সম্প্রতি চীনের সাংহাইতে বৃদ্ধ বাবা-মায়ে’র প্রতি সন্তানকে যত্নশীল হতে বাধ্য করার জন্য আইন তৈরি হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে অনুরূপ আইন কয়েক বছর পূর্ব থেকেই রয়েছে । প্রশ্ন হচ্ছে, বাবা-মাকেদেখাশুনার জন্য, তাদের প্রতি দায়িত্বশীল হতে আইন লাগবে কেন ? এখানে আইনের চেয়ে আমাদেরবিবেকের ভূমিকা অবশ্যই বেশি ।
কোন সন্তানের চিন্তাশক্তি যদি স্থূল না হয়, বিবেক যদি ভোঁতা না হয় তবে বাবা-মায়ে’র প্রতি যত্নশীলহতে সন্তানকে আইনের দ্বারা বাধ্য করা কিংবা বাধ্য হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না । প্রতিটি সন্তান যদি শুধুতার মা তাকে গর্ভে নিয়ে যে কষ্ট করেছে সেই কথা ভাবে তবে তার জন্য মা’য়ের চেয়ে পরম পূজনীয় এইধরায় আর কেউ থাকতে পারে বলে বিশ্বাস জন্মানোর কথা নয় ।
গর্ভকালীন সময়ের দশ মাসের কথাক্ষণিকের জন্য ভুলে গিয়ে শুধু ডেলিভারির সময়ের কথা ভাবুন । পৃথিবীর আলো দেখাতে সন্তানকেজন্মদানের সময় মা যে কষ্ট স্বীকার করেছেন, সে কষ্টের ঋণ আপনি কি দিয়ে শোধ করবেন ? ভেবেবলুন, এর বিনিময় কি দেয়ার শক্তি আপনার রয়েছে ?
সিজারিয়ান ডেলিভারি আমাদের দেশে চালু হয়েছেমাত্র কয়েক বছর । এর পূর্বে যে নরমাল ডেলিভারি হত সেখানে একজন মায়ের যে কষ্ট তা সম্পূর্ণরূপেকিংবা শতভাগের আশিংক অনুভব করার ক্ষমতাও কি কোন মানুষের রয়েছে ?
পৃথিবীতে মা ব্যতীত মাত্রএকটি মানুষ দেখান যে আপনার জন্য তার শরীরের দীর্ঘ ৯’ইঞ্চি চামড়া কাঁটতে রাজি হবে । এটা সেই মা,যে আপনার অসহায় দিনগুলোতে ভরসা হয়েছে, আপনার সূখের জন্য জীবনের সকল স্বাদ-আহ্লাদ ত্যাগকরেছে । এরপরেও এই মা’য়ের প্রতি তার অসহায় অবস্থায় যদি কোন সন্তান অবহেলা দেখায়, অনাদরেরাখে, কষ্ট দেয় তবে সে সন্তানের অকাল মৃত্যুই বোধহয় শ্রেয় ।
আমার এ চাওয়া শুনলে সন্তানের দ্বারাচরম অবহেলিত বৃদ্ধ বাবা-মা তাদের সন্তানের পক্ষ নিয়ে আমাকে ভৎসণা করবে । কেন জানেন ? এরাআপনাকে/আমাকে সারাজীবন স্বার্থ ছাড়াই ভালোবেসেছে । আইন দিয়ে সব কিছুর সমাধান হয় না কিংবা হবেও না । মনুষ্যত্ত্ব, নৈতিকতা ও বিবেকবোধ জাগ্রত হওয়াটাই বেশি জরুরী।
আমাদের বাবা’রা তাদের জীবনের সকল ভোগকে ত্যাগ করে তাদের সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছে শুধুআমাদের প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা এবং সেপরিকল্পনা বাস্তবায়ন কর্মে । আমাদের আগামী গড়তে তারা নিজেদেরজন্য সামান্য বিশ্রামকেও নিষিদ্ধ করে নিয়েছিল । না শীতের সকাল, না গ্রীষ্মের কড়া রোদ, না বর্ষারঅবিশ্রাম বর্ষণ-কোনটাই তাদেরকে দমাতে পারেনি ।
আমাদের মুখে হাসি ফোঁটাবে বলে কাকডাকা ভোরথেকে শুরু করে নিঃস্তব্ধ রাতের তিমির পর্যন্ত যারা কাজ করেছেন, সেই মানুষগুলো যখন বয়সের কাছে হারমেনে অসহায় হয়ে গেল, তখন তাদের পরিচর্যার জন্য সন্তানকে বাধ্য করতে যদি রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ণকরতে হয় তবে আমাদের মত কু-সন্তানের দলে দলে অপমৃত্যু হওয়াই উত্তম । এতে অন্তত ইতিহাসআমাদেরকে ঘৃণার কালো অক্ষরে চিহ্নিত করার সুযোগ পাবে না । প্রজন্মের পর প্রজন্ম আমাদের দিকে ফিরেস ঘৃণায় থুঁ থুঁ নিক্ষেপ করবে না ।
বাবা-মায়ে’র দেখাশুনার ব্যাপারে আপোস করার প্রশ্ন সন্তানদের মনে জাগ্রত হওয়া উচিত নয় । সন্তানপিতামাতার সেবা করতে অনাগ্রহী-এমন প্রশ্ন উঁকি দেয়ার সুযোগ পায় কোন বিবেকে ? যে বাবা-মাআমাদের সুখের জন্য তার পৃথীবিটাকে সংকুচিত করেছিল সেই বাবা-মায়ের আশ্রয়-আবাস আপনার বিশালপৃথিবীর শুধু এককোনে নয় বরং অনেকটা জুড়ে থাকা উচিত, যদি আপনি সত্যিকারের মানুষ দাবীদার হন। আইন নয় বরং আমাদের বিবেকে জাগ্রতকরণের মাধ্যমে যেন আমরা বাবা-মায়ের প্রতি আরও বেশিযত্নশীল হই ।
পৃথীবির সব বস্তু হারিয়ে গেলেও তার পরিবর্তে আরেকটি অর্জন করা সম্ভব কিন্তু একমাত্রবাবা-মা হারিয়ে গেলে তার আর কোন পরিবর্তন হয়না । আমরা প্রত্যেকেই যেন প্রতিযোগিতা করেআমাদের বাবা-মায়ের কাছে, বাবা-মায়ের জন্য সু-সন্তান হওয়ার চেষ্টা করি । যারা আমাদের জন্যসারাজীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের জন্য মাত্র যুগ পরিমান সময়, শ্রম উৎসর্গ করা কি আমাদের নৈতিকদায়িত্ব নয় ?
মনে রাখুন, আমরাও বাবা-মা হবো । আজ যদি বাবা-মাকে দেখাশুনার জন্য আইনেরবাধ্যবাধকতা জারি করতে হয় তবে আমাদের অসহায়ত্বের সময় কোন আইন আমাদের প্রতি সন্তানকে যত্নশীল হতে বাধ্য করতে পারবে না। কেননা সময়টা শুধু ভাঙ্গনের দিকেই গড়াচ্ছে । যারা গড়ে দিলো আমাদেরপৃথীবি, তারা তাদের গড়া পৃথীবিতে ঠাঁই পাবে না কেন ?
রাজু আহমেদ / এমই





