‘হিংসে করিস না, দশটা টাকা দিয়ে যা’-হঠাৎ পথ আগলে এ ধরনের আবদার হর-হামেসাই চোখে পড়ে ব্যস্ত শহর ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে।

কাঠের তৈরি ছোট্ট বাক্স অথবা অ্যালুমিনিয়ামের গোল কৌটা এগিয়ে দিয়ে এই আবদার জানানো মানুষগুলো ভিক্ষুক নন। এরা নিজেদের ঐতিহ্যগত পেশা ছেড়ে নতুন করে ভিক্ষাবৃত্তিতে আসা বেদে নারী।

জীবন ও জীবিকার তাগিদে শত বছরের পুরনো পেশা ছেড়ে এসব বেদে নারী কেন ভিক্ষাবৃত্তিতে নেমেছেন তা জানতে সম্প্রতি টঙ্গীর তুরাগ নদীর ভাসমান বেদেপল্লী ও সাভারের বেদেপাড়া ছোট অমরপুর, বড় অমরপুর, পোড়াবাড়ি, বখতারপুর ও কৃষ্ণপুর গ্রামে টানা ক’দিন চলে অনুসন্ধান।  

অনুসন্ধানে জানা যায়, আদিকাল থেকে বেদে নারীরা চুড়ি-ফিতা-খেলনা বিক্রি, শিঙা লাগানো, দাঁতের পোকা তোলা, তাবিজ-কবজ বিক্রি, সাপেকাটা রোগীর চিকিৎসা, সাপের খেলা দেখানো, সাপের ব্যবসা করা, আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্যসেবাদান, ভেষজ ওষুধ বিক্রি, মৃত পশুর শরীরের অংশ এবং গাছগাছড়ার ওষুধ তৈরি করে বিক্রি, বানরখেলা ও জাদু দেখানো, মাছ ধরা, পাখি শিকার ইত্যাদি হরেক উপায়ে জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করতেন।

কিন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রভুত উন্নতি, আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে বেদে নারীদের এসব সেবা গ্রহণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে সাধারণ মানুষ। 

তাই জীবনের তাগিদে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পেশা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছেন বেদে সম্প্রদায়ের নারীরা। বিকল্প পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন স্থানীয় বাজারে দোকান করা, হাঁস-মুরগী বা কবুতর পালন, মাছ চাষ ও কাঁথা-কাপড় সেলাইয়ের মতো গেরস্থঘরের কাজ। কেউ কেউ চলচিত্রের শুটিংয়ের জন্য সাপ ভাড়া এবং ক্ষেত্র বিশেষ শরীরী সৌন্দর্য কাজে লাগিয়ে চলচ্চিত্র শিল্পে পার্শ¦ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগও পাচ্ছেন।

সাভারের পোড়াবাড়ি রাস্তার পাশে চায়ের দোকান দিয়ে বসা বেদেকন্যা শেফালি বলেন, আমার মা-খালারা গ্রামে গ্রামে ‘গাওয়াল’ করে সিঙ্গা লাগিয়ে, দাঁতের পোকা তুলে, তাবিজ-কবজ বিক্রি করে সংসারের খরচ জোগাতো। আমিও এক সময় ওই কাম করছি। এখন চা বিক্রি করি। আগের চেয়ে ভালোই আছি।

মা-খালার পেশা ছাড়লেন কেন?-এমন প্রশ্নের জবাবে শেফালি বলেন, এহন আর মানুষ তাবিজ-কবজ কিনতে চায় না। এ ছাড়া অন্য সমস্যাও আছে!

কিন্তু শেফালির মতো দোকান করার জায়গা বা পুঁজি কোনোটিই যাদের নেই। নেই নিজস্ব ঘর-দুয়ার-মাথা গোজার ঠাঁই অথবা নৌকা-বৈঠা, সেসব বেদে নারী ঢাকা শহরের পার্ক-উদ্যান, বাস স্টপেজ, বিনোদন কেন্দ্র বা ব্যস্ততম এলাকায় ভিক্ষাবৃত্তি চর্চা করছেন। কেউ কেউ পা বাড়াচ্ছেন পঙ্কিল পথে।

তাছাড়া বিনোদনের নতুন নতুন ব্যবস্থার প্রচলন হওয়ায় সাপ খেলা দেখে আগের মতো এখন আর আনন্দ পায় না মানুষ। বন-জঙ্গল উজাড় হয়ে যাওয়ায় সাপও পাওয়া যায় না। তাই বেদেদের ঐতিহ্যগত পেশায় ধস নেমেছে। এতোদিনকার সংস্কার-বিশ্বাসে আঘাত এসেছে। আর এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বেদে নারীরা।

টঙ্গীর তুরাগ নদীর ভাসমান বেদেপল্লীর সরদার মো. ফরিদ বলেন, শহরে যে মেয়েরা মানুষের কাছ থেকে টাকা ওঠায় তারা বেদে সম্প্রদায়েরই লোক। তবে ওরা ভাসমান বেদে পল্লীর কেউ না। ওদের অবস্থা আমাদের চেয়েও খারাপ। ওরা থাকে বস্তি অথবা ডেরায়। আমাদের মেয়েরা শহরে ঢুকে তাবিজ-কবজ-ওষুধপত্তর বিক্রি করে। সিঙ্গা লাগায়, দাঁতের পোকা খসায়।

সাভারের পোড়াবাড়ির বেদে যুবক মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, আমাদের মধ্যে যারা খুবই গরীব, যাদের কোনো ঘর-বাড়ি নেই, নৌকা ও পুঁজি-পাট্টা কিছুই নেই, ঝুপড়িতে থাকে, সেসব ঘরের মেয়েরা সকালে উঠে ঢাকা যায়। মানুষের কাছে হাত পেতে অথবা সাপ দিয়ে ভয় দেখিয়ে টাকা-পয়সা উঠায়। তবে যাদের জায়গা-জমি বা দোকান পাঠ আছে তারা কখনো যায় না।

ঢাকা, ২৮ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম,এসএইচ