গরু মোটাতাজা করে আশানুরূপ বিক্রি করতে না পেরে এবারের কোরবানি ঈদে লোকসানের মুখে পড়েছেন পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের গরুর খামারি ও ব্যাপারীরা। এবারের কোরবানির ঈদে এ অঞ্চলের খামারি ও ব্যাপারীদের প্রায় ৩০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।
এছাড়া হাইব্রিড জাতের অবিক্রীত প্রায় ২৫ হাজার গরু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। অনেকেই দেনা শোধ করতে না পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলেও জানা গেছে।
পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের খামারিরা কম সময়ে গরু মোটাতাজা করে বিক্রি করে অধিক লাভের আশায় ছিলেন। এছাড়া তারা ক্রস জাতের পাবনা ব্রিড, অস্ট্রেলিয়ান-ফ্রিজিয়ান ব্রিড, ইন্ডিয়ান হরিয়ান ব্রিড, পাকিস্তানি সাহিয়াল ব্রিড ও দেশি জাতের গরু পালন করেন।
সারাদেশে এ অঞ্চলের গরুর খ্যাতি ও চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে মোটাতাজা গরুর নানা রকম ক্ষতিকর দিক উঠে আসায় দেশের কোরবানির পশুর হাটগুলোতে মোটাতাজা গরু কিংবা ক্রস হাইব্রিড জাতের গরুর দাম ও চাহিদা না থাকায় এ অঞ্চলের দুই সহস্রাধিক গরুর ব্যাপারী মূলধন হারিয়ে পথে বসেছেন। তবে মৌসুমি গরু ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের গোখামারি ও পালনকারীরা কোরবানির বাজার ধরা জন্য দেশের বিভিন্ন জেলায় লক্ষাধিক গরু সরবরাহসহ স্থানীয় পশুর হাটে বিক্রি করে থাকেন। গরুর ব্যাপারী ও ব্যবসায়ীরা খামারি ও চাষিদের বাড়ি থেকে গরু কিনে বিক্রির জন্য সড়ক ও নৌপথে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার পশুর হাটে নিয়ে যান। উচ্চবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের লোকেরা হাইব্রিড জাতের বড় বড় নাদুসনুদুস গরু কোরবানি দিতেন। কিন্তু এবার হয়েছে তার উল্টো। সবাই ঝুঁকেছিলেন কম মোটাতাজা দেশি গরুর দিকে।
নানা ব্র্যান্ডের পাম ট্যাবলেট, স্টেরয়েড, ডেক্সামেথাসন, কোর্টিসল, বিটামিথাসন, হাইড্রোকর্টিসন প্রেডনিসলনের মতো মারাত্মক ক্ষতিকর হরমোন গরু মোটাতাজাকরণে ব্যবহার করা হয়েছে। এসব গরুর মাংস খেয়ে মানুষ লিভার, কিডনি, ক্যানসার, হৃদযন্ত্র, পুরুষত্ব ও মাতৃত্বহীনতা, মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্তসহ মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হতে পারে— স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতামতসহ এমন খবর সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করায় এর বিরূপ প্রভাব পড়ে পশুর হাটগুলোতে। এতে হাইব্রিড জাতের বড় গরু নিয়ে আসা ব্যবসায়ীদের ব্যাপক লোকসান হয়েছে বলে অনেকেই জানিয়েছেন।
আলাপকালে বেড়া উপজেলার পায়না গ্রামের আসাদুল ঢাকার গাবতলী পশুর হাটে ২৫০টি গরু তুলেছিলেন। এর মধ্যে মাত্র ৯০টি গরু বিক্রি হয়েছে, ১৬০টি গরু ফেরত এনেছেন। একই এলাকার নদীপাড়ের সোলেমান ব্যাপারীর ২৫০টি গরুর মধ্যে ৭৫টি বিক্রি হয়েছে। ফেরত এনেছেন ১৭৫টি। তাদের প্রত্যেকের লোকসান হয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা।
সাঁথিয়ার টলট গ্রামের কালা ব্যাপারীর ৮টি গরু বিক্রি করে ২ লাখ টাকা, করমজা গ্রামের নিজাম ব্যাপারীর ৩৭টি গরু বিক্রি করে ৩ লাখ টাকা লোকসান দিতে হয়েছে বলে তারা জানান। সব মিলিয়ে এ অঞ্চলের দুই সহস্রাধিক গরু ব্যবসায়ীর প্রত্যেকের ২ লাখ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত লোকসান হয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
এদিকে অনেক খামারি বাকি টাকা না পাওয়ার আশঙ্কায় ব্যাপারীদের কাছ থেকে গরু ফেরত নিয়ে যাচ্ছেন। আবার অনেক ব্যাপারী খামারিদের পাওনা টাকা শোধ করতে না পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে তাদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. এনামুল হক জানান, হাতে গোনা কিছু অসাধু মানুষ লুকিয়ে গরু মোটাতাজা করে বিক্রি করলেও পাবনা জেলার বেশির ভাগ খামারি স্বাভাবিক ও দেশি প্রক্রিয়ায় গরু মোটাতাজা করেছিলেন। কিন্তু অসাধু উপায়ে গরু মোটাতাজা করার ক্ষতিকর দিক সংবাদমাধ্যমে প্রচার হওয়ায় মোটাতাজা গরু কেনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন ক্রেতারা। ফলে ওই সব অসাধু খামারি বা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় মোটাতাজা গরুর খামারিরাও লোকসানে পড়েছেন।
জেআই





