প্রায় ৪০ বছর ধরে বঙ্গপোসাগরে রায়মঙ্গল ও হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মোহনা এলাকায় বিশাল চর জেগে উঠেছিল। এ চরেরই নাম ছিল দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ। এটা শ্যামনগর উপজেলার সর্বদক্ষিণ বঙ্গপোসাগরের মধ্যে হাড়িয়াভাঙ্গা ও রায়মঙ্গল নদীর মোহনায় বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।

গত ৩ যুগেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের জেলেরা এই দ্বীপে অবস্থান করে মাছ ধরতেন। ১৯৮৬ সালের শেষদিকে এই দ্বীপে মাছ ধরারত জেলেদের ওপর ভারতীয় বিএসএফ গুলি চালিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে ২৫ জন বাংলাদেশী জেলেকে।

তখন এ সংবাদ দেশি-বিদেশি পত্রিকায় গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ পায় এবং দক্ষিণ তালপট্টি যে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ তাও প্রমাণিত হয়। তারপর থেকে বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) যথারীতি তালপট্টি দ্বীপ এলাকায় টহল দিত। ফলে ঐ এলাকায় বিএসএফ আর তেমন কোনো উৎপাত করার সুযোগ পায়নি।

ঐ সময়ের পর থেকে বাংলাদেশী জেলেরা প্রতি বছর যথারীতি দ্বীপে টোং বেঁধে মাছ ধরত বলে শ্যামনগর মুন্সিগঞ্জ এলাকার জনগণ জানায়। তবে মাঝে-মধ্যে ভারতীয় গানবোট তালপট্টি দ্বীপের কাছাকাছি এসে নোঙ্গর করত। বাংলাদেশ রাইফেলসের জওয়ানরাও ঐ এলাকায় নিয়মিত টহল দিত। তখন সকল মহলই জানতো তালপট্টি দ্বীপ বাংলাদেশেরই অংশ।

রায়মঙ্গল ও হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মোহনায় জেগে ওঠা এই বিশাল চরটিকে বলা হত দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ। এই দ্বীপের দখল নিয়ে তখন থেকেই ভারত তাদের অংশ বলে দাবি করলেও কখনই তাদের সে দাবি তারা প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। কারণ দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ ছিল বাংলাদেশের। আর বাংলাদেশী জেলেরা সারাবছর সেখানে অবস্থান করে মৎস্য আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন।

যতদূর জানা যায়, ১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর শ্যামনগর উপজেলার ও ২৪ পরগোনা জেলার হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মোহনায় একটি নতুন দ্বীপের উৎপত্তি হয় ভারত তার নাম দেয় পূর্বাশা বা নিউমুর। এবং নিজেদের মানচিত্রে নিজেদের দাবি করে। বাংলাদেশের দিক থেকে দ্বীপটির অবস্থান সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলার সীমানা বরাবর রায়মঙ্গল ও হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মোহনায় অবস্থিত। বাংলাদেশ এ দ্বীপের দাবি করে এর নাম দেয় দক্ষিণ তালপট্টি। যুক্তরাষ্ট্রের ল্যান্ড রিসোর্স স্যাটেলাইটের ১৯৭৪ সালের তথ্য অনুযায়ী এই দ্বীপের আয়তন প্রায় ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার। যা ভাটার সময় আরো ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার বেড়ে যায়।

১৯৮৫ সালে উরিরচরে যে ঝড় হয় তারপর থেকে দ্বীপটি আস্তে আস্তে পানিতে তলিয়ে যেতে থাকে। ১৯৮৯ সালে স্যাটেলাইটের ধারণ করা ছবিতে এই দ্বীপটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে বলা হয়েছে। ফলে বঙ্গোপসাগরের রায়মঙ্গল ও হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মহোনায় যে জায়গায় দ্বীপটি ছিল সেই অংশটি আদালতের রায়ে ভারতের অংশে পড়েছে।

তবে, দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সাড়ে তিন কোটি মানুষ এবং সমুদ্র আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকার সঠিকভাবে সফলতার সাথে আন্তর্জাতিক সমুদ্র সীমানা নির্ধারণে হেগের আদালতে বিষয়টি বাংলাদেশের মানচিত্রসহ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ হারাতে হয়েছে বাংলাদেশকে। এটা কোনোভাবেই এ অঞ্চলের জনগণ মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারছে না।

এ অঞ্চলের মানুষের অভিমত হচ্ছে, দক্ষিণ তালপট্টি বাংলাদেশের অবিচেছদ্য অংশ। কিন্তু কূটনৈতিক তৎপরতার সঠিক প্রয়োগের অভাব ও আইনী লড়াইয়ে অপরিপক্কতার কারণেই এমনটি ঘটেছে। সরকার যদি সঠিকভাবে আন্তর্জাতিক আদালতের কাছে দক্ষিণ তালপট্টির বিষয়টি উপস্থাপন করতে পারত, তাহলে রায় বাংলাদেশের পক্ষেই আসত বলেই এ অঞ্চলের সুশীল সমাজ মনে করছেন। (সূত্র: ইনকিলাব)

ঢাকা, ১০ জুলাই(টাইমনিউজবিডি.কম)//এনএস //কেবি