমগ্র এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যের জন্য বিভিন্ন সেনা ক্যাম্পের সদস্যরা সোমবার থেকেই উদ্ধারকাজে অংশ নেন। গতকাল ভোরে রাঙামাটির মানিকছড়িতে একটি পাহাড় ধসে মাটি ও গাছ পড়ে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি মহাসড়ক বন্ধ হয়ে যায়। তাত্ক্ষণিকভাবে রাঙামাটি জোন সদরের নির্দেশে মানিকছড়ি আর্মি ক্যাম্প থেকে সেনাবাহিনীর একটি দল ওই সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। এ সময় ধসে আটকে পড়া একটি পাহাড়ি পরিবারকে উদ্ধার করে তারা। উদ্ধার কার্যক্রম চলাকালে সকাল ১১টায় ওই স্থানসংলগ্ন পাহাড়ের একটি বড় অংশ উদ্ধারকারী দলের ওপর ধসে পড়ে। এতে তারা মূল সড়ক থেকে ৩০ ফুট নিচে পড়ে যায়। পরে একই ক্যাম্প থেকে আরেকটি উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে গিয়ে দুজন সেনা কর্মকর্তাসহ চারজন সেনা সদস্যকে নিহত অবস্থায় এবং ১০ সেনা সদস্যকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে।
চট্টগ্রামে নিহত ২৮ : প্রবল বর্ষণে পাহাড়ধস ও আকস্মিক টর্নেডোর থাবায় চট্টগ্রামে অন্তত ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রাঙ্গুনিয়ায় ২১ জন, চন্দনাইশে ৪- জন, বাঁশখালীতে ১ জন ও চট্টগ্রাম মহানগরে ২ জন রয়েছে। রাঙ্গুনিয়ায় ৬ জন ও রাউজানে ১ জন নিখোঁজ রয়েছে। এ ছাড়া বাঁশখালীর ২ জন, চন্দনাইশের ২ জন ও মহানগরে ৪ জন আহত হয়েছে।
সোমবার রাতে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ইসলামপুর ও রাজানগর ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে অন্তত ৬ জন। তবে চট্টগ্রাম জেলার ভারপ্রাপ্ত এসপি মো. রেজাউল মাসুদ ১৭ জনের মৃত্যুর বিষয়টি কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এখনো অনুসন্ধান চলছে। মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে। নিহতদের মধ্যে অনেকেই একই পরিবারের সদস্য। তবে তাত্ক্ষণিকভাবে কে কোন পরিবারের সদস্য, তা নিশ্চিত করা যায়নি। ’
রাঙ্গুনিয়ার ইউএনও মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ‘পাহাড়ধসের খবর পাওয়ার পরপরই উদ্ধার অভিযানের তৎপরতা শুরু করে প্রশাসন। কিন্তু দুর্গম এলাকা হওয়ায় সেখানে পৌঁছাতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ’
রাঙ্গুনিয়া থেকে স্থানীয়রা জানায়, পাহাড়ধসের খবর পাওয়ার পর উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও থানার ওসির নেতৃত্বে পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সড়কে গাছ ভেঙে পড়ায় ও সড়ক ভেঙে যাওয়ায় সারা দিন চেষ্টা করেও প্রশাসনের লোকজন ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারেননি। এই কারণে হতাহতের সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায়নি।
বিভিন্ন সূত্রে প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ইসলামপুর ইউনিয়নে নিহতরা হলো শেফালী বেগম, হানিফ, মোহাম্মদ হোসেন, মোহাম্মদ পারভেজ, রিজিয়া বেগম, মুনমুন আক্তার, হিরু মিয়া, মোহাম্মদ সুজন, মুন্নি আক্তার, ফালুমা আক্তার, জ্যোত্স্না আক্তার ও মীম আক্তার। রাজানগর ইউনিয়নে নিহতরা হলো মোহাম্মদ হোসেনের ছেলে নজরুল ইসলাম কালু, তাঁর স্ত্রী আছমা আক্তার বাচু, তাঁদের ছেলে মঞ্জুরুল ইসলাম, মেয়ে সাথী আক্তার, মো. ইসমাঈল, তাঁর স্ত্রী মনিরা খাতুন, তাঁদের সন্তান ইশা মণি ও ইভা মণি।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলার হোছনাবাদ ইউনিয়নের খুলমাই খালে পড়ে একই পরিবারের ৪ জন নিখোঁজ হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সিকান্দর হোসেন জানিয়েছেন, আশীষ চৌধুরী নামের এক ব্যক্তির শিশুসন্তান খালের পানিতে পড়ে গেলে ওই শিশুকে উদ্ধার করতে গিয়ে আশীষ চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রীসহ ওই পরিবারের ৪ জন নিখোঁজ হয়েছে। এ ছাড়া রাউজানের সর্তাখালের পানির তোড়ে হলদিয়া ইউনিয়নে ৩ জন ভেসে যায়। তাদের মধ্যে ২ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও নয়ন নামের এক কিশোর নিখোঁজ রয়েছে।
