দুই ধাপে আট প্যাকেজে নির্মাণ করা হবে মেট্রোরেল। প্রথম ধাপে উত্তরা থেকে ফার্মগেট এবং দ্বিতীয় ধাপে ফার্মগেট থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলের মূল পথ নির্মাণ করা হবে। এভাবে পর্যায়ক্রমিক নির্মাণ শেষে ২০১৯ সালে আংশিক এবং ২০২০ সালে লাইনটি পূর্ণচালু করার আশা করছে সরকার। পুরো লাইনটির দৈর্ঘ্য হবে বিশ কিলোমিটার। প্রকল্প পরিচালক বলেছেন, সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চললে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই মেট্রোরেল চালু করতে পারবেন। প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থ দিচ্ছে জাপানের সাহায্য সংস্থা জাইকা।

২০ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিবহণ পরিকল্পনায় (এসটিপি) ঢাকা মহানগরীতে তিনটি রেলভিত্তিক ও তিনটি বাসভিত্তিক গণপরিবহণ রুটের সুপারিশ করা হয়েছে। এই সুপারিশের আলোকে ম্যাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) বা মেট্রো লাইন-৬ অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় সরকার। উত্তরা-মিরপুর-ফার্মগেট-মতিঝিল রুটটি মেট্রোরেলের লাইন-৬ হিসেবে চিহ্নিত।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী জুলাই মাসে মেট্রোরেল লাইন-৬-এর ডিটেইল্ড ডিজাইন প্রণয়নের কাজ শেষ হবে। বাস্তবায়নের সুবিধার্থে পুরো মেট্রোরেল প্রকল্পকে আটটি কন্ট্রাক্ট প্যাকেজে (সিপি) ভাগ করা হয়েছে। সিপি-১ এ রয়েছে মেট্রোরেলের ডিপোর জমি উন্নয়ন। আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের পর এর কাজ শুরু হয়ে শেষ হবে ২০১৭ সালের মে মাসে।

সিপি-২-এর অধীনে ডিপোতে ভবন নির্মাণ ও পূর্ত কাজ করা হবে। এ কাজ শুরু হবে আগামী বছরের শেষ দিকে এবং শেষ হবে ২০১৯ সালের মার্চে।

সিপি-৩, ৪ ও ৫ এর অধীনে উত্তরা উত্তর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত মেট্রোরেলের ভায়াডাক্ট (ব্রিজের মত-যেখান দিয়ে রেল চলবে) ও স্টেশন নির্মাণ করা হবে। কাজটি করতে এ বছর সেপ্টেম্বর-নভেম্বরে টেন্ডার ডাকা হবে। নির্বাচিত ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি হবে আগামী বছর অক্টোবরের মধ্যে। এরপরই মূল কাজ শুরু হয়ে যাবে। এ কাজ শেষ হবে ২০১৯ সালের মার্চে।

সিপি-৬ অনুযায়ী ফার্মগেট থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ভায়াডাক্ট ও স্টেশন নির্মাণ করা হবে। আগামী সেপ্টেম্বর-নভেম্বরে এ কাজের টেন্ডার আহ্বান ও আগামী বছর অক্টোবরে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন হবে। সিপি-৬-এর কাজ শেষ হবে ২০২০ সালের জুনে।

সিপি-৭ ও ৮ এর অধীনে পরিচালনা সিস্টেম ও ডিপোয় যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে। এ দুটি প্যাকেজের কাজ শেষ হবে ২০১৯ সালের মার্চে।

নির্বাচিত ঠিকাদারদের সঙ্গে সবগুলো কাজের চুক্তি স্বাক্ষর হবে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি, জুন ও অক্টোবরে। এরপর থেকে প্রতিটি প্যাকেজের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে।

মেট্রোরেল প্রকল্পের পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. মোফাজ্জল হোসেন বৃহস্পতিবার বলেন, সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চললে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আমাদের প্রতিটি প্যাকেজের কাজ শেষ হবে। সে অনুযায়ী ২০১৯ সালে উত্তরা থেকে আগারগাঁও স্টেশন পর্যন্ত মেট্রোরেল আংশিক চালু করা হবে। পরের বছর ২০২০ সালে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত পুরো লাইনটি চালু করা হবে।

জানা গেছে, মেট্রোরেল প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন, নির্মাণ তদারকি ও ক্রয় কাজে সহায়তা প্রদানের জন্য এনকেডিএম অ্যাসোসিয়েশন নামের একটি জয়েন্টভেঞ্চার প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে রয়েছে একটি জাপানি কোম্পানি। যাদের দিল্লি মেট্রোরেল নির্মাণ কাজে তদারকির অভিজ্ঞতা রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি গত বছর ২৫ ফেব্রুয়ারি কাজ শুরু করেছে। এর অধীনে টপোগ্রাফিক ও ট্রাফিক সার্ভে শেষ হয়েছে। জিওটেকনিক্যাল সার্ভে, ইউটিলিটি সার্ভে, ঐতিহাসিক গুরুত্ব, প্রত্নতাত্ত্বিক সার্ভে ও পরিবেশগত সার্ভে কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক জানান, মেট্রোরেল প্রকল্পের জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) উত্তরা তৃতীয় পর্ব থেকে ৫৪ একর জমি নেওয়া হয়েছে। এ জমিতে ডিপো নির্মাণ করা হবে। ডিপোতে থাকবে বিরতিকালে ট্রেন রাখার স্থান, মেট্রোরেল প্ল্যান্ট, ওয়ার্কশপ, অপারেশন কন্ট্রোল সেন্টার, জেনারেটর ও ইলেকট্রিক্যাল ভবন, ট্রেনিং সেন্টার ইত্যাদি। তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি জমি অধিগ্রহণ না করেই কিভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা যায়। এরপরও যদি কিছু জমি অধিগ্রহণ করতে হয় তাহলে জাইকার গাইডলাইন অনুসরণ করে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানা গেছে, রাজউকের উত্তরা মডেল টাউনের তৃতীয় পর্ব থেকে মতিঝিল শাপলা চত্বর পর্যন্ত ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি ৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৫৯৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা দেবে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। জমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজে ৫ হাজার ৩৯০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা দেবে বাংলাদেশ সরকার। মেট্রোরেলের পুরোটাই হবে এলিভেটেড তথা ব্রিজের ওপর দিয়ে।

মেট্রোরেলের স্টেশন থাকবে ১৬টি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার, উত্তরা দক্ষিণ, পল্লবী, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, বিজয় সরণী, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, টিএসসি, জাতীয় প্রেসক্লাব এবং মতিঝিল। মেট্রোরেল পরিচালনার জন্য প্রতি ঘণ্টায় ১৩ দশমিক ৪৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হবে।

মেট্রোরেলে প্রতি ঘণ্টায় উভয় দিক থেকে ৬০ হাজার যাত্রী বহন করা যাবে। প্রতি সাড়ে তিন মিনিট পর ট্রেন চলাচল করবে। সর্বোচ্চ গতি হবে ঘণ্টায় প্রায় একশ কিলোমিটার। তবে স্টেশনগুলো কাছাকাছি হওয়ায় এ গতিতে মেট্রোরেল চলতে পারবে না। এ জন্য গতি অনেক কমিয়ে দিতে হবে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত পথে যাতায়াতে সময় লাগবে ৩৭ মিনিট। চলাচলকারী মোট ২৪টি ট্রেনের প্রতিটিতে ছয়টি বগি থাকবে। প্রতি ট্রেনে ৯৪২ জন বসে এবং ৭৫৪ জন দাঁড়িয়ে যাতায়াত করতে পারবে।

মেট্রোরেল প্রকল্পটি ২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন হয়। সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট-ডিএমআরটিডিপি নামের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড-ডিএমটিসিএল। ঢাকা পরিবহণ সমন্বয় কর্তৃপক্ষ-ডিটিসিএ প্রকল্পটির নির্বাহী সংস্থা। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০১২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ঢাকা মহানগরীতে কার্যকরী নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, পরিবেশবান্ধব ও দ্রুত গতির গণপরিবহণ ব্যবস্থা চালু হবে বলে আশা করছে সরকার।

জেআই