সাতকানিয়া প্রতিনিধি জানান, চন্দনাইশের ধোপাছড়ি ইউনিয়নে সোমবার রাতে পাহাড়ধসে মাহিয়া আক্তার, ম্রোউ খেয়াং, মং কাউ খেয়াং ও ক্যসা খেয়াং নিহত হয়েছে।
চন্দনাইশের ইউএনও লুত্ফর রহমান জানান, ধোপাছড়ি ইউনিয়নের ছনবনিয়া এলাকার খেয়াংপাড়ার লোকজন রাতে ঘুমিয়ে ছিল। গভীর রাতে তাদের ঘরের ওপর পাহাড় ধসে পড়ে। এতে খেয়াংপাড়ার চাইহ্লাউ খেয়াংয়ের মেয়ে ক্যসা খেয়াং, খাইহ্লাউ খেয়াংয়ের মেয়ে ম্রোউ খেয়াং ও চিচাউ খেয়াংয়ের স্ত্রী মং কাউ খেয়াং ঘটনাস্থলে মারা যায়। গতকাল সকালে স্থানীয়রা তাদের লাশ উদ্ধার করে। আহত দুজনকে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এ ছাড়া একই ইউনিয়নে ভোরে শামুকছড়ি এলাকার আজগর আলীর বসতঘরে পাহাড় ধসে পড়ে তাঁর মেয়ে মাহিয়া আক্তারের মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে উদ্ধার অভিযান চালাতে ফায়ার সার্ভিস ও থানা পুলিশের টিম উদ্ধার অভিযান শুরু করে। কিন্তু দুই ঘণ্টা চেষ্টা করেও ঘটনাস্থলে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত উদ্ধারকারী টিমকে ধোপাছড়ি বাজার থেকে ফিরে আসতে হয়েছে।
ধোপাছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোরশেদুল আলম জানান, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় গতকাল অনেক চেষ্টা করেও সেখানে পৌঁছানো যায়নি। এসব ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে লোকজনকে সরে যেতে এলাকায় মাইকিং করা হয়েছিল।
চট্টগ্রাম মহানগরের কোতোয়ালি থানার আছদগঞ্জের ওসমানিয়া গলি এলাকায় গতকাল ভোরে বজ্রপাতে মোহাম্মদ দেলোয়ার (১৯) মারা যান। তিনি ওসমান অ্যান্ড ব্রাদার্স নামের একটি দোকানের কর্মী। তাঁর বাড়ি সাতকানিয়ার উত্তর রামপুর গ্রামে। এ ছাড়া গতকাল ভোরে হালিশহরে ফইল্লাতলী এলাকায় দেয়ালধসে মোহাম্মদ হানিফ নামের একজনের মৃত্যু হয়েছে। ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ঘরের দেয়াল ধসে এনায়েত উল্লাহ (৭) নামের একটি শিশুর মৃত্যু হয়।
বান্দরবানে নিহত ৬ : প্রবল বৃষ্টিপাতে পাহাড়ধসে বান্দরবান জেলা সদরে ৬ জন মারা গেছে। টানা বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে জেলা সদর, লামা ও আলীকদম উপজেলার নিম্নাঞ্চল বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে।
নিহতদের মধ্যে লেমুঝিরি আগাপাড়ার একই পরিবারের ৩ শিশু এবং গর্জন্যাপাড়ায় কামরুন নেছা ও তাঁর শিশুকন্যা সুফিয়া বেগম মারা গেছে। এ ছাড়া কালাঘাটা কবরস্থান এলাকায় নিহত হয়েছে কলেজ ছাত্র রেমা ত্রিপুরা।
বানের পানি সড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বান্দরবান-চট্টগ্রাম ও বান্দরবান কক্সবাজার রুট বন্ধ হয়ে যায়। বান্দরবান-কেরানিরহাট সড়কের বাজালিয়া ও দস্তিদার হাট এলাকায় রাস্তা ৪ থেকে ৫ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়। টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ে ধস সৃষ্টি হয়ে বান্দরবান-রুমা এবং বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়কেও যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
সোমবার সকাল ৯টা থেকে গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত বান্দরবান জেলায় ৩০৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মৃত্তিকা সংরক্ষণ কেন্দ্রের ইনচার্জ মাহাবুবুল ইসলাম জানান, তীব্র বৃষ্টিধারায় পাহাড়ের মাটির বাঁধনগুলো আলগা হয়ে যাওয়ায় আরো পাহাড়ধসের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বান্দরবান জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্র জানায়, বন্যাকবলিত হয়ে জেলা সদরের ৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে আড়াই হাজার এবং লামা উপজেলার ৫ টি কেন্দ্রে আরও ১ হাজার পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।
খাগড়াছড়িতে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করা লোকজনকে সরিয়ে নিতে গতকাল প্রশাসনের উদ্যোগে মাইকিং করা হয়।
এমবি